অনেক সময় প্রবাসী বিজ্ঞানীদের নিয়ে দেশে একটি প্রশ্ন ওঠে—বিদেশে গিয়ে কাজ করলে কি তাঁরা ধীরে ধীরে দেশের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন? ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য এই প্রশ্নের একটি ভিন্ন উত্তর দেয়। তাঁর কথায়, “বাইরে থাকলেও দেশের কথা ভেবে গবেষণার পরিকল্পনা করেছি।” এই একটি বাক্যে ধরা পড়ে প্রবাসে থেকেও দেশের সঙ্গে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ বজায় রাখার গল্প।
ড. আশরাফউদ্দিনের গবেষণাজীবনের বড় একটি সময় কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত গবেষণা অবকাঠামোসম্পন্ন দেশে। সেখানে কাজ করার সময় তিনি স্বাভাবিকভাবেই অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, বড় তহবিল ও আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়েছেন। তবু তিনি বারবার ভেবেছেন—এই সুযোগ-সুবিধা যদি কখনো বাংলাদেশে না থাকে, তাহলে দেশে ফিরে তিনি কী ধরনের গবেষণা করতে পারবেন? এই ভাবনা থেকেই তিনি গবেষণার বিষয় নির্বাচন ও দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছিলেন। কোন ধরনের গবেষণা কম উপকরণে করা সম্ভব, কোন ধরনের পদ্ধতি দেশের প্রেক্ষাপটে মানানসই—এসব প্রশ্ন তাঁর মাথায় সব সময়ই ছিল।
তিনি একসময় দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার পরিকল্পনাও করেছিলেন। সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বই, পদ্ধতি ও সম্ভাব্য যন্ত্রপাতির তালিকা তৈরি করা শুরু করেন। যদিও শেষ পর্যন্ত বাস্তব কারণে দেশে ফেরা সম্ভব হয়নি, তবু এই প্রস্তুতি দেখায়—তিনি গবেষণাকে কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের বিষয় হিসেবে দেখেননি; বরং দেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগযোগ্য জ্ঞান তৈরির কথাও ভেবেছেন। এই মনোভাব প্রবাসী গবেষকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
প্রবাসী বিজ্ঞানীদের অবদান কেবল দেশে ফিরে এসে কাজ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিনিময়, যৌথ গবেষণা প্রকল্প, তরুণ শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া—এসব মাধ্যমেও দেশের বৈজ্ঞানিক পরিবেশ সমৃদ্ধ হতে পারে। ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতা দেখায়, বাইরে থেকে দেশের কথা ভাবা মানে দেশের সমস্যাকে বোঝার চেষ্টা করা এবং নিজের গবেষণার অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের পথ খোঁজা।
এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই বিদেশে পড়তে বা কাজ করতে গিয়ে মনে করেন, দেশের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা কঠিন। কিন্তু বাস্তবে জ্ঞান আজ আর ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। অনলাইন যোগাযোগ, যৌথ গবেষণা, পরামর্শমূলক ভূমিকা—এসবের মাধ্যমে প্রবাসে থেকেও দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে অবদান রাখা সম্ভব। ড. আশরাফউদ্দিনের কথায়, গবেষকের পরিচয় কেবল তাঁর অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তাঁর চিন্তার দিকনির্দেশনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে, এই বক্তব্য আমাদের একটি মানবিক দিক স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন বিজ্ঞানীর পথচলা শুধু গবেষণার ফল দিয়ে নয়, তাঁর মানসিক সংযোগ দিয়েও মূল্যায়ন করা যায়। বাইরে থেকেও দেশের কথা ভাবা মানে নিজের শিকড়কে ভুলে না যাওয়া। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের এই অবস্থান তরুণ প্রজন্মকে শেখায়—বিশ্ব নাগরিক হওয়া মানেই নিজের দেশের দায়বদ্ধতা ভুলে যাওয়া নয়; বরং বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য কিছু করার ভাবনাই একজন গবেষকের সত্যিকারের বড় পরিচয়।
ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment