এআই নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা অনেক সময় খুব দ্রুত কয়েকটি পরিচিত উদাহরণে চলে যাই—ভুয়া ছবি, ভুয়া ভিডিও, ভুল তথ্য, বা প্রতারণা। এগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ড. আলিমুর রেজা যে ঝুঁকিটিকে সবচেয়ে মৌলিকভাবে তুলে ধরেন, সেটি আরও গভীরে যায়: মেশিন ইন্টেলিজেন্সের রেপ্লিকেশন পাওয়ার, অর্থাৎ দ্রুত কপি করে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। এই ধারণাটি বোঝা গেলে এআই নিয়ে ভয় বা উচ্ছ্বাস—দুই চরমের বদলে—আমরা দায়িত্বশীল চিন্তার দিকে এগোতে পারি।
প্রথমে মানবজ্ঞানকে ভাবুন। একজন মানুষ সারাজীবনে যে জ্ঞান অর্জন করেন, তা শুধু বই পড়ে নয়—অভিজ্ঞতা, ভুল, সংশোধন, অনুশীলন, এবং সময়ের ভেতর দিয়ে তৈরি হয়। একজন শিক্ষক ক্লাসে পড়ালেও তিনি নিজের মাথার জ্ঞান সরাসরি শিক্ষার্থীর মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারেন না। ধারণা ব্যাখ্যা করতে হয়, উদাহরণ দিতে হয়, শিক্ষার্থীকে অনুশীলন করতে হয়, ভুল করতে হয়, তারপর ধীরে ধীরে বোঝা তৈরি হয়। অর্থাৎ মানুষের শেখা একটি ধীর ও মানবিক প্রক্রিয়া।
এখন মেশিনের শেখাকে ভাবুন। মেশিন ইন্টেলিজেন্স ডিজিটাল। একটি মডেল যখন প্রশিক্ষিত হয়, তার জ্ঞান অনেকটাই ফাইল ও প্যারামিটারের (মডেলের ভেতরের সংখ্যাগত মান) ভেতরে ধরে রাখা থাকে। এই ডিজিটাল জ্ঞান আপনি মুহূর্তে কপি করতে পারেন। একই মডেল একসাথে হাজার হাজার সার্ভারে বসিয়ে দেওয়া যায়। এক জায়গায় উন্নতি হলে তা দ্রুত বহু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এখানে “শেখা”র গতি যেমন দ্রুত, “ছড়িয়ে পড়া”র গতিও তেমন দ্রুত। ড. আলিমুর রেজা বলেন, এই ক্ষমতাই মেশিনকে মানুষের তুলনায় আলাদা করে তোলে এবং নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।
এই কথাটি একটি সাধারণ দৈনন্দিন তুলনায় বোঝা যায়। ধরুন, আপনি একটি ভালো রান্না শিখলেন। সেই রান্না শেখাতে আপনার বন্ধুকে সময় দিতে হবে, হাতে-কলমে দেখাতে হবে, ভুল হলে ঠিক করতে হবে। কিন্তু যদি আপনি একটি রেসিপির ভিডিও বানান, তা এক মিনিটেই হাজার মানুষ দেখতে পারে। এখন এআইকে ভাবুন ভিডিওর চেয়েও দ্রুত মাধ্যম হিসেবে—কারণ এখানে পুরো “দক্ষতা”টাই কপি হয়ে যায়। ফলে ক্ষমতাবান মডেল খুব দ্রুত সর্বত্র ছড়িয়ে যেতে পারে, আর ভুল বা অপব্যবহারও তত দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে।
ড. আলিমুর রেজা এই বিষয়টিকে আরেক ধাপে নিয়ে যান: যদি কোনো সিস্টেম ভবিষ্যতে নিজে নিজেই আরও সক্ষম হয়ে ওঠে, বা নিজেকে উন্নত করে, তাহলে নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হতে পারে। কারণ তখন শুধু একটি মডেল কপি হচ্ছে না; কপি হচ্ছে উন্নত হওয়া সংস্করণ, এবং সেই উন্নত সংস্করণ আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই জায়গায় এসে এআই ঝুঁকির আলোচনা কেবল গুজব বা আতঙ্ক নয়; এটি প্রযুক্তির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য থেকে উঠে আসে—ডিজিটাল জিনিস দ্রুত অনুলিপি হয়।
তবে ড. আলিমুর রেজা একই সঙ্গে একটি ভারসাম্যও দেখান। তিনি বলেন, এআই একবার তৈরি হয়ে গেলে সেটিকে পুরোপুরি থামিয়ে রাখা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ প্রতিযোগিতা আছে। কেউ থামলে অন্য কেউ থামবে না। তাই প্রশ্ন হলো থামাব কি না—তা নয়; প্রশ্ন হলো কীভাবে নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল পথে এগোব। এই জায়গাতেই সমাজের ভূমিকা আসে। শুধু গবেষক বা কোম্পানির উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। সচেতন ব্যবহারকারী, নীতিমালা, নিরাপত্তা পরীক্ষা, ডেটা সুরক্ষা, এবং শিক্ষা—সব মিলিয়ে একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আলোচনা আরও জরুরি। কারণ আমাদের দেশে প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করা হলেও নিরাপত্তা ও নৈতিক ব্যবস্থাপনায় অনেক সময় ঘাটতি থাকে। ফলে অপব্যবহার ঠেকাতে সবচেয়ে আগে দরকার সচেতনতা। আপনি যে কনটেন্ট দেখছেন তা যাচাই করা, ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সতর্ক থাকা, এবং প্রযুক্তিকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করা—এসব ছোট অভ্যাসই বড় সুরক্ষা তৈরি করে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগত স্তরে প্রয়োজন নীতিমালা: কোন ডেটা কীভাবে ব্যবহৃত হবে, ভুল তথ্য ছড়ালে কী ব্যবস্থা হবে, এবং কোনো এআই সিস্টেম ব্যবহার করার আগে কী ধরনের নিরাপত্তা যাচাই করা হবে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে এআই শিক্ষাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ—শুধু কোডিং নয়, দায়িত্বশীল ব্যবহারও শেখাতে হবে।
ড. আলিমুর রেজার বক্তব্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, এআই নিয়ে আলোচনা মানে শুধু ভবিষ্যতের স্বপ্ন নয়; এটি বর্তমানের দায়িত্ব। প্রযুক্তির ক্ষমতা যত বাড়বে, দায়িত্বও তত বাড়বে। আপনি যদি আজ এআই শিখতে শুরু করেন, তাহলে শুধু কীভাবে মডেল বানাতে হয় তা জানলেই হবে না—কীভাবে তা সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে, কোথায় ঝুঁকি তৈরি করে, এবং কীভাবে নিরাপদ পথে ব্যবহার করা যায়—এ কথাও আপনাকে বুঝতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি-দুনিয়া আপনার হাতে তৈরি হবে, আর সেই দুনিয়াকে মানবিক রাখার দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত আপনারই।
পূর্ণ সাক্ষাৎকারে ড. আলিমুর রেজা তার শিক্ষা–যাত্রা, গবেষণার খুঁটিনাটি, রোবটের ভবিষ্যৎ, এবং এআই ব্যবহারের বাস্তব প্রশ্নগুলো আরও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। নিম্নে ড. আলিমুর রেজার পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন এবং ইউটিউবে দেখুন।

Leave a comment