উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগবিজ্ঞানীদের জীবনী

“আমার অধ্যাপক বলেছিলেন কাজটা ছেড়ে দিতে—কিন্তু আমি ছাড়িনি” — ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদ

Share
Share

গবেষণার পথে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তগুলো আসে তখনই, যখন দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। বাইরের মানুষ তো দূরের কথা, অনেক সময় কাছের শিক্ষক, সুপারভাইজার বা সহকর্মীরাও তখন বাস্তবতার কথা বলে গবেষণার দিক পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের গবেষণাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সারকথা এই একটি বাক্যে ধরা পড়ে—“আমার অধ্যাপক বলেছিলেন কাজটা ছেড়ে দিতে—কিন্তু আমি ছাড়িনি।” এই বক্তব্যের ভেতর লুকিয়ে আছে একজন তরুণ গবেষকের মানসিক দৃঢ়তা, আত্মবিশ্বাস এবং দায়িত্ববোধের গল্প।

পিএইচডি পর্যায়ে তিনি যে এনজাইম নিয়ে কাজ করছিলেন, সেটি ছিল অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির। এনজাইম বলতে বোঝায় জীবদেহের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে দ্রুত ঘটানোর জন্য দায়ী প্রোটিনজাতীয় অনুঘটক। সাধারণভাবে গবেষণাগারে এনজাইম নিয়ে কাজ করতে হলে সেটিকে দীর্ঘ সময় কার্যক্ষম অবস্থায় ধরে রাখা জরুরি। কিন্তু ড. আশরাফউদ্দিনের ক্ষেত্রে যে এনজাইমটি ছিল, সেটি অল্প সময়ের মধ্যেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যেত। ফলে প্রতিটি পরীক্ষার ফল বারবার ব্যর্থতায় শেষ হচ্ছিল। কয়েক মাস নয়, প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।

এই অবস্থায় তাঁর তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক বাস্তবসম্মত একটি পরামর্শ দেন—গবেষণার বিষয় বদলানো। গবেষণার জগতে এটি অস্বাভাবিক নয়। পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ওপর সময়ের চাপ থাকে, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা থাকে, এবং গবেষণা শেষ করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা কঠিন বিষয় ছেড়ে তুলনামূলক সহজ ও পরীক্ষিত বিষয়ে চলে গেলে ডিগ্রি শেষ করা সহজ হয়। তাই অধ্যাপকের পরামর্শের পেছনে অযৌক্তিকতা ছিল না।

তবু ড. আশরাফউদ্দিন সেই সহজ পথটি বেছে নেননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, গবেষণার প্রকৃত মূল্য লুকিয়ে আছে অজানা সমস্যার সমাধানে। সহজ পথে হাঁটলে হয়তো পিএইচডির সনদ মিলবে, কিন্তু নতুন জ্ঞান তৈরি হবে না। তাঁর কাছে এই গবেষণা ছিল শুধু ব্যক্তিগত একাডেমিক অর্জনের বিষয় নয়; এটি ছিল নিজের সক্ষমতা যাচাইয়ের এক সুযোগ। উপরন্তু, বিদেশে গবেষণাগারে কাজ করা একজন বাংলাদেশি ছাত্র হিসেবে তাঁর মনে একটি অতিরিক্ত দায়বোধ কাজ করছিল—এই কাজটি যদি অসম্পূর্ণ রেখে তিনি হাল ছেড়ে দেন, তাহলে তা কেবল তাঁর নিজের নয়, পরোক্ষভাবে তাঁর দেশের প্রতিনিধিত্বের ব্যর্থতা হিসেবেও দেখা হতে পারে।

এই মানসিক অবস্থান থেকেই তিনি কাজ চালিয়ে যান। তিনি পরীক্ষার পদ্ধতি বদলান, পরিবেশগত শর্ত—যেমন তাপমাত্রা, দ্রবণের অম্লত্ব বা ক্ষারত্ব (pH), সংরক্ষণের উপায়—সবকিছু নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। বারবার ব্যর্থতা তাঁকে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং প্রতিটি ব্যর্থতা তাঁকে পরবর্তী ধাপের জন্য নতুন তথ্য দিয়েছে। ধীরে ধীরে তিনি এমন একটি পদ্ধতি খুঁজে বের করেন, যার মাধ্যমে এনজাইমটিকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়। এই সাফল্যের মধ্য দিয়েই তাঁর গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে যায়, এবং পরবর্তীতে তিনি সেই এনজাইমের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করতে সক্ষম হন।

ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের এই অভিজ্ঞতা তরুণ গবেষকদের জন্য একটি গভীর বার্তা বহন করে। গবেষণার পথ মানেই দ্রুত সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বরং গবেষণার প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়ার সাহসে। শিক্ষক বা অভিজ্ঞ গবেষকদের পরামর্শ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিজের গবেষণার প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা আরও বড় ক্ষতি ডেকে আনে। কোন জায়গায় নমনীয় হওয়া উচিত আর কোন জায়গায় দৃঢ় থাকা প্রয়োজন—এই ভারসাম্য বুঝতে পারাই একজন পরিপক্ব গবেষকের লক্ষণ।

ড. আশরাফউদ্দিনের গল্প মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞানে অনেক সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো জন্ম নেয় সেই সব মুহূর্তে, যখন সবাই ধরে নেয় কাজটি অসম্ভব। সেই ‘অসম্ভব’-এর দেয়াল ভাঙার সাহসই গবেষণাকে এগিয়ে নেয় নতুন জ্ঞানের দিকে।

ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: ড. মশিউর রহমান

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org