সময় কী? মহাবিশ্বের শুরু কি সত্যিই বিগ ব্যাং দিয়ে? কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরে কী ঘটে? এমন গভীর ও জটিল প্রশ্নের উত্তর সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরার দুরূহ কাজটি করেছিলেন ব্রিটিশ তাত্ত্বিক পদার্থবিদ স্টিফেন হকিঙ। তাঁর ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত বই ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ (A Brief History of Time) বিজ্ঞানজনপ্রিয়করণের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী মাইলফলক। এই বইটি প্রমাণ করে—বিজ্ঞান কেবল বিশেষজ্ঞদের ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়; বরং সঠিক ভাষা ও রূপক ব্যবহার করলে মহাবিশ্বের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নও সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
হকিঙ এই বইয়ে মহাবিশ্বের উৎপত্তি থেকে শুরু করে তার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পর্যন্ত একটি সামগ্রিক চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছেন। বিগ ব্যাং তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি বোঝান কীভাবে স্থান ও সময়ের সূচনা ঘটে থাকতে পারে। এরপর আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আলোকে মহাকর্ষ, কণার আচরণ ও মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো ব্যাখ্যা করেন। যদিও এই দুটি তত্ত্ব একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, হকিঙ দেখান—এই দ্বন্দ্বই আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ।
বইটির সবচেয়ে জনপ্রিয় অংশগুলোর একটি হলো কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole) নিয়ে আলোচনা। সাধারণভাবে কৃষ্ণগহ্বরকে ধরা হতো এমন এক অঞ্চল হিসেবে, যেখান থেকে কিছুই বের হতে পারে না। হকিঙ তাঁর তাত্ত্বিক কাজের মাধ্যমে দেখান—কোয়ান্টাম প্রভাবের কারণে কৃষ্ণগহ্বর থেকে ধীরে ধীরে বিকিরণ বের হতে পারে, যা আজ হকিঙ বিকিরণ নামে পরিচিত। এই ধারণা মহাবিশ্বে তথ্যের সংরক্ষণ ও সময়ের প্রকৃতি নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয় এবং আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে গভীর আলোড়ন তোলে।
‘ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়-ধারণা নিয়ে দার্শনিক প্রশ্ন। সময় কি একদিকে এগিয়ে যায় নাকি কোনো মৌলিক নিয়মে বাঁধা? কেন আমরা ভবিষ্যৎ জানতে পারি না, অথচ অতীত স্মরণ করতে পারি? হকিঙ সময়ের “তীর” বা arrow of time ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন কেন মহাবিশ্বে বিশৃঙ্খলা (entropy) বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞ সময়ও একমুখী হয়ে ওঠে। এই আলোচনা বিজ্ঞান ও দর্শনের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে পাঠককে অস্তিত্বগত প্রশ্নের মুখোমুখি করে।
তবে বইটি সহজ ভাষায় লেখা হলেও বিষয়বস্তুর গভীরতার কারণে অনেক পাঠকের কাছে এটি চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে। তবু আশ্চর্যজনকভাবে বইটি বিশ্বজুড়ে কোটি কপি বিক্রি হয় এবং দীর্ঘদিন বেস্টসেলার তালিকায় থাকে। এটি প্রমাণ করে—মানুষ কেবল হালকা বিনোদনই নয়, বরং গভীর জ্ঞান ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানতেও আগ্রহী।
আজকের দিনে মহাকাশবিজ্ঞান ও তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে নতুন নতুন আবিষ্কার হচ্ছে—মহাকর্ষীয় তরঙ্গের পর্যবেক্ষণ, কৃষ্ণগহ্বরের ছবি কিংবা ডার্ক এনার্জির রহস্য। তবু ‘অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞানের আসল সৌন্দর্য শুধু উত্তর পাওয়ায় নয়, বরং প্রশ্ন করার সাহস ও কৌতূহল ধরে রাখায়। স্টিফেন হকিঙের এই বই তাই কেবল মহাবিশ্বের ইতিহাস নয়; বরং মানুষের জানার আকাঙ্ক্ষারও এক সংক্ষিপ্ত, অথচ গভীর ইতিহাস।

Leave a comment