পরিবেশ ও পৃথিবীবিজ্ঞান বিষয়ক খবর

সাত কোটি বছরের পাখির পথচলা: আর্কটিকের আদি পরিযান রহস্য

Share
Share

প্রতিবছর বসন্ত এলেই প্রায় দুই শত প্রজাতির পাখি ধাবিত হয় আর্কটিকের দিকে—সেখানে তারা ডিম পাড়ে, বাচ্চা বড় করে, তারপর শীত পড়লেই দক্ষিণে ফিরে আসে। আজকের দিনে এই পাখিদের যাত্রা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হলেও, একসময় বিজ্ঞানীরা ভাবতেন—কবে থেকে শুরু হয়েছিল এই পরিযানের প্রথা? উত্তর আলাস্কার বরফে মোড়া ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক আবিষ্কার যেন সেই প্রশ্নের বহু পুরোনো উত্তর নিয়ে এসেছে।

প্যালিয়নটোলজিস্টরা সেখানে পেয়েছেন পঞ্চাশটিরও বেশি ত্রিমাত্রিকভাবে সংরক্ষিত পাখির হাড়ের জীবাশ্ম, সঙ্গে অসংখ্য দাঁত, যেগুলোর অনেকগুলো আবার পাখির ছানাদের। প্রমাণ মিলেছে যে, ক্রিটেশাস যুগে, আজ থেকে অন্তত ৭ কোটি ৩০ লক্ষ বছর আগে, অ- পাখি ডাইনোসরের পাশেই তিন ধরনের পাখি ছিল উত্তর আলাস্কায়। অর্থাৎ, পৃথিবীতে পাখির উদ্ভবের প্রায় অর্ধেক সময় ধরেই তারা আর্কটিকে বাসা বেঁধে আসছে।

এই তথ্য শুধু অতীতের ইতিহাস নয়, বরং বর্তমান প্রকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্রও বটে। আর্কটিক অঞ্চলে পাখিদের ঋতুভিত্তিক আগমন সেখানে এক অদ্ভুত জীববৈচিত্র্যের চক্র তৈরি করে। গ্রীষ্মকালে তারা শুধু প্রজননের কাজ সারেনা, ফুলের পরাগায়ন থেকে শুরু করে বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বিস্তারেও বড় ভূমিকা রাখে।

এরা পোকামাকড় আর ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে, যা পরোক্ষভাবে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি কমায়। আরেকটি দিকও কম চমকপ্রদ নয়—পাখিরা নিজের শরীরে ছোট ছোট জীবাণু, বীজ কিংবা পোকা নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে দূরতম ধ্রুবীয় অঞ্চলে নতুন জীবনের বীজ বপন করে। সেই হিসেবে, আর্কটিকের প্রাচীনতম পরিবেশ গঠনে এই পাখিদের অবদান ছিল একেবারে মৌলিক।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, আর্কটিক পাখিদের নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। প্যালিয়োবায়োলজিস্ট লরেন উইলসন আর ড্যানিয়েল টি. ক্সেপকা লিখেছেন, “এখনও আমরা কেবল পরোক্ষ প্রমাণ পাচ্ছি যে, তারা প্রজননের জন্যই আর্কটিকে যেত, সারা বছর থাকত না।” তবে তারা আশা করছেন, ‘স্টেবল আইসোটোপ অ্যানালাইসিস’ নামের এক আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এই বিশ্লেষণে কোনো প্রাণীর দাঁত বা হাড়ের ভেতর একই মৌলের ভিন্ন ভিন্ন রূপ বা আইসোটোপের অনুপাত মেপে বোঝা যায়, তারা কী খেত, কোন পরিবেশে বাস করত এবং জীবনের কোন সময়ে কোথায় ঘুরে বেড়িয়েছে। কল্পনা করুন, যখন ডাইনোসরের গর্জনে কেঁপে উঠত পৃথিবী, তখনও ছোট্ট ডানার পাখিরা বরফশীতল আর্কটিকের গ্রীষ্মে বাসা বেঁধে নতুন প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছিল।

আজও তারা প্রতি বছর সেই প্রাচীন যাত্রার উত্তরাধিকার বহন করছে। মানুষের চোখে এই পরিযান শুধু এক চমৎকার দৃশ্য নয়, প্রকৃতির গভীর রহস্যের এক অমলিন চিহ্ন। আর্কটিকের নিস্তব্ধ তুন্দ্রায় যখন হাজার পাখির কলতান শোনা যায়, তখন মনে হয়—প্রকৃতির এই চিরন্তন ছন্দের সঙ্গে যেন আমাদেরও এক অদৃশ্য যোগসূত্র আছে, যা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের সেতুবন্ধন রচনা করেছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles