ছবি: টেলিফোনের বিবর্তনের ছবি। উৎস: Smithsonian Institution
লেখক: সাদ আব্দুল ওয়ালী | সম্পাদকীয় পর্যালোচনায়: মো. মঞ্জুরুল ইসলাম | তথ্য যাচাই: মো. ইফতেখার হোসেন
প্রকাশ: ২৭ মে ২০১৭ | সর্বশেষ হালনাগাদ: ২০ অক্টোবর ২০২৬
রাত তখন গভীর।
হাতের ফোনটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল হাজার মাইল দূরের একটা মুখ।
“কেমন আছ?”
এক সেকেন্ডও লাগল না।
কেউ কাউকে চিঠি লিখল না, দিনের পর দিন অপেক্ষাও করল না।
অথচ এই সহজ ব্যাপারটার পেছনে আছে একটা লম্বা গল্প।
একটি যন্ত্র, অনেক দূরত্ব
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের মাঝে যে যোগাযোগের সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে, তার পেছনে অন্যতম প্রধান নিয়ামক একটি যন্ত্র।
সেই যন্ত্রটির নাম টেলিফোন।
কিন্তু প্রশ্ন দুটি:
• কীভাবে এই যন্ত্রটি আবিষ্কৃত হলো?
• কীভাবে সময়ের সঙ্গে বদলে এটি আজকের আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠল?
একসময় এই যন্ত্রে শুধু তারের সাহায্যে দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা যেত।
প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই টেলিফোনই আজ মোবাইল ফোন ও স্মার্টফোনে রূপ নিয়েছে।
এর বদৌলতে দূরের মানুষ খুব কাছে চলে এসেছে।
এক নাম, অনেক হাত
টেলিফোন আবিষ্কারের ইতিহাসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের নাম।
তবে টেলিফোন কোনো একজন ব্যক্তির একক প্রচেষ্টায় হঠাৎ আবিষ্কৃত হয়নি।
উনিশ শতকে মানুষের কণ্ঠস্বরকে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে দূরে পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন একাধিক উদ্ভাবক।
জার্মান উদ্ভাবক জোহান ফিলিপ রাইস ১৮৬০-এর দশকেই শব্দ ও কণ্ঠস্বর বৈদ্যুতিকভাবে দূরে পাঠানোর একটি যন্ত্র তৈরি করেছিলেন।

ছবি: সারি দিয়ে দাঁড়ানো কয়েকজন উদ্ভাবকের ছায়ামূর্তি, প্রত্যেকের হাতে শব্দতরঙ্গ বা তারের চিহ্ন, মাঝখানে একটি টেলিফোনের চিহ্নের দিকে টিল রঙের সরু রেখা। ছবির লেখা: “একটি আবিষ্কার, অনেক উদ্ভাবক” (প্রতীকী ছবি)
পরবর্তীতে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, এলিশা গ্রে এবং আরও কয়েকজন উদ্ভাবক টেলিফোন প্রযুক্তিকে কার্যকর করার জন্য গবেষণা চালিয়ে যান।
১৮৭৬: একই দিনের দুটি দাখিল
১৮৭৬ সালে বেল ও গ্রে প্রায় একই সময়ে টেলিফোন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছিলেন।
তারপর যা ঘটল:
• ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৬: বেলের পক্ষ থেকে টেলিফোন-সংক্রান্ত পেটেন্ট আবেদন জমা পড়ে
• একই দিনে কয়েক ঘণ্টা পর: এলিশা গ্রে একই ধরনের আবিষ্কারের জন্য একটি ‘কেভিয়েট’ দাখিল করেন
• ৭ মার্চ ১৮৭৬: বেল মার্কিন পেটেন্ট নম্বর ১৭৪,৪৬৫ লাভ করেন
পেটেন্টটির নাম ছিল “Improvement in Telegraphy”।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে টেলিফোন আবিষ্কারের স্বত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
এটিকেই সাধারণভাবে বেলের টেলিফোন আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে ধরা হয়।
টেলিগ্রাফ থেকে কণ্ঠস্বরের পথে
গ্রাহাম বেল মূলত শব্দ, শ্রবণ এবং টেলিগ্রাফ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
টেলিগ্রাফের মাধ্যমে একসঙ্গে একাধিক বার্তা পাঠানোর পদ্ধতি উন্নত করতে গিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন:
বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে কি মানুষের কণ্ঠস্বরও দূরে পাঠানো যায়?
তাঁর গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য ছিল কণ্ঠস্বরের কম্পনকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে তারের মাধ্যমে অন্য প্রান্তে পাঠানো।
এ কাজে তাঁর সহকারী থমাস ওয়াটসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পদ্ধতিটা ছিল এমন:
• শব্দের কম্পন একটি পাতলা ডায়াফ্রামকে কাঁপিয়ে দিত
• সেই কম্পনের প্রভাবে বৈদ্যুতিক সংকেতের পরিবর্তন ঘটত
• তারের মাধ্যমে তা অন্য প্রান্তে পৌঁছাত
• সেখানে আবার সেই সংকেতকে শব্দে রূপান্তর করা সম্ভব হতো

ছবি: তীরচিহ্নে যুক্ত চারটি চিহ্নের সারি: কণ্ঠস্বর (মুখ ও শব্দতরঙ্গ), কম্পন (পাতলা ডায়াফ্রাম), সংকেত (তারে বৈদ্যুতিক স্পন্দন), শব্দ (কান)।
এভাবেই মানুষের কণ্ঠস্বরকে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে দূরে পাঠানোর বাস্তব পদ্ধতি তৈরি হয়।
স্প্রিংয়ের টংকারের গল্প কতটা সত্য?
প্রচলিত কিছু লেখায় বলা হয়, ১৮৭৫ সালের দিকে তারের ভেতর একটি স্প্রিংয়ের টংকার শুনে বেল হঠাৎ টেলিফোনের মূল ধারণা পেয়ে যান।
ঘটনাটি তাঁর গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে টেলিফোন আবিষ্কারকে শুধু ওই একটি ঘটনার ফল হিসেবে দেখার চেয়ে, তাঁর দীর্ঘদিনের শব্দ ও টেলিগ্রাফ গবেষণার ধারাবাহিক ফল হিসেবে দেখা বেশি সঠিক।
১০ মার্চ ১৮৭৬: টেলিফোনে প্রথম কথা
টেলিফোন আবিষ্কারের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১০ মার্চ ১৮৭৬ সালে।
সেদিন বেল তাঁর সহকারী থমাস ওয়াটসনের কাছে পরীক্ষামূলক টেলিফোনের মাধ্যমে কথা বলতে সক্ষম হন।
বেলের গবেষণার নথিতে এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণভাবে সংরক্ষিত রয়েছে।
এর মাত্র তিন দিন আগেই, ৭ মার্চ, তিনি টেলিফোনের পেটেন্ট লাভ করেছিলেন।
এই সফল পরীক্ষায় প্রমাণ হয়:
বৈদ্যুতিক সংকেতের সাহায্যে মানুষের বোধগম্য কণ্ঠস্বর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো সম্ভব।
এর মধ্য দিয়েই আধুনিক টেলিফোন যোগাযোগের একটি নতুন যুগের সূচনা হয়।
পরবর্তীতে ১৮৭৬ সালের ফিলাডেলফিয়া সেন্টেনিয়াল এক্সপোজিশনে বেল তাঁর টেলিফোন প্রদর্শন করেন।
তাঁর পরীক্ষামূলক টেলিফোনের একটি নমুনা বর্তমানে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের সংগ্রহেও সংরক্ষিত রয়েছে।
তার ছেড়ে বাতাসে
টেলিফোনের শুরুর যুগে কথা বলার জন্য তারের ওপর নির্ভর করতে হতো।
• এক প্রান্তে কণ্ঠস্বরের কম্পন বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত হতো
• সেই সংকেত তারের মাধ্যমে অন্য প্রান্তে পৌঁছাত
• সেখানে আবার শব্দে রূপান্তরিত হয়ে শ্রোতার কাছে যেত
সময়ের সঙ্গে এই প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।
সংযোগব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, যোগাযোগের পরিধি বেড়েছে।
পরে বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশে তার ছাড়াই দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে।
প্রথমদিকে তারযুক্ত টেলিফোন নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করে ব্যবহার করতে হতো।
পরে কর্ডলেস ফোন এবং মোবাইল ফোন মানুষের চলাফেরার মধ্যেও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।
ফলে ফোন ব্যবহারে নির্দিষ্ট জায়গার ওপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কমে যায়।
পকেটে চলে এল টেলিফোন
টেলিফোন প্রযুক্তির বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো মোবাইল ফোন।
তারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্থানে সংযুক্ত টেলিফোন থেকে প্রযুক্তি ধীরে ধীরে বেতার যোগাযোগের দিকে এগিয়ে যায়।
মোবাইল ফোনে মানুষ চলাফেরা করার সময়ও অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে যুক্ত হয়:
• বার্তা পাঠানো
• ছবি তোলা
• ইন্টারনেট ব্যবহার
আরও পরে স্মার্টফোনের মাধ্যমে ফোন একটি বহুমুখী ডিজিটাল যন্ত্রে পরিণত হয়।
আজ একটি স্মার্টফোন দিয়ে শুধু কথা বলা নয়, করা যায়:
• ভিডিও কল
• ছবি ও ভিডিও ধারণ
• ই-মেইল
• সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার
• অনলাইন লেনদেন
• তথ্য অনুসন্ধান
আর এমন আরও অসংখ্য কাজ।
টেলিফোনের আজকের চেহারা
একসময় টেলিফোন বলতে মূলত তারের মাধ্যমে সংযুক্ত একটি নির্দিষ্ট যন্ত্রকে বোঝানো হতো।
এখন সেই ধারণা অনেক বিস্তৃত।
ল্যান্ডফোন, কর্ডলেস ফোন, মোবাইল ফোন এবং স্মার্টফোন সবই টেলিফোন প্রযুক্তির দীর্ঘ বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ের উদাহরণ।

ছবি: ক্রমশ আরও আধুনিক হওয়া চারটি যন্ত্রের সারি, টিল রঙের সরু রেখায় যুক্ত: “ল্যান্ডফোন”, “কর্ডলেস”, “মোবাইল”, “স্মার্টফোন”।
আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থায় ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার টেলিফোনকে আরও বহুমুখী করে তুলেছে।
এখন পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ কয়েক সেকেন্ডেই অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
শুধু কণ্ঠস্বর নয়, ভিডিও, ছবি, লিখিত বার্তা এবং নানা ধরনের তথ্যও মুহূর্তে আদান-প্রদান করা সম্ভব।
একটি তারের শেষ প্রান্তে আজকের পৃথিবী
১৮৭৬ সালের টেলিফোন থেকে আজকের স্মার্টফোনে পৌঁছানোর এই যাত্রা আসলে যোগাযোগ প্রযুক্তির দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস।
বেলের সময় মানুষের কণ্ঠস্বর তারের মাধ্যমে দূরে পাঠানোই ছিল বড় বৈজ্ঞানিক সাফল্য।
আজ সেই প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব।
সময়ের সঙ্গে এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা, গবেষণা ও সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
টেলিফোনের আবিষ্কার শুধু একটি নতুন যন্ত্রের জন্ম দেয়নি, এটি মানুষের যোগাযোগের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে।
পরের বার ফোন বেজে উঠলে
আজ সন্ধ্যায় ফোনটা হাতে নিয়ে একটু থামুন।
ওপাশে যে কণ্ঠ ভেসে আসছে, তা একসময় তারের ভেতর দিয়ে কয়েক ঘর পেরোনোই ছিল বিস্ময়।
আর এখন সেই কণ্ঠ আপনার পকেটে।
কে জানে, আজকের বিস্ময়টাই হয়তো আরেক শতকের সাধারণ ব্যাপার।
তথ্যসূত্র
১। Library of Congress, “Who is credited with inventing the telephone?”
২। Smithsonian Institution, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের পরীক্ষামূলক টেলিফোন ও সংশ্লিষ্ট সংগ্রহ।
সম্পাদনা নোট: তথ্য যাচাই ও প্রয়োজনীয় ভাষাগত সম্পাদনা করা হয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২০ অক্টোবর ২০২৬

Leave a comment