বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নম্বর বা জিপিএ অনেক সময় শিক্ষার্থীর সক্ষমতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। ভালো জিপিএ মানেই ভালো ভবিষ্যৎ—এই ধারণা এতটাই গভীরভাবে প্রোথিত যে কম ফলাফল পাওয়া অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীই নিজের সম্ভাবনার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন। বিজ্ঞানী ডট অর্গ-এর সাক্ষাৎকারে ড. জুবায়ের শামীম এই একমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করেন। তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—জিপিএ গুরুত্বপূর্ণ ঠিকই, কিন্তু সেটিই শেষ কথা নয়। গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে স্কিল ও বাস্তব অভিজ্ঞতা অনেক সময় নম্বরের ঘাটতি পুষিয়ে দিতে পারে।
ড. জুবায়ের শামীম নিজেই উল্লেখ করেছেন, তাঁর স্নাতক পর্যায়ের ফলাফল একেবারে শীর্ষস্থানীয় ছিল না। তবু তিনি ধীরে ধীরে নিজের আগ্রহের ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষতা তৈরি করেছেন—তাপগতিবিদ্যা, হিট ট্রান্সফার, ফ্লুইড মেকানিক্সের মতো বিষয়গুলোতে গভীরভাবে কাজ করেছেন। এই দক্ষতাগুলোই পরবর্তীতে তাঁর বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথে বড় ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ, নম্বরের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি নিজের প্রোফাইলকে গবেষণার মাধ্যমে শক্তিশালী করে তুলতে পেরেছেন।
বাস্তবে, বিদেশি প্রফেসররা শিক্ষার্থী বাছাই করার সময় কেবল সিজিপিএর দিকে তাকান না। তাঁরা দেখেন—এই শিক্ষার্থী কী ধরনের সমস্যার সমাধান করতে পারে, কী ধরনের টুল বা সফটওয়্যার ব্যবহার জানে, ল্যাবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে কি না, গবেষণার প্রতি আন্তরিক আগ্রহ দেখাতে পারে কি না। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজের প্রজেক্ট, ইন্টার্নশিপ বা ছোট গবেষণার মাধ্যমে এই দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারে, তবে কম জিপিএ অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পরামর্শ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অনেক শিক্ষার্থীরই ল্যাব সুবিধা সীমিত, ভালো সুপারভাইজার পাওয়া কঠিন। তবু উদ্যোগী হলে স্কিল ডেভেলপমেন্ট সম্ভব। অনলাইনে ওপেন সোর্স সফটওয়্যার শেখা, ডেটা অ্যানালাইসিস বা সিমুলেশন টুল ব্যবহার করে ছোট প্রজেক্ট করা, গবেষণা পেপার পড়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ শেখা—এসবই একজন শিক্ষার্থীর প্রোফাইলকে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ করে। এই ধরনের প্রস্তুতির ফলে বিদেশি প্রফেসরের কাছে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করা সহজ হয়।
ড. জুবায়ের শামীম তরুণদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মনে করিয়ে দেন—নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে সৎ হওয়া। যদি জিপিএ কম হয়, তবে সেটি ঢাকতে গিয়ে অজুহাত দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের শক্তির জায়গাগুলো সামনে আনাই বেশি কার্যকর। যেমন—কোনো নির্দিষ্ট সফটওয়্যারে দক্ষতা, কোনো কনফারেন্স পেপার, বা কোনো গবেষণা প্রজেক্টে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা। এই বাস্তব অর্জনগুলো প্রফেসরের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এখানে আত্মবিশ্বাসের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কম জিপিএ থাকা মানেই যে কেউ গবেষণায় সফল হতে পারবে না—এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের শেখার ক্ষমতা ও আগ্রহ তুলে ধরতে পারলে অনেক সময় প্রফেসররা সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেন। গবেষণার ক্ষেত্রে সম্ভাবনা ও অধ্যবসায় অনেক সময় তাৎক্ষণিক ফলাফলের চেয়ে বেশি মূল্যবান।
ড. জুবায়ের শামীমের বক্তব্য তাই তরুণদের জন্য এক ধরনের বাস্তব অনুপ্রেরণা—নম্বর গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটিই আপনার ভবিষ্যতের একমাত্র মানদণ্ড নয়। নিজের আগ্রহের জায়গায় দক্ষতা তৈরি করুন, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা গড়ে তুলুন। ধীরে ধীরে সেই দক্ষতাই আপনার প্রোফাইলকে নতুন রূপ দেবে।
🔗 মূল সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Leave a comment