এসো শিখিকলামগবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

“করে দিন” নয়, “শিখিয়ে দিন”— ড. মো. হাফিজুর রহমান

Share
Share

“গবেষণায় বড় হতে চাইলে আগে শিখতে হবে—‘স্যার, করে দিন’ নয়; বলতে হবে, ‘স্যার, আমাকে শিখিয়ে দিন।’”

শিক্ষাজীবনে আমরা অনেক সময় দ্রুত ফল চাই। অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, প্রেজেন্টেশন বানাতে হবে, গ্রাফ আঁকতে হবে, গবেষণাপত্র লিখতে হবে—তখন অনেক শিক্ষার্থী সহজ পথ খোঁজে। কেউ ভাবে, “স্যার যদি করে দেন, তাহলে কাজটা ভালো হবে।” কেউ আবার সিনিয়র বা শিক্ষকের ওপর নির্ভর করে নিজের শেখার সুযোগটাই হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের গবেষণাজীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন শিক্ষা দেয়। তাঁর মতে, একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় গুণ হলো শেখার আগ্রহ। গবেষণায় এগোতে চাইলে শুধু কাজ শেষ করা নয়, কাজটি কীভাবে করতে হয়—তা বুঝে নেওয়া জরুরি। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুনতে চান না, “স্যার, ফিগারটা বানিয়ে দেন।” বরং তিনি চান শিক্ষার্থী বলুক, “স্যার, আমাকে ফিগার বানানো শিখিয়ে দিন।”

এই কথার ভেতরে গবেষক হওয়ার একটি মৌলিক দর্শন আছে।

গবেষণা কোনো প্রস্তুত উত্তর মুখস্থ করার কাজ নয়। গবেষণা হলো প্রশ্ন করা, ভুল করা, আবার চেষ্টা করা, তথ্য বিশ্লেষণ করা, নতুনভাবে ভাবা এবং নিজের হাতে দক্ষতা তৈরি করার প্রক্রিয়া। এখানে কেউ যদি সব সময় অন্যের ওপর নির্ভর করে, তবে সে হয়তো কোনো একটি কাজ শেষ করতে পারবে, কিন্তু গবেষক হিসেবে বড় হতে পারবে না।

ড. হাফিজুর রহমান নিজের জীবনেও এই শেখার মনোভাব ধরে রেখেছেন। জাপানের গবেষণাগারে গিয়ে তিনি দেখেছেন, অনেক যন্ত্রপাতি ও গবেষণাপদ্ধতি তাঁর কাছে নতুন। সেখানে তিনি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও মেশিন চালানো শিখেছেন। কারণ গবেষণায় কে সিনিয়র, কে জুনিয়র—তা শেষ কথা নয়। যে কাজ জানে, যে দক্ষ, যে বাস্তবে করতে পারে—তার কাছ থেকেই শেখা যায়।

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীর একটি সমস্যা হলো, তারা ফলাফল চায়, কিন্তু প্রক্রিয়াটি শেখার ধৈর্য রাখে না। গ্রাফ বানানো, ডাটা বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার ব্যবহার, গবেষণাপত্রের কাঠামো বোঝা, রেফারেন্স সাজানো—এসবকে তারা ছোট কাজ মনে করে। অথচ গবেষণার বড় কাজগুলো এই ছোট ছোট দক্ষতার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।

একটি সুন্দর গ্রাফ শুধু ছবি নয়; এটি ডাটার ভাষা।

একটি ভালো টেবিল শুধু সংখ্যা নয়; এটি গবেষণার যুক্তি।

একটি গ্রাফিক্যাল অ্যাবস্ট্রাক্ট শুধু ডিজাইন নয়; এটি পুরো গবেষণার ধারণাকে সহজভাবে তুলে ধরার ক্ষমতা।

একটি গবেষণাপত্র শুধু লেখা নয়; এটি চিন্তা, পদ্ধতি, বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক সততার সম্মিলিত রূপ।

তাই শিক্ষার্থী যদি এসব নিজে না শেখে, তবে সে গবেষণার ভিত তৈরি করতে পারে না।

ড. হাফিজুর রহমান বলেছেন, তাঁর অনেক শিক্ষার্থী এখন এমন মানের কাজ করতে পারে, যা তিনি নিজে মাস্টার্সের পর শিক্ষক হওয়ার সময়ও করতে পারতেন না। তারা ভালো গ্রাফিক্যাল অ্যাবস্ট্রাক্ট বানাতে পারে, সুন্দর প্রেজেন্টেশন দিতে পারে, ইংরেজিতে ভালোভাবে গবেষণা ব্যাখ্যা করতে পারে। এর অর্থ হলো, নতুন প্রজন্মের সামনে সুযোগ আছে; কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে তাদের হাতে-কলমে শেখার মানসিকতা থাকতে হবে।

আজকের দিনে ইউটিউব, অনলাইন কোর্স, গবেষণাপত্রের ডাটাবেস, সফটওয়্যার টিউটোরিয়াল—সবকিছু আগের তুলনায় অনেক সহজলভ্য। কিন্তু শুধু রিসোর্স থাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সক্রিয় শেখা। একজন শিক্ষার্থীকে নিজে চেষ্টা করতে হবে, ভুল করতে হবে, আবার সংশোধন করতে হবে। শিক্ষক বা মেন্টরের কাজ হলো পথ দেখানো; শিক্ষার্থীর কাজ হলো সেই পথে হাঁটা।

এই জায়গায় “করে দিন” এবং “শিখিয়ে দিন”—এই দুই বাক্যের পার্থক্য বিশাল।

“করে দিন” মানে আমি ফল চাই, কিন্তু দক্ষতা চাই না।

“শিখিয়ে দিন” মানে আমি আজ সময় দেব, ভুল করব, কষ্ট করব—কিন্তু একদিন নিজে পারব।

যে শিক্ষার্থী দ্বিতীয় বাক্যটি বলতে শেখে, তার মধ্যেই ভবিষ্যৎ গবেষকের বীজ থাকে।

গবেষণায় বড় হতে হলে নিজের দায়িত্ব নিতে হয়। শুধু শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়, ল্যাব বা ফান্ডের ওপর দোষ চাপালে হয় না। সীমাবদ্ধতা থাকবে—যন্ত্রপাতি কম থাকবে, ফান্ড কম থাকবে, জার্নাল প্রত্যাখ্যান করবে, ইংরেজি দুর্বল হতে পারে। কিন্তু এসবের মাঝেও যে শিখতে থাকে, সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

ড. হাফিজুর রহমানের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তাটি খুব পরিষ্কার—গবেষণার জগতে মূল্য পায় সেই মানুষ, যে কাজ পারে। পদবি নয়, দক্ষতা; মুখস্থ নয়, বোঝাপড়া; নির্ভরতা নয়, শেখার আগ্রহ—এসবই একজন তরুণকে গবেষণার পথে এগিয়ে দেয়।

তাই আজ যারা গবেষণায় আসতে চায়, তাদের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—“আমার জন্য কে কাজ করে দেবে?”

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—“আমি কীভাবে শিখব?”

“কোন সফটওয়্যার শিখব?”

“কীভাবে গবেষণাপত্র পড়ব?”

“কীভাবে ডাটা বিশ্লেষণ করব?”

“কীভাবে ভালো প্রেজেন্টেশন তৈরি করব?”

“কীভাবে ভুল থেকে শিখব?”

কারণ গবেষক তৈরি হয় শেখার অভ্যাস থেকে। আর সেই অভ্যাস শুরু হয় বিনয় দিয়ে—যে বিনয় একজন শিক্ষার্থীকে বলতে শেখায়, “স্যার, আমাকে শিখিয়ে দিন।”

তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles