মোঃ আতিকুর রহমান আহাদ, অধ্যাপক – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশেষভাবে নিযুক্ত সহযোগী অধ্যাপক – ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় ( জাপান) । কম্পিউটার সাইন্স বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও UNSW( সিডনি) থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং Kyushu Institute of Technology থেকে পি এইচ ডি সম্পন্ন করেন। কর্মজীবনে প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন এরপর পদোন্বতিক্রমে সহকারী অধ্যাপক , সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক হিসেবে। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকে ছুটি নিয়ে বিশেষভাবে নিযুক্ত সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় ( জাপান) এ । ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ বছর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, অর্থাৎ দীর্ঘ ২১ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে কম্পিউটার সাইন্স বিষয়ে।এছাড়াও Editorial Board Member হিসেবে Scientific Reports, Nature Pub এর সাথে রয়েছেন ।
বিজ্ঞানী.অর্গ এবং লার্নটাইমের সাথে লাইভে কথা বলেছেন গবেষণা কিভাবে করতে হবে, সমস্যাগুলি কিভাবে সমাধান করবেন ইত্যাদি নিয়ে।
লিংক:
গবেষণাভিত্তিক বাংলাদেশ: এক শিক্ষকের স্বপ্ন, আমাদের সবার দায়িত্ব
জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ল্যাবরেটরিতে বসে এখনও তিনি মূলত কাজ করেন ঢাকার তরুণদের নিয়েই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এখন “লিয়েন” (ছুটি) নিয়ে জাপানে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেতন নেই, চাকরির সার্ভিস কাউন্টও বন্ধ—তবু সারাক্ষণ মাথায় ঘুরে বেড়ানো প্রশ্ন: বাংলাদেশ কি একদিন গবেষণাভিত্তিক দেশে পরিণত হতে পারবে?
নিজের ব্যক্তিজীবনের আর্থিক-মানসিক চাপ, পরিবার থেকে দূরে থাকা, ক্যারিয়ারের নানা অনিশ্চয়তা—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি এই এক স্বপ্নের পেছনেই ছুটছেন। কারণ তার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে বিশ্বাসটি—শক্তিশালী শিক্ষা ও গবেষণা ছাড়া কোন জাতি টেকসইভাবে এগোতে পারে না।
লিয়েন, শিক্ষা ছুটি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের জন্য ‘লিয়েন’ আসলে এক ধরনের “নির্বিঘ্ন ছুটি”—কোনো বেতন নয়, সার্ভিস কাউন্ট নয়, বদলে মেলে সময়। জীবনে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত একজন শিক্ষক এই সুযোগ নিতে পারেন। এই সময়ে তিনি বিদেশে গিয়ে গবেষণা করতে পারেন, অন্য কোনও চাকরি করতে পারেন, চাইলে ঘরে বসেও থাকতে পারেন।
এছাড়া আছে শিক্ষা ছুটি—মাস্টার্স, পিএইচডি বা পোস্টডক গবেষণার জন্য। আবার সরকার চাইলে একই শিক্ষককে প্রেষণে (ডেপুটেশন) পাঠায় ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর বা ট্রেজারারের মতো দায়িত্বে। সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষার সাথে যুক্ত অনেকেই জীবনের এক পর্যায়ে বিদেশে গিয়ে শিখে আসার সুযোগ পান।
জাপানে থাকা এই শিক্ষকও তেমনই একজন। তিন বছর ধরে তিনি ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছেন, কিন্তু বেশির ভাগ গবেষণাপত্র তারই পুরোনো বিভাগ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের সঙ্গে। দূর থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মিটিং, জুম সেশন, কোড রিভিউ, গবেষণা নির্দেশনা—সব করে যাচ্ছেন এক ধরনের “রিমোট সুপারভাইজার” হয়ে। তার ভাষায়,
“শিক্ষকতা মানে সারাজীবন ছাত্রদের জন্য প্রস্তুত থাকা। আমি যতটা পারি, ওদের জন্য সময় রাখার চেষ্টা করি।”
চক-ডাস্টারের ক্লাসরুম বনাম চিন্তাকেন্দ্রিক শিক্ষা
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি সরাসরি স্বীকার করেন—আমরা এখনও “চক-ডাস্টার” নির্ভর শিক্ষা থেকে বের হতে পারিনি। বোর্ড, চক আর একমুখী লেকচার—এই কাঠামোতে মূল শক্তি হয়ে দাঁড়ায় মুখস্থ বিদ্যা।
তিনি নিজেই ছিলেন ভালো ছাত্র—অনার্সে প্রথম, মাস্টার্সে দ্বিতীয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় মাস্টার্স করতে গিয়ে প্রথম সেমিস্টারে টেনেটুনে পাস করতে হয়েছে। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাও সেখানে প্রথম দিকে ফেল করেছে বা কোনো রকমে পাশ করেছে। কারণ, এখানে যেখানে “টিপিক্যাল প্রশ্ন–টিপিক্যাল উত্তর” দিয়ে পরীক্ষা পাস করা যায়, সেখানে উন্নত বিশ্বে পরীক্ষাই সাজানো হয় চিন্তা এবং মূল্যায়নের ওপর।
ওপেন বুক পরীক্ষা—লাইব্রেরি থেকে চার-পাঁচটি বই নিয়ে গেলেও প্রশ্ন এমন হয় যে বই খুলে উত্তর লেখা যায় না; আগে মাথা খুলতে হয়। ধারণা, বিশ্লেষণ, তুলনা, সমালোচনা—এসবই সেখানে “সিলেবাসের” অংশ।
জাপানের উদাহরণ আরও আলাদা। ক্লাস এক থেকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত কোন পাশ–ফেল নেই, কোন লিখিত পরীক্ষাও নেই। তারপরও সেই “গাধা” বলে অবহেলিত শিশুটিও নাইন পর্যন্ত “উত্তীর্ণ” হয়। এই নয় বছরের ভেতরেই তাদের ভেতরে গড়ে ওঠে শৃঙ্খলা, দলগত কাজ, দায়িত্ববোধ এবং শেখার সক্ষমতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত, প্রায় ধ্বংসস্তূপ থেকে জাপানের পুনর্জন্মের পেছনে—এই শক্তিশালী শিক্ষা–মেরুদণ্ডই সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সেই পার্থক্য আরও প্রকট হয়। জাপানে চতুর্থ বর্ষ মানেই ফুল–টাইম রিসার্চ। প্রথম তিন বছরে কোর্স কমপ্লিট, চতুর্থ বছরে সকাল থেকে সন্ধ্যা ল্যাব। এরপর দুই বছরের মাস্টার্সেও বেশির ভাগ সময় গবেষণা—কোর্সওয়ার্ক তুলনামূলক হালকা, কিন্তু গবেষণার চাপ অনেক। ফলে ডিগ্রি শেষ হওয়ার আগেই তারা হয়ে যায় সমস্যা–বিশ্লেষণ ও সমাধান–উদ্ভাবনে চর্চিত মানুষ।
বাংলাদেশে অনেকেই উল্টা বলেন—“রিসার্চ করব নাকি পড়াশোনা করব?” অথচ এই শিক্ষক মনে করিয়ে দেন:
গবেষণা আসলে পড়াশোনারই পরিণত রূপ—সমস্যা নিয়ে পদ্ধতিগতভাবে ভাবার অনুশীলন।
গবেষণা: কেবল পিএইচডি–ধারীদের কাজ নয়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রস্তুতিও
আমাদের দেশে এখনও অনেকেই গবেষণাকে দেখে “শুধু একাডেমিক বিলাসিতা” হিসেবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। একজন প্রশাসনিক ক্যাডার, ব্যাংকার, নীতি নির্ধারক বা করপোরেট লিডার—উচ্চ পর্যায়ে গিয়ে সবাইকেই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
একজন গবেষণামনস্ক মানুষ জানেন কীভাবে একটি সমস্যাকে ছোট ছোট উপ–সমস্যায় ভেঙে ফেলতে হয়, কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করতে হয়, কীভাবে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। এই দক্ষতাই তাকে যেকোনো পেশায় বাড়তি শক্তি দেয়।
এই শিক্ষক তাই ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় বারবার বলেন—
“গবেষণাকে ছোট করে দেখো না। পিএইচডি মানে লাইসেন্স টু রিসার্চ। আসল যাত্রা শুরু হয় ডিগ্রি নেওয়ার পর, শেষ হয়ে যায় না।”
পৃথিবীতে প্রায় ১৭ হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলোই গবেষণামূলক নয়—অনেকগুলো কেবল আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষা দেয়, নাগরিক তৈরির কাজ করে। তেমনি বাংলাদেশেও ১৫০টির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো গবেষণাকেন্দ্রিক হওয়ার কথা নয়, সম্ভবও নয়। কিন্তু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়কে—নতুন কিংবা পুরোনো—সুনির্দিষ্টভাবে “রিসার্চ টার্গেটেড” করে তুলতে হবে, এইটাই তার প্রস্তাব।
এবং তিনি আনন্দ নিয়ে লক্ষ্য করছেন, বিশেষ করে কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি–ডোমেইনে গত ১০–১৫ বছরে বাংলাদেশের তরুণরা আগের তুলনায় কত বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করছে, কত বেশি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিচ্ছে। এই অগ্রগতির ভেতরে নিজের ক্ষুদ্র ভূমিকা খুঁজে পেলেও তিনি তা “নিজের কৃতিত্ব” হিসেবে নয়, বরং একটি সমষ্টিগত জাগরণের শুরু হিসেবেই দেখেন।
বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়, দালাল আর দুর্বল ডিগ্রির ফাঁদ
গ্লোবাল উচ্চশিক্ষার আরেকটা কঠিন বাস্তবতাও তিনি তুলে ধরেন। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ বা এশিয়ার অনেক দেশে এমন বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো মূলত দুর্বল মানের আন্ডারগ্রাজুয়েট শিক্ষা দিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের টেনে আনে। সেখানে পড়তে আসা অনেকেই আসলে “একটা ডিগ্রি” আর “একটা নাগরিকত্ব”–এর সন্ধানে যায়।
এজেন্ট আর ‘দালালদের’ মাধ্যমে আমাদের তরুণরা এমন অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, যেখানে গবেষণার মান খুবই কম, শিক্ষার পরিবেশ দুর্বল। ফলে কয়েক বছর ওখানে পড়ে, প্রচুর অর্থ ব্যয় করে, অনেকেই ফিরে আসে একটা নামমাত্র ডিগ্রি নিয়ে।
এর বিপরীতে তিনি মনে করেন—বাংলাদেশের কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই অত্যন্ত ভালো কাজ করছে, ভালো শিক্ষক ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে। তাই “বিদেশ মানেই ভালো” আর “নিজের দেশ মানেই খারাপ”—এই দুই মিথ ভেঙে ফেলতে হবে। বুঝে–শুনে, মান যাচাই করে, নিজের লক্ষ্য ঠিক করে তারপরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোথায় পড়ব।
রিসার্চ না CGPA—কী দেখে বিশ্ব?
একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিদেশি প্রফেসরকে ইমেইল করলে তিনি কী দেখেন? CGPA, নাকি গবেষণা?
এই শিক্ষক সরাসরি বলেন, CGPA ভালো হওয়া অবশ্যই পজিটিভ পয়েন্ট; কিন্তু CGPA ৩.৫০–৩.৬০ থাকলে সেটাই যথেষ্ট “গুড পয়েন্ট”। ৩.৯০ না হলেই ভবিষ্যৎ অন্ধকার—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই, যদি প্রমাণ–সাপেক্ষ গবেষণার নমুনা থাকে।
কিন্তু আবার “যেকোনো পেপার হলেই প্রমাণ”—তাও নয়। নিম্নমানের জার্নাল বা কনফারেন্সে প্রকাশিত পেপার প্রায়শই উল্টো ক্ষতি করে; প্রফেসররা বুঝে যান কাজটি কতটা দুর্বল। তাই কম পেপার হলেও ভালো মানের জার্নাল ও কনফারেন্সে প্রকাশ করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তা–সত্ত্বেও তিনি CGPA ছোট করে দেখেন না। বরং বারবার মনে করিয়ে দেন—
“সিজিপিএর কাজ হলো একটা গেট পেরোনোর টিকিট; কিন্তু ভবিষ্যতের পথ খুলে দেয় আসলে তোমার চিন্তা, কাজ আর গবেষণার মান।”
শিক্ষক যদি নিজে কোড না করেন, বই না পড়েন – পিছিয়ে পড়বে জাতি
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি কঠিন অথচ প্রয়োজনীয় সমালোচনা করেন।
জাপান বা উন্নত দেশগুলোর বেশির ভাগ ল্যাবে এসোসিয়েট প্রফেসররা নিজেরা কোড লিখেন, নতুন অ্যালগরিদম তৈরি করেন, হাতে–কলমে গবেষণা করেন। ছাত্রদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন বলে তাদের গবেষণার মান দ্রুত বাড়ে।
বাংলাদেশে কিন্তু বহু ক্ষেত্রে শিক্ষকরা গবেষণাকে “শুধু সুপারভিশন” হিসেবে দেখেন—
ছাত্ররা কাজ করবে, শিক্ষক মাঝে মাঝে পরামর্শ দেবেন, কনফারেন্সে নামটাম চলে যাবে। ফলে গ্লোবাল অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন টুলস, নতুন ধারণা শেখার অভ্যাস হারিয়ে যায়।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি স্মরণ করেন কীভাবে তিনি নতুন টুলস (যেমন D–planning, এক্সটেনসর ইত্যাদি) নিজের হাতে এনে ল্যাবে ব্যবহার করেছেন, কনফারেন্সে গিয়ে শিখেছেন, ফিরে এসে বাংলাদেশের ছাত্রদের নিয়ে নতুন ডোমেইন তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
তার ভাষায়,
“শিক্ষক যদি নিজেই পড়াশোনা বন্ধ করে দেন, নতুন কিছু শিখতে না চান, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি ছাত্রদের পেছনে পড়ে যাবেন। তখন তারা তাকে সম্মান করবে, কিন্তু অনুসরণ করবে না।”
কনফারেন্স সংস্কৃতি: মন্ত্রী–কেন্দ্রিক উদ্বোধন থেকে একাডেমিক মঞ্চে ফেরার প্রয়োজন
বাংলাদেশের কনফারেন্স সংস্কৃতি নিয়ে তার অভিজ্ঞতা তিক্ত কিন্তু শিক্ষণীয়।
তিনি যখন ঢাকায় থেকে আন্তর্জাতিক মানের আইসিটি কনফারেন্স আয়োজন করতেন, সচেতনভাবেই রাজনীতিক ও সেলিব্রেটি আমন্ত্রিত অতিথিদের বাদ দিতেন। কারণ, একটি কম্পিউটার ভিশন কনফারেন্সে একজন মন্ত্রী গিয়ে “ভিশন ২১” নিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা করলে বাস্তবে কেউ উপকৃত হয় না; বরং মূল আলোচনার সময় কমে যায়, দর্শক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এর বদলে তিনি চেয়েছেন—কনফারেন্স হোক গবেষকদের মেলা, নতুন আইডিয়া এবং কাজের প্রতিযোগিতা, তরুণদের জন্য একাডেমিক প্ল্যাটফর্ম।
বাংলাদেশে এখন ইলেকট্রনিক্স, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রোবোটিক্স, পরিবেশ—বিভিন্ন অলিম্পিয়াড শুরু হয়েছে। এতে অনেক শিক্ষকের প্রায় পুরো জীবনটাই চলে যায়; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলো দেশের মেধার ভিত্তি শক্ত করে। তিনি মনে করেন, সত্যিকারের উন্নয়ন হবে তখনই, যখন এই সব ইভেন্ট গঠনমূলক কাঠামোর মধ্যে নিয়মিতভাবে চলতে পারবে —কেবল ব্যক্তিগত ত্যাগের ওপর ভর করে নয়।
হতাশ তরুণদের জন্য বার্তা: ধার নেই তো কী হয়েছে, ‘ভারে’ কাটতে শিখো
সমাজে বাড়ছে হতাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের আত্মহত্যার খবর নিয়মিত আসছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি খুব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলেন।
নিজেকে তিনি ‘শার্প’ মানুষ মনে করেন না—বরং বন্ধুদের চোখে বেশ সাধারণ, এমনকি “গাধা” ধরনের ছাত্র ছিলেন বলেই ইঙ্গিত দেন। কিন্তু তারপরও আজ তিনি আন্তর্জাতিক গবেষক, প্রবাসী প্রফেসর। এই পরিবর্তনের চাবিকাঠি কী?
তিনি এক চমৎকার উপমা দেন—
ধারালো ছুরি দিয়ে কাটা যায় “ধারে কাটা”; আর ভোঁতা ছুরিও যদি অনেকক্ষণ ঘষা হয়, দড়ির সঙ্গে ঝুলে থাকে, একসময় “ভারে কেটে” ফেলে। অর্থাৎ যার ধার নেই, সে ভার দিয়ে কাটতে পারে—অদম্য পরিশ্রম দিয়ে।
এই বার্তাই তিনি তরুণদের জন্য রেখে যেতে চান—
- তুমি যদি নিজেকে গড়তে শুরু করো আজ, ধার না থাকলেও একসময় ধার তৈরি হবে।
- “আমি গাধা”, “আমার দিয়ে হবে না”—এই self–talk ছেড়ে, প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করো।
- রাজনৈতিক গোলমাল, ফেসবুক–কেন্দ্রিক জীবন, শুধু বিসিএসের গাইড মুখস্থ করা—এসব থেকে বেরিয়ে আসো। আগে নিজেকে জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিতে স্টেবল করো; তারপর দেশ, সমাজ, পরিবার নিয়ে ভাবো।
দেশপ্রেম মানে শুধু পতাকা গাড়া বা স্লোগান দেওয়া নয়; নিজের অসুস্থতা, অদক্ষতা আর অলসতার বোঝা দেশকে না চাপিয়ে, নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তুমি আর দেশ—দু’জনই লাভবান হও।
স্বপ্ন: একটি রিসার্চ–ভিত্তিক বাংলাদেশ
ঢাকা থেকে দূরে, জাপানের ল্যাবে বসে এই শিক্ষক গত এক বছর নিজেও মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত ছিলেন—ব্যক্তিজীবনের ক্ষতি, পরিবারের সাথে দূরত্ব, অস্থিরতা—সব মিলিয়ে। কিন্তু একটি স্বপ্ন তাকে ধরে রেখেছে:
“আমি যখন অবসর নেব, তখন যেন বলতে পারি—বাংলাদেশ অন্তত ICT–ডোমেইনে একটি গবেষণাভিত্তিক দেশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।”
এই স্বপ্ন একা তার না—আমাদের সবার। তিনি দেখেছেন, গত এক দশকে কনফারেন্সের সংখ্যা বেড়েছে, তরুণদের গবেষণাপত্র প্রকাশের হার বেড়েছে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশিরা বারবার ভালো করছে। এগুলো এখনও গ্লোবাল মানদণ্ডে খুব বড় অর্জন না হলেও—দৃশ্যমান অগ্রগতি।
এখন দরকার—
- নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে গবেষণায় বাস্তবসম্মত বিনিয়োগ,
- বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমিয়ে ছাত্রবান্ধব পরিবেশ তৈরি,
- প্রফেসরদের মধ্যে আজীবন শেখা–সংস্কৃতি গড়ে ওঠা,
- আর তরুণদের মধ্যে হতাশাকে জায়গা না দিয়ে নলেজ–বেজড আত্মবিশ্বাস তৈরি করা।
তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন—সরকার তখনই গবেষণায় বড় অংকের টাকা দেবে, যখন দেখবে বিদ্যমান সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সত্যিকারের পরিবর্তনের প্রমাণ তৈরি হয়েছে। যেমন একজন বাবা কেবল তখনই সন্তানের কণ্ঠশিক্ষায় টাকা খরচ করেন, যখন দেখেন শিশুর গলায় সত্যিই সুর আছে, সে চেষ্টা করছে।
উপসংহার: ইতিহাস থেকে শেখা, ভবিষ্যতের জন্য কাজ
তার বক্তব্য শেষ হয় ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকিয়ে। ইতিহাস পড়ার উদ্দেশ্য শুধু কে কাকে কবে হারাল—এগুলো মুখস্থ করা নয়; বরং ভুল থেকে শেখা, সেই ভুল পুনরাবৃত্তি না করার চেষ্টা করা।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও ব্যর্থতার গল্প অনেক, হতাশার কারণও কম নয়। কিন্তু একই ইতিহাসে আছে অগণিত মানুষের পরিশ্রম, আত্মত্যাগ আর ছোট ছোট অর্জনের সিঁড়ি।
এই শিক্ষক তাই আমাদের সামনে খুব পরিষ্কার একটি রূপরেখা রেখে যান—
- নেগেটিভিটি দেখো, কিন্তু সেখানে আটকে থেকো না;
ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পজিটিভ কাজের দিকে ঝুঁকে পড়ো। - নিজের সাবজেক্টকে ছোট করে দেখো না; যেখানে আছো, সেখানে সর্বোচ্চটা দাও।
- গবেষণাকে শুধু “ডিগ্রি পাওয়ার” মাধ্যম নয়, চিন্তা–পরিবর্তনের অনুশীলন হিসেবে দেখো।
- ধার না থাকলে ভার দিয়ে কাটতে শেখো—অর্থাৎ নিয়মিত, স্মার্ট, মেথডিক্যাল পরিশ্রমকে অভ্যাস করো।
একজন শিক্ষক, এক প্রজন্ম, এক–দুইটি কনফারেন্স বা কয়েকটি ভালো পেপার—কোনোটিই এককভাবে বাংলাদেশকে গবেষণাভিত্তিক দেশে পরিণত করতে পারবে না। কিন্তু প্রত্যেকে যদি নিজেদের জায়গা থেকে এক ধাপ করে এগোতে থাকে, পাঁচ–দশ বছর পর সেই ছোট ছোট পদক্ষেপই তৈরি করবে বড় পরিবর্তনের সিঁড়ি।
হয়তো তখন এই শিক্ষক অবসর নিয়ে ফিরে তাকিয়ে বলতে পারবেন—
“হ্যাঁ, আমরা পারিনি এক দিনে; কিন্তু আমরা দাঁড় করাতে পেরেছি গবেষণাভিত্তিক বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর।”

So inspiring story. I wanna go to japan for study too.