আধুনিক সমাজে নেতৃত্ব বলতে আমরা প্রায়ই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেই বড় গুণ হিসেবে দেখি। সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত প্রতিক্রিয়া অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু একাডেমিক ও গবেষণা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। তাঁর মতে, “নেতৃত্ব মানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়, ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া।” এই উপলব্ধির পেছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা, গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং বড় বড় প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বাস্তব অভিজ্ঞতা।
ড. করিম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছেন, তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা তহবিল বণ্টন, নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা কিংবা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান মনে হলেও, এর প্রভাব বছরের পর বছর ধরে পড়ে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্টদের মতামত শোনা এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর নেতৃত্বের দর্শনে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা একটি কেন্দ্রীয় জায়গা দখল করে। দ্রুত সিদ্ধান্ত অনেক সময় ব্যক্তিগত ধারণা বা সীমিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়। কিন্তু ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে হলো বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনায় আনা। ড. করিমের অভিজ্ঞতায়, যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসনিক কর্মীরা নিজেদের মতামত দেওয়ার সুযোগ পান, তখন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়ও সবার মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি হয়। এতে করে সিদ্ধান্তটি কেবল প্রশাসনিক নির্দেশনা না থেকে একটি যৌথ অঙ্গীকারে পরিণত হয়।
এই দর্শন গবেষণার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো নতুন প্রকল্প শুরু করার আগে তিনি শুধু বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা নয়, বরং অর্থায়নের ধারাবাহিকতা, মানবসম্পদের প্রাপ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিতেন। এতে করে মাঝপথে প্রকল্প থেমে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। তাঁর মতে, দ্রুত সিদ্ধান্তে শুরু হওয়া অনেক প্রকল্পই পরে টেকসই না হওয়ায় বন্ধ হয়ে যায়, যা সময় ও সম্পদের অপচয় ঘটায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই উপলব্ধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্তকে দক্ষতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণার মতো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের ফল দীর্ঘস্থায়ী হয়। একটি ভুল নীতি বা অপরিকল্পিত উদ্যোগের ক্ষতি বহু বছর ধরে বহন করতে হয়। তাই ড. করিমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি—যেখানে তাড়াহুড়োর বদলে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শেষ পর্যন্ত “নেতৃত্ব মানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নয়, ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া”—এই বাণীটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে টেকসই উন্নয়ন তাৎক্ষণিক সাফল্যে নয়, বরং সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্তে গড়ে ওঠে।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment