“গ্রাম থেকে শুরু করা মানে পিছিয়ে থাকা নয়; স্বপ্ন, পরিশ্রম ও শেখার আগ্রহ থাকলে গ্রামের পথও একদিন আন্তর্জাতিক গবেষণাগারের দরজায় পৌঁছে দিতে পারে।”
বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, ভালো স্কুলে না পড়লে, বড় শহরে না বড় হলে, আধুনিক ল্যাবরেটরি বা উন্নত সুযোগ-সুবিধা না পেলে বিজ্ঞানী হওয়া কঠিন। বিশেষ করে গ্রামের শিক্ষার্থীদের মনে প্রায়ই একটি অদৃশ্য ভয় কাজ করে—“আমরা কি পারব?” কিন্তু অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবনগল্প এই ভয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি একেবারে গ্রামের ছেলে। জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম, কাঁচা রাস্তা, সাধারণ স্কুল, সীমিত সুযোগ—এই পরিবেশেই তাঁর শৈশব কেটেছে। ছোটবেলায় তাঁর হাতে ছিল না আধুনিক ল্যাব, ছিল না বড় শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুবিধা। কিন্তু ছিল আনন্দময় শৈশব, পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ, এবং ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলার চেষ্টা।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শুরুটা কোথা থেকে হলো, সেটিই শেষ কথা নয়। একজন শিক্ষার্থী গ্রামের স্কুল থেকে শুরু করেও বড় হতে পারে, যদি তার মধ্যে শেখার আগ্রহ থাকে, ভালো দিকনির্দেশনা পাওয়ার চেষ্টা থাকে এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত না বানানোর মানসিকতা থাকে।
ড. হাফিজুর রহমানের শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল সাধারণ। প্রাইমারি স্কুল থেকে হাই স্কুল—সবকিছুই গ্রামীণ পরিবেশে। পরে এসএসসি পাস করার পর তিনি ইন্টারমিডিয়েট পড়তে যান যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। এটাই ছিল তাঁর গ্রাম থেকে শহরমুখী শিক্ষাযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু শহরে যাওয়াই তাঁর সাফল্যের একমাত্র কারণ নয়; আসল কারণ ছিল নিজেকে বদলানোর প্রস্তুতি।
প্রথমদিকে রসায়ন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল না। বরং গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর টান বেশি ছিল। কিন্তু একজন সিনিয়রের দিকনির্দেশনায় রসায়নের ভিত্তি বুঝতে শুরু করার পর ধীরে ধীরে বিষয়টি তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে। এখানেই বোঝা যায়—গ্রামের শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু সুযোগ নয়, সঠিক মানুষ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং শেখার পরিবেশ।
পরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে তিনি গবেষণার জগৎ সম্পর্কে জানতে শুরু করেন। তাঁর শিক্ষকরা তাঁকে গবেষণাপত্র পড়া, গবেষণা-পদ্ধতি বোঝা, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া—এসব বিষয়ে উৎসাহিত করেন। তখনকার সময়ে আজকের মতো ইমেইল, অনলাইন আবেদন, গুগল সার্চ এত সহজ ছিল না। বিদেশে পড়তে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা বই থেকে খুঁজে চিঠি লিখে পাঠাতে হতো। তবু তিনি চেষ্টা করেছেন। বারবার চেষ্টা করেছেন। এই চেষ্টা একসময় তাঁকে জাপানের তোয়োহাশি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষণাগারে পৌঁছে দেয়।
এখানে একটি বড় শিক্ষা আছে। সুযোগ কম থাকলে চেষ্টা থেমে থাকতে পারে—এমন ধারণা ভুল। সুযোগ কম থাকলে চেষ্টা আরও পরিকল্পিত হতে হয়। গ্রামের শিক্ষার্থীদের অনেক সময় শহরের শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, বেশি খুঁজতে হয়, বেশি প্রশ্ন করতে হয়। কিন্তু সেটি দুর্বলতা নয়; বরং এই সংগ্রামই তাদের শক্তি তৈরি করতে পারে।
জাপানে গিয়ে ড. হাফিজুর রহমান নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন—ভাষা, সংস্কৃতি, গবেষণার কঠোরতা, ল্যাবের নিয়ম, দীর্ঘ সময় কাজ করা। প্রথম এক থেকে দেড় বছর ভালো গবেষণার ফল পাননি। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। তিনি জুনিয়র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও যন্ত্রপাতি চালানো শিখেছেন। কারণ তাঁর কাছে শেখাটাই ছিল বড়; কে শেখাচ্ছে, সেটি বড় নয়।
একজন গ্রামের শিক্ষার্থীর জন্য এই মনোভাব অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় আমরা ভাবি, “আমি তো ছোট জায়গা থেকে এসেছি, আমি পারব না।” অথচ সত্য হলো—যে শেখার জন্য প্রস্তুত, সে যেকোনো জায়গা থেকেই এগিয়ে যেতে পারে। গ্রামের শিক্ষার্থী যদি প্রশ্ন করতে শেখে, বই পড়তে শেখে, ভালো শিক্ষক বা সিনিয়রের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শেখে, ইন্টারনেটের শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে শেখে, তাহলে তার পথ ধীরে ধীরে খুলে যায়।
আজ ড. হাফিজুর রহমান পরিবেশবান্ধব পলিমার, বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণ এবং পানি থেকে বিষাক্ত ভারী ধাতু অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণার সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক আছে—দূষিত পানি, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক সমস্যা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য। অর্থাৎ গ্রামের ছেলে হয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাগারে পৌঁছেই তিনি থেমে যাননি; তিনি সেই জ্ঞানকে বাংলাদেশের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
এই জায়গাটিই তাঁর গল্পকে আরও অর্থবহ করে তোলে। কারণ সাফল্য শুধু বিদেশে পিএইচডি করা নয়; সাফল্য হলো সেই জ্ঞান দিয়ে নিজের দেশের সমস্যাকে নতুন চোখে দেখা।
বাংলাদেশের গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর জীবন তাই এক শক্তিশালী বার্তা দেয়—আপনার স্কুল ছোট হতে পারে, আপনার গ্রামে ল্যাব না থাকতে পারে, আপনার শহরের মতো কোচিং বা লাইব্রেরি না থাকতে পারে; কিন্তু আপনার কৌতূহল ছোট হওয়া চলবে না। আপনার স্বপ্নকে ছোট করা চলবে না।
আপনি যদি বেসিক বুঝে পড়েন, প্রশ্ন করতে ভয় না পান, ভালো দিকনির্দেশনা খুঁজে নেন, ধীরে ধীরে নিজেকে তৈরি করেন—তাহলে আপনার গ্রামের পথও একদিন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং বৈশ্বিক জ্ঞানের দরজায় পৌঁছে দিতে পারে।
গ্রাম কোনো বাধা নয়। বাধা হলো আত্মবিশ্বাস হারানো।
সুযোগের অভাব বড় সমস্যা, কিন্তু শেখার আগ্রহের অভাব তার চেয়েও বড় সমস্যা।
যে শিক্ষার্থী নিজের সীমাবদ্ধতাকে বুঝে, কিন্তু সেটিকে অজুহাত বানায় না—সেই একদিন নিজের পথ নিজেই তৈরি করে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন আমাদের সেই পথ দেখায়।
তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার

Leave a comment