
বাংলাদেশি গবেষকদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বিজ্ঞানী.অর্গ–এর একটি আলাপচারিতায় উঠে এসেছে এক অস্বাভাবিক, কিন্তু সময়ের দাবি-জাগানো যাত্রাপথ। নকশা-পরিমাপ-ভারের ভাষা যে মানুষটি শিখেছেন সেতু-ভবন আর কংক্রিটের জগতে, তিনি আজ ক্যান্সারের ভেতরকার “টানাপড়েন” মাপছেন—এমন সূক্ষ্ম মাপে, যা সাধারণ ধারণায় প্রায় অকল্পনীয়। সেই মানুষটি ড. বাশার ইমন—আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় যিনি “Bashar Emon” নামেও পরিচিত।
প্রেক্ষাপটটা বড়। ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে ক্যান্সারের নতুন রোগী ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ ৭৬ হাজার; মৃত্যু প্রায় ৯৭ লাখ ৪৩ হাজার। একই বছরে বাংলাদেশ–এ নতুন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার এবং মৃত্যু প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার। এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—ক্যান্সার শুধু হাসপাতালের বিষয় নয়; এটি গবেষণাগার, নীতিনির্ধারণ, জনস্বাস্থ্য—সবকিছুরই জরুরি প্রশ্ন। ড. ইমনের গবেষণা ঠিক এই “জরুরি প্রশ্ন”-এর এক নতুন দরজা খুলতে চায়: টিউমার (ক্যান্সার কোষের দল) সময়ের সঙ্গে শক্ত হয় কেন, আর এই শক্ত হয়ে যাওয়াই কি ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার (মেটাস্ট্যাসিস) পেছনে গতি জোগায়?
শৈশব, শিক্ষা এবং পথ বদলের গল্প
নিজের শৈশব-কৈশোরের কথা বলতে গিয়ে ড. ইমন প্রথমে ফিরে যান রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ–এর দিনগুলোয়—যেখানে শৃঙ্খলা, নিয়মিত পড়াশোনা আর গণিতভিত্তিক চিন্তার চর্চা তাঁর আগ্রহকে ধার দেয়। পরের ধাপ, বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানাগুলোর একটি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক, তারপর একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা ও উচ্চশিক্ষা—এই পথটা তাঁর পেশাদার পরিচয়কে গড়ে তোলে।
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া মানুষের ক্যান্সার গবেষণায় যাওয়া শুনে কারও মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—“কেন?” ড. ইমন সেই প্রশ্নকে এড়িয়ে যান না; বরং এটিকেই গবেষণার মূল মানসিকতা হিসেবে দেখেন। তাঁর যুক্তি সরল: ক্যান্সার নিয়ে প্রচুর কাজ হলেও এখনও অনেক ক্যান্সারের ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সমাধান অসম্পূর্ণ; তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইরের গবেষকরাও (ইঞ্জিনিয়ারিং, পদার্থবিজ্ঞান, বায়োফিজিক্স) সমস্যা সমাধানের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারেন। এই “কনভার্জেন্ট” বা বিভিন্ন শাখার মিলনে গবেষণা—আধুনিক ক্যান্সার গবেষণারও এক বড় প্রবণতা।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসে ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয় অ্যাট আরবানা-শ্যাম্পেইন–এ গবেষণায় যুক্ত হন। সেখানে তিনি টিউমার টিস্যু কীভাবে আচরণ করে—তার “মেকানিক্স” বা বলবিদ্যার অংশটি বুঝতে মন দেন। তাঁর পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—তিনি Cancer Center at Illinois–এর সঙ্গে যুক্ত নানা উদ্যোগ ও সহযোগিতামূলক পরিবেশে কাজ করেছেন, যেখানে যান্ত্রিক প্রকৌশল আর ক্যান্সার জীববিজ্ঞানের গবেষকরা একই প্রশ্নকে ভিন্ন দিক থেকে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, গবেষণা ভালো লাগার বিষয়; ভালো না লাগলে পিএইচডির মতো দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এই কথাটি ব্যক্তিগত হলেও টিস্যু মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট (TiME) ট্রেইনিং প্রোগ্রাম–এর মতো আন্তঃবিষয়ক প্রশিক্ষণ কাঠামোতে তাঁর সম্পৃক্ততা দেখায়—গবেষণাকে “একা” করার চেয়ে “দলগতভাবে” এগোনোর বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁকে তৈরি করেছে।
আরও সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, তিনি Mechanical Testing Instructional Laboratory–এ দায়িত্ব পালন করছেন, যা The Grainger College of Engineering–এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যাবভিত্তিক শিক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিসর। ওই প্রোফাইল অনুযায়ী, তিনি মে ২০২৫ থেকে সেখানে “Teaching Lab Coordinator” হিসেবে যুক্ত হন এবং তাঁর ডক্টরাল/পোস্টডক্টরাল গবেষণা হয়েছে অধ্যাপক Taher Saif–এর তত্ত্বাবধানে। (এখানে উল্লেখ্য, অন্য একটি ল্যাব প্রোফাইলে তাঁর পিএইচডি সম্পন্ন হওয়ার বছর ২০২২ হিসেবে দেখা যায়—অর্থাৎ প্রকাশিত প্রোফাইলভেদে সময়রেখায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে।)
ক্যান্সার মেকানিক্স: টিউমার কেন “শক্ত” হয়ে ওঠে
ক্যান্সারকে আমরা বেশিরভাগ সময় জিন, মিউটেশন, কোষ বিভাজন—এসব শব্দে বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু গত কয়েক দশকে গবেষণায় জোরালোভাবে উঠে এসেছে আরেক বাস্তবতা: ক্যান্সার কোষ যে পরিবেশে থাকে—তার ভৌত বৈশিষ্ট্যও (যেমন কঠিন-নরম, টান-চাপ) রোগের গতিপথ বদলাতে পারে। এই ক্ষেত্রটিই “ক্যান্সার মেকানিক্স” বা টিউমার বায়োফিজিক্স—যেখানে টিউমারের “স্টিফনেস” (stiffness) বা “ইলাস্টিক মডুলাস” (elastic modulus) ধরনের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।
স্টিফনেস ব্যাপারটা বোঝা যায় একটা সহজ উদাহরণে। স্পঞ্জ আর রাবার বল—দুটোকেই চাপ দিলে হাত বসে যায়, কিন্তু স্পঞ্জে বেশি বসে, বলটায় কম। কারণ বলটা বেশি “কঠিন”—তার স্টিফনেস বেশি। মানবদেহের টিস্যুতেও এমনই। অনেক সলিড টিউমারে দেখা যায়, রোগ যত এগোয়, টিউমারের চারপাশের এক্সট্রাসেলুলার ম্যাট্রিক্স (ECM)—মানে কোষগুলোর মাঝের “জৈব জাল/মাচা”—আরও ঘন ও শক্ত হয়ে ওঠে। কোলাজেন জমা হওয়া, কোলাজেন ফাইবারের পুনর্বিন্যাস, এবং ফাইবারগুলোর “ক্রস-লিংকিং” (আঁটুনির মতো বন্ধন বৃদ্ধি)—এসব প্রক্রিয়া এই শক্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে।
কিন্তু এই শক্ত হওয়াটা কি শুধু একটি “ফল”—নাকি এটি নিজেই “কারণ” হয়ে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়াকে ত্বরান্বিত করে? কোলন ক্যান্সার নিয়ে একটি গবেষণায় উল্লেখ আছে, ক্যান্সার প্রগ্রেশন বাড়ার সঙ্গে কোলন টিউমারের ECM-এর স্টিফনেসও বাড়ে; এবং টিউমারের স্টিফনেস ক্যান্সার প্রগ্রেশন ও মেটাস্ট্যাসিসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ড. ইমনের গবেষণাও এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে—টিউমার মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট (TME) বা টিউমারের আশপাশের সামগ্রিক পরিবেশে কঠিন-নরম হওয়া কীভাবে কোষের আচরণ বদলায়।
টিউমার মাইক্রোএনভায়রনমেন্ট বলতে শুধু ক্যান্সার কোষকে বোঝায় না। এর মধ্যে থাকে ECM, বিভিন্ন “স্ট্রোমাল” কোষ (যেমন ফাইব্রোব্লাস্ট), রক্তনালির কোষ, এবং ইমিউন কোষ। এই পরিবেশের স্টিফনেস শুধু কোষের চলাফেরা বা আকার বদল নয়—ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স, আক্রমণ ক্ষমতা, এমনকি চিকিৎসা-প্রতিক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে পর্যালোচনাগুলোতে উল্লেখ করা হয়।
ফাইব্রোব্লাস্ট: ক্ষত সারানোর কর্মী কীভাবে টিউমারের “সহযোগী” হয়
ড. ইমন যে কোষটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন, সেটি “ফাইব্রোব্লাস্ট” (fibroblast)। সাধারণ পাঠকের কাছে ফাইব্রোব্লাস্টকে ভাবা যেতে পারে শরীরের “মেরামতি কর্মী” হিসেবে। কোথাও কেটে গেলে বা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফাইব্রোব্লাস্টরা সেখানে গিয়ে ECM-এর উপাদান (বিশেষ করে কোলাজেন) তৈরি ও জমা করে ক্ষত সারাতে সাহায্য করে—এক অর্থে টিস্যুর ভাঙা “ইট-সিমেন্ট” আবার বসায়।
কিন্তু টিউমারের ভেতরে এই একই কোষ অন্য রূপ নিতে পারে—যাকে বলা হয় “ক্যান্সার-অ্যাসোসিয়েটেড ফাইব্রোব্লাস্ট” (CAF)। CAF-রা টিউমার মাইক্রোএনভায়রনমেন্টের একটি বড় উপাদান এবং তাদের কাজ খুব বহুমাত্রিক: ECM জমা ও রিমডেলিং, ক্যান্সার কোষের সঙ্গে পারস্পরিক সিগনালিং, ইমিউন কোষের সঙ্গে ক্রসটক—সব মিলিয়ে তারা টিউমারের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাক্ষাৎকারে ড. ইমন সহজ করে বলেছেন: ফাইব্রোব্লাস্ট ইমিউন সেল নয়—এটি শরীরের ডিফেন্স বাহিনীর সৈন্য নয়; বরং স্বাভাবিক সময়ে “ক্ষত সারানো” তার দায়িত্ব। কিন্তু ক্যান্সার কোষ এই কোষকে “রিক্রুট” করে—যেন ভুল নির্দেশ দিয়ে সারাক্ষণ কোলাজেন জমা করাতে থাকে। ফল: টিউমারের ECM শক্ত হয়, টিউমার আরও “চাপা” ও ঘন হয়ে ওঠে, আর ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এই বর্ণনার সঙ্গে আধুনিক গবেষণালেখার সুরও মেলে—যেখানে বলা হয় CAF-রা ECM রিমডেলিং, EMT (epithelial-to-mesenchymal transition), ইনভেশন ও মেটাস্ট্যাসিসসহ বিভিন্ন ধাপে ভূমিকা রাখতে পারে।
ক্যান্সার গবেষণায় একটি বিখ্যাত উপমা আছে: “টিউমার এমন ক্ষত, যা কখনও পুরোপুরি সারে না”—এই ভাবনার সঙ্গে ফাইব্রোব্লাস্টের “ক্ষত সারানো বনাম টিউমার সহায়তা” দ্বন্দ্বটা বেশ মানানসই। ড. ইমনের কাজ এই উপমাকে পরিমাপযোগ্য ভাষায় ধরতে চায়—কোন কোষ কতটা বল প্রয়োগ করছে, টিস্যু কতটা শক্ত হচ্ছে, এবং এই পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান/পরিমাপযোগ্যভাবে ক্যান্সারের আচরণকে কীভাবে প্রভাবিত করছে।
ন্যানো-নিউটনের বল: ড. ইমনের সেন্সর কীভাবে কাজ করে
কোষের বল মাপা সহজ কাজ নয়। কারণ কোষ যে বল প্রয়োগ করে, তা অত্যন্ত ক্ষুদ্র—সাধারণ স্কেলে তা “ওজন” বা “ধাক্কা” হিসেবে আমরা টেরই পাই না। এজন্য ড. ইমন মাইক্রোস্কোপ-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি এমন এক সেন্সর তৈরি করেছেন, যা ১ ন্যানো-নিউটন (১ নিউটনের একশ কোটির এক ভাগ) রেজোলিউশনে কোষের বল ধরতে পারে।
এখানে বোঝার মতো একটি বড় ধারণা হলো—কোষকে আমরা বহুদিন ২-ডাইমেনশনাল (2D) ফ্লাস্ক বা ডিশে চাষ করি; কিন্তু মানবদেহে কোষ থাকে ৩-ডাইমেনশনাল (3D) ম্যাট্রিক্সের ভেতর, চারদিক থেকে ECM দ্বারা ঘেরা অবস্থায়। 2D কালচারে কোষের আকার, মেরুকরণ, কোষ-পরিবেশ ইন্টারঅ্যাকশন—সবই বদলে যেতে পারে; তাই অনেক প্রশ্নের উত্তর পেতে 3D মডেল বেশি বাস্তবসম্মত হতে পারে। ড. ইমনের উদ্ভাবনের লক্ষ্য ছিল—এই 3D বাস্তবতায় কোষের “টান” সরাসরি মাপা।
তার ২০২১ সালের একটি গবেষণায় (Science Advances-এ প্রকাশিত কাজের সারসংক্ষেপ) বলা আছে, সেন্সরটি একটি 3D cell–ECM “টিস্যু”কে (self-assembly পদ্ধতিতে) হোস্ট করে; কোষের বল এবং টিস্যুর স্টিফনেস—দুটিই মাপে, এমনকি টিস্যুকে টেনশন বা কম্প্রেশন দিয়েও পরীক্ষার সুযোগ রাখে। একই সারসংক্ষেপে উল্লেখ রয়েছে—ফাইব্রোব্লাস্ট, কোলন ও ফুসফুসের ক্যান্সার কোষ, এবং CAF—বিভিন্ন কোষ নিয়ে তারা ১ ন্যানো-নিউটন রেজোলিউশনে বলের গতিশীলতা পর্যবেক্ষণ করেছেন; এমনকি কোলন ক্যান্সার কোষ ও CAF একসাথে থাকলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিস্যুর স্টিফনেস কয়েকগুণ বেড়েছে—এমন পর্যবেক্ষণও সারসংক্ষেপে আছে।
এই সেন্সরের কাজকে কল্পনা করা যায় এক ধরনের “স্প্রিং-স্কেল” হিসেবে—যেমন বাজারের দাঁড়িপাল্লায় স্প্রিং টেনে বাড়ালে ওজন মাপা যায়, তেমনই কোষ যখন ECM-কে টানে, সেই টান সেন্সরের স্প্রিংয়ের মতো অংশে বিকৃতি তৈরি করে; আর সেই বিকৃতি থেকেই বল হিসাব করা যায়। এই ধারণাগত ‘স্প্রিং’ ভাষা ড. ইমনের মুখের কথার সঙ্গেও মেলে—তিনি বলেছেন, সেন্সরটা স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে, কিন্তু 3D পরিবেশে।
উদ্ভাবনের আরেকটি বাস্তব দিক হলো উপকরণ। সেন্সর তৈরিতে ব্যবহার হয় PDMS (পলিডাইমিথাইলসিলোক্সেন)—রাবারের মতো এক ধরনের ইলাস্টোমার, যা জীববৈজ্ঞানিক কাজে বহুল ব্যবহৃত; কারণ এটি স্বচ্ছ, তুলনামূলকভাবে বায়োকম্প্যাটিবল, সহজে মোল্ডিং/রেপ্লিকা মোল্ডিং করে সূক্ষ্ম কাঠামো বানানো যায়। ড. ইমনের গবেষণাপত্রের সারসংক্ষেপে সেন্সর নির্মাণে ফটোলিথোগ্রাফি/মাইক্রোফ্যাব্রিকেশন মোল্ড এবং PDMS কাস্টিং-এর কথাও স্পষ্টভাবে আছে।
এই যন্ত্র কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, কোষের বল (traction force) মাপা মানে শুধু “কৌতূহল” মেটানো নয়; এটি কোষ কীভাবে তার পরিবেশ “অনুভব” করে—যাকে mechanotransduction বলা হয়—তার পরিমাপযোগ্য চিত্র পাওয়া। mechanotransduction বলতে বোঝায়, কোষ কীভাবে যান্ত্রিক উদ্দীপনাকে জৈব-রাসায়নিক সংকেতে বদলে ফেলে—যার প্রভাব পড়ে জিনের প্রকাশ, কোষের গতি, টিকে থাকা বা রূপ বদলের ওপর। ড. ইমনের কাজ এই “অনুভব ও প্রতিক্রিয়া”কে টিস্যু-স্তরে ধরতে সাহায্য করতে পারে—বিশেষ করে যখন টিউমারের ECM শক্ত হয়ে উঠছে এবং সেই শক্ত পরিবেশ কোষকে অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।
চ্যালেঞ্জ, বাংলাদেশি বাস্তবতা এবং গবেষণার বাস্তব প্রভাব
একজন বাংলাদেশি প্রকৌশল শিক্ষকের ক্যান্সার গবেষণায় ঢোকা মানে শুধু বিষয় বদল নয়—ভাষা বদল, ল্যাব-কালচার বদল, এবং সবচেয়ে বড় কথা, নতুন ধরনের প্রশ্নের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। Saif Lab–এ তাঁর কাজের পরিসর দেখলে বোঝা যায়, এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং একা যথেষ্ট নয়; জীববিজ্ঞান, কেমিস্ট্রি, ইমেজিং—সবকিছুর সমন্বয় দরকার। এমন সহযোগিতার কথা Cancer Center at Illinois–এর একটি “Student Spotlight” লেখাতেও এসেছে—বিভিন্ন ল্যাবের বিশেষায়িত দক্ষতা একত্র না হলে একা কাজ করে ফল আনা কঠিন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই গবেষণাকে ভাবতে গেলে জনস্বাস্থ্যের চাপটা সামনে আসে। IARC-এর ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২২ সালে ক্যান্সারের নতুন রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য; পাশাপাশি কোন ক্যান্সার বেশি—সেই চিত্রও আছে (যেমন উভয় লিঙ্গ মিলিয়ে খাদ্যনালী/মুখগহ্বর/ফুসফুসধর্মী ক্যান্সারের বড় উপস্থিতি)। এই বাস্তবতায় ক্যান্সারের “শুধু ওষুধ” নয়—আগাম শনাক্তকরণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, এবং চিকিৎসা-প্রতিক্রিয়া বোঝা—সব জায়গাতেই নতুন টুল ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার।
টিউমারের ECM স্টিফনেস ক্যান্সার প্রগ্রেশন, ইনভেশন, মেটাস্ট্যাসিস, এমনকি ড্রাগ ডেলিভারির বাধা হিসেবেও কাজ করতে পারে—এমন আলোচনা সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বিস্তৃতভাবে আছে; এবং ECM স্টিফনেসকে লক্ষ্য করে থেরাপিউটিক কৌশল নিয়েও গবেষণা এগোচ্ছে। একইভাবে CAF-দের “টার্গেট” বানিয়ে চিকিৎসা উন্নত করার ধারণা আকর্ষণীয় হলেও এটি জটিল—কারণ CAF-দের ভেতর ভিন্নতা আছে, আর সব CAF-ই একইভাবে “খারাপ” নয়—এমন সতর্কতাও রয়েছে। এই জটিলতার ভেতর ড. ইমনের মতো গবেষণার বিশেষ গুরুত্ব হলো—তিনি “মতামত” নয়, “পরিমাপ” সামনে আনছেন: কোন অবস্থায় টিস্যু কতটা শক্ত হলো, কোন কোষ কতটা বল দিল, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের গতি কী—এই সংখ্যা-ভিত্তিক ভাষা ভবিষ্যৎ ক্লিনিকাল গবেষণার ভিত্তি হতে পারে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টি, তরুণদের জন্য পরামর্শ এবং শেষ ভাবনা
ড. ইমনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে আছে গবেষণা-শিক্ষাদানকে একসাথে এগোনো। প্রকাশিত প্রোফাইল অনুযায়ী তিনি শিক্ষা-ল্যাব ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও নিয়েছেন, এবং তাঁর ডক্টরাল/পোস্টডক্টরাল গবেষণার মূল ক্ষেত্র experimental biomechanics, MEMS ও cellular mechanotransduction। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, তাঁর সেন্সর কেবল ক্যান্সার নয়—হেলদি টিস্যু স্টাডি বা টিস্যুর পরিবর্তনে বৈদ্যুতিক/চৌম্বকীয় সিগনাল কীভাবে যুক্ত হতে পারে—সেসব দিকেও ব্যবহার সম্ভব; তবে আপাতত ক্যান্সার গবেষণাকে আরও “ক্লিনিক্যাল স্টেজ”-এর দিকে নেওয়ার লক্ষ্যই প্রধান। এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে তাঁর ল্যাবের সাম্প্রতিক প্রকাশনা-বর্ণনাও সামঞ্জস্যপূর্ণ—যেখানে সেন্সরের সম্ভাব্য ব্যবহার হিসেবে patient-specific drug/phenotypic screening-এর মতো ক্লিনিক্যাল অ্যাসে-দিক উল্লেখ করা হয়েছে।
একজন বিজ্ঞানীর গুণ কী—এই প্রশ্নে তাঁর জবাব ছিল বিস্ময়করভাবে “সাংবাদিক-সুলভ”: প্রশ্ন করতে হবে। কোনো বিষয়কে ‘গিভেন’ ধরে নিলে চলবে না—কেন হলো, কীভাবে হলো—এই কৌতূহল ও critical thinking থাকতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি—প্রশ্ন করে শুধু অন্যের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে নিজে নিজে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে হবে। এই কথার ভেতরেই তিনি গবেষণাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন: প্রশ্ন—খোঁজ—স্পষ্ট ধারণা—বোঝাপড়া।
যারা সামনে বিজ্ঞানী বা গবেষক হতে চায়, তাদের জন্য তাঁর পরামর্শও বাস্তববাদী। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই বুঝতে হবে গবেষণা সত্যিই ভালো লাগে কি না; কারিকুলামের বাইরে শিখতে হবে; দেশে সুযোগ বাড়লেও বিদেশে সুযোগও অনেক—তাই সময় নষ্ট না করে প্রোঅ্যাকটিভ হয়ে স্কলারশিপ/ফেলোশিপে আবেদন করতে হবে।
ড. ইমনের গল্প শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এক দ্বিমুখী বার্তা হয়ে থাকে। একদিকে এটি দেখায়—শাখা বদলানো “ভুল” নয়; বরং সমাজের বড় সমস্যাকে ধরতে গেলে অনেক সময় নতুন শাখা, নতুন ভাষা, নতুন টুল শিখতে হয়। অন্যদিকে এটি মনে করিয়ে দেয়—জাতীয় পরিচয় শুধু দেশের সীমানায় আটকে নেই; বিশ্বমানের গবেষণাগারে বসেও বাংলাদেশি কেউ মানুষের জীবনের পক্ষে কাজ করতে পারেন—ক্ষুদ্র এক কোষের ন্যানো-নিউটনের টান মেপে বড় এক রোগের রহস্য উন্মোচনের পথে। এই পথচলা নিছক ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—এটি দেশের বৈজ্ঞানিক আত্মবিশ্বাসেরও এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
Contact info:
তার বিজ্ঞানের কাজ সমন্ধে আরো বিস্তারিত জানার জন্য নিম্নে ড. বাশার ইমন এর সাথে যোগাযোগ করুন
- ইমেইল [email protected] ঠিকানায়।
- গুগল স্কলার লিংক: https://scholar.google.com/citations?user=-uHpmLYAAAAJ&hl=en
- লিংকডইন: https://www.linkedin.com/in/bashar-emon-12b0ab9a/

Leave a comment