গবেষকদের যন্ত্রপাতিচিকিৎসা বিদ্যা

“এই কাজটা করতে পারলে হয়তো অনেক মানুষের উপকার করা যাবে”—কেন একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ক্যান্সার গবেষণায় নামলেন

Share
Share

একজন প্রকৌশলীর হাতে সাধারণত আমরা ভবন, সেতু বা অবকাঠামোর নকশা দেখতে অভ্যস্ত। ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ নিয়ে গবেষণা—এটি যেন চিকিৎসকদের কাজ। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের বাস্তবতা হলো, বড় সমস্যার সমাধান এখন আর কোনো একটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশি গবেষক ড. বাশার ইমন এই সত্যটির এক জীবন্ত উদাহরণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করে তিনি প্রথমে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর গবেষণা করতে গিয়ে তিনি বুঝতে শুরু করেন—গবেষণার জগৎ শুধু সূত্র বা অঙ্কের বিষয় নয়; এখানে রয়েছে অজানাকে জানার এক গভীর আনন্দ। এই অনুসন্ধিৎসাই তাঁকে ধীরে ধীরে ভিন্ন পথে নিয়ে আসে।

ড. বাশার ইমন বলেন, “এই কাজটা করতে পারলে হয়তো অনেক মানুষের উপকার করা যাবে।” এই একটি বাক্যেই লুকিয়ে আছে তাঁর গবেষণায় ঝুঁকে পড়ার আসল প্রেরণা। ক্যান্সার নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিপুল গবেষণা হচ্ছে, তবু এখনো আমরা ক্যান্সারের ‘চূড়ান্ত সমাধান’ খুঁজে পাইনি। অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসা কাজ করে, কিন্তু রোগ ফিরে আসে বা অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতাই তাঁকে ভাবায়—চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরে থেকে কেউ কি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি প্রকৌশলীর দৃষ্টিতে ক্যান্সারকে দেখতে শুরু করেন। প্রকৌশলে আমরা যেভাবে কোনো কাঠামোর শক্তি, চাপ বা ভার বহনের ক্ষমতা বিশ্লেষণ করি, তিনি সেভাবেই ক্যান্সার কোষের পরিবেশকে বিশ্লেষণ করছেন। তাঁর কাছে টিউমার শুধু কোষের একটি স্তূপ নয়; এটি এক ধরনের “জৈব কাঠামো”, যার ভেতরে বল প্রয়োগ, টানাপোড়েন ও কাঠিন্যের পরিবর্তন ঘটে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে ক্যান্সার মেকানিক্স নামের একটি তুলনামূলক নতুন গবেষণা ক্ষেত্রে নিয়ে আসে। এখানে গবেষকেরা খুঁজে দেখছেন—টিউমারের ভেতরের ভৌত পরিবেশ ক্যান্সারের আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমার নরম থাকে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা শক্ত হয়ে যায়। এই শক্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে কেবল ক্যান্সার কোষ নয়, আশপাশের অন্যান্য কোষও ভূমিকা রাখে। এই প্রক্রিয়া বোঝা গেলে ভবিষ্যতে ক্যান্সারের বিস্তার থামানোর নতুন উপায় বের হতে পারে।

একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের কাছে যেমন কোনো সেতুর দুর্বল জায়গা খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি ড. ইমনের কাছে ক্যান্সারের ‘দুর্বল মুহূর্ত’ খুঁজে বের করাই লক্ষ্য। তাঁর গবেষণা সরাসরি কোনো ওষুধ তৈরি না করলেও ভবিষ্যতের চিকিৎসার ভিত্তি তৈরি করছে। কারণ, রোগের ভেতরের কাঠামো বোঝা গেলে তাতে আঘাত করার পথও বের হয়।

এই পথচলায় চ্যালেঞ্জও কম ছিল না। বিষয় পরিবর্তন মানে নতুন ভাষা শেখা, নতুন গবেষণা পদ্ধতি আয়ত্ত করা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল ধারণার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। তবু তিনি এই ঝুঁকি নিয়েছেন একটি বড় উদ্দেশ্যের জন্য—মানুষের উপকার করার আশায়।

ড. বাশার ইমনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান মানে শুধু একটি বিষয়ের ভেতরে আটকে থাকা নয়। বরং প্রকৌশল, পদার্থবিদ্যা, জীববিজ্ঞান—এই সব শাখা এক জায়গায় মিললেই বড় সমস্যার নতুন সমাধান বেরিয়ে আসে। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তাঁর পথচলা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—নিজের পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর মানবিক সমস্যার দিকে তাকাতে শিখলেই বিজ্ঞানীর আসল ভূমিকা শুরু হয়।

🔗 পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ