মতামত: বর্তমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোন বুদ্ধিমত্তা নেই, একে “ডিজিটাল সহকারী” বলা উচিত

২০২৩ বছরকে বলা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বছর। কিন্তু আমরা একটি সিস্টেমকে “বুদ্ধিমত্তা” বলছি, তা কি ঠিক হচ্ছে? আমরা “বুদ্ধিমত্তা” বলতে যা বুঝি তার সাথে বর্তমানের এআই সিস্টেমগুলির কোন মিল নেই। কিছু কিছু কাজ দেখে আমরা এটিকে বুদ্ধিমত্তা বলে বিভ্রান্ত হচ্ছি মাত্র। আমার মতে এটিকে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” না বলে বরং “ডিজিটাল অ্যাসিস্ট্যান্ট” বলার পক্ষে। কেনই বা বলছি তার পিছনের যুক্তিগুলি হল নিম্নরূপ:

বুদ্ধিমত্তা বলতে আমরা সাধারণত এটি বুঝি, জীবিত প্রাণী এবং তাদের জ্ঞান এবং চিন্তা করার ক্ষমতা। আপাতত “জীবিত” শব্দটি আমরা অগ্রাহ্য করি, কেননা আমরা মানুষের তৈরি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা কোন সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করছি যা- জীবিত প্রাণীর মধ্যে পড়ে না।

আধুনিক এআই সিস্টেমগুলিকে অন্যান্য সফটওয়্যার সরঞ্জামগুলির মতো উন্নত ডেটা সংগ্রহকারী এবং বিশ্লেষক হিসাবে দেখা যেতে পারে। এই কাজগুলি করতে পারবে এমন সিস্টেম কিন্তু এর আগেও ছিল এবং তা আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করে আসছি। কিন্তু সেই সিস্টেমগুলিতে বিশ্লেষণ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে এটিকে তথ্য প্রদান করতে হতো এবং সেই কাজগুলি করে নেবার জন্য সিস্টেমটি বুঝবে এমন ভাষায় তাকে নির্দেশনা দিতে হতো যাকে আমরা কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ভাষা বলি।

তবে সেই সিস্টেম থেকে বর্তমানের এআই সিস্টেমগুলি আমাদের ভাষা বোঝার এক অনন্য ক্ষমতা রাখে। এর মানে হল যে আপনি এআই সিস্টেমের সাথে সাধারণ ইংরেজি বা আপনার পছন্দের অন্য কোন ভাষা দিয়ে এটিকে নির্দেশনা দিতে পারবেন। কেননা বাংলা কিংবা অন্য কোন ভাষা বোঝার জন্য এর রয়েছে নিজস্ব অনুবাদের মডিউল।

অধিকন্তু এআই-কে প্রথমেই প্রচুর পরিমাণে সাধারণ কিছু তথ্য দেয়া আছে যা আমাদের সচরাচর প্রয়োজন হয়। এআই-কে সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি এমন তথ্যের উপর ভিত্তি করে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না – যা একে প্রদান করা হয়নি। তার বিশাল পরিমাণে তথ্যভান্ডার এবং কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ছাড়াই সাধারণ নির্দেশনা বোঝার ক্ষমতা রয়েছে। এর পাশাপাশি এটি খুব দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে আমাদের নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করতে পারে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এআই তো আমাদের ভাষায় নির্দেশাবলি বুঝে কাজ করে এবং বিশাল তথ্যভান্ডারে অ্যাক্সেস করতে পারে- তবে কেন এটিকে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” বলা যাবে না? কারণ হল এআই সিস্টেমগুলি প্রকৃত অর্থে বুদ্ধিমত্তার অধিকারী নয়। এটি বুদ্ধিমান বলে মনে হতে পারে কারণ এটি এমন কাজগুলি সম্পূর্ণ করতে পারে যা আমরা সাধারণত বুদ্ধিমত্তার সাথে যুক্ত করি। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় তাকে একটি রচনা দিলাম এবং সেটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ সারাংশ তৈরি করে দিতে। সেটি এই এআই সিস্টেমগুলি দ্রুততার সাথে পরবে কেননা; গত কয়েক দশক ধরে প্রকৌশলী এবং বিজ্ঞানীরা এই মডিউলগুলি এবং অ্যালগরিদম গুলি তৈরি করেছে কীভাবে এই কাজটি করা যায়। ঠিক একইভাবে আপনার হাতের ক্যালকুলেটর যেভাবে কাজ করে। এখন ক্যালকুলেটরকে আমরা বুদ্ধিমান যন্ত্র বলি না, কিন্তু ভুল বসতো এআই সিস্টেমগুলিকে আমরা বুদ্ধিমত্তার সাথে সংযুক্ত করে ফেলছি। এটির নিজস্ব কোনো চিন্তা বা ভাবনা করার ক্ষমতা নেই। আপনি দেখবেন যদি একে কোন বিষয়ের উপর মন্তব্য দিতে বলেন, তা সে দিতে পারবে না। কেননা সেটি হবে আরো ভয়ংকর।

আমি মনে করি এআই-এর জন্য আরও উপযুক্ত শব্দ হবে “ডিজিটাল সহকারী”। এটিকে আমরা একটি সাধারণ টুল বা যন্ত্র মতন একটি সিস্টেম হিসাবেই দেখতে পারি যেমন আমরা কম্পিউটারে বিভিন্ন ধরনে সফটওয়্যার ব্যবহার করি।

এআই-কে বুদ্ধিমান হিসাবে ভাবতে পারি কারণ, এটি এমন কিছু কাজ করতে পারে যার জন্য একটি নির্দিষ্ট স্তরের জ্ঞান বা দক্ষতার প্রয়োজন হয়, যেমন শেখানো বা ইন্টারনেট অনুসন্ধান করা। যাই হোক, এই ক্ষমতাগুলি প্রকৌশলীদের দ্বারা যত্ন সহকারে প্রশিক্ষিত এবং বিকশিত হয়েছে গত কয়েক দশক ধরেই। ফলশ্রুতিতে এআই-কে একজন বুদ্ধিমান সত্তার চেয়ে একটি অত্যাধুনিক “ডিজিটাল সহকারী” করে তুলেছে।

বিভ্রান্তির আরেকটি কারণ হল এআই-এর সৃজনশীল হওয়ার আপাত ক্ষমতা, যেমন কবিতা লেখা বা ছবি আঁকার মতন শৈল্পিক কোন কাজ করতে পারা। কিন্তু এই আউটপুটগুলিকে “সৃজনশীল” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করার সময় আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে—এটি একটি সুন্দর অ্যালগরিদম, কিন্তু “বুদ্ধিমত্তার” সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। এআই-এর “সৃজনশীলতা” বিদ্যমান ইনপুট এবং অ্যালগরিদম থেকে উদ্ভূত হয়েছে, সত্যিকারের অনন্য সৃজনশীল প্রক্রিয়া থেকে নয়। সে বিভিন্ন ছবি দেখে তার মধ্যে একটি প্যাটার্ন বের করে নিজে থেকেই একটি নতুন কিছু গড় করে কিংবা কোন অ্যালগরিদম ব্যবহার করে প্রদর্শন করছে। আর আমরা একে শৈল্পিক বুদ্ধিমত্তা ভেবে বিভ্রান্ত হচ্ছি।

উপসংহারে, একজন প্রযুক্তিবিদে হিসাবে, আমি মনে করি যে “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার” পরিবর্তে বর্তমানের এআই-কে আমি “ডিজিটাল সহকারী” হিসাবে সংজ্ঞায়িত করার পক্ষে। বুদ্ধিমান শব্দ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার কারণে সবাইকে বিভ্রান্ত করছি। মানুষের কাজ বন্ধ হয়ে যাবে, ভবিষ্যতে মানুষকে এআই নিয়ন্ত্রণ করবে জাতীয় বিভ্রান্ত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর এই বিভ্রান্তের সুযোগ নিয়ে এটিকে বন্ধ করার মত ভ্রান্ত উদ্যোগ নিচ্ছে যারা একটু আলোচনায় আসার জন্য উন্মুখ। এআই অন্য যেকোনো সাধারণ সফটওয়্যার বা সিস্টেম – যার রয়েছে বিশাল তথ্যভান্ডার এবং আমাদের সাধারণ ভাষার নির্দেশনা বোঝার ক্ষমতা। আসুন আমরা একটি বলি -“ডিজিটাল সহকারী”।

ড. মশিউর রহমান

About ড. মশিউর রহমান

ড. মশিউর রহমান বিজ্ঞানী.অর্গ এর cofounder যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সনে। পেশাগত জীবনে কাজ করেছেন প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী ও শিক্ষক হিসাবে আমেরিকা, জাপান, বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরে। বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ডিজিটাল হেল্থকেয়ারে যেখানে তার টিম তথ্যকে ব্যবহার করছেন বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবার জন্য। বিস্তারিত এর জন্য দেখুন: DrMashiur.com

Check Also

কোয়ান্টাম যোগাযোগে নতুন যুগ: কুডিটের আবির্ভাব

কোয়ান্টাম প্রযুক্তি হলো এমন একটি প্রযুক্তি যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মূলনীতি ও তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে …

ফেসবুক কমেন্ট


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।