পদার্থবিদ্যাবিজ্ঞানীদের জীবনী

বিজ্ঞানীহন্তা তাপগতিবিদ্যা!

Share
Share

অনেকটা সত্যবিত্ত রানের সৃষ্টির মতোই বলতে হয়—“আশ্চর্য বিষয় মশাই, এই তাপগতিবিদ্যা।” পদার্থ বিজ্ঞানের বিষয় হলেও বিজ্ঞানের প্রায় সব শাখাতেই এর অবাধ গতি। রসায়ন, জীববিদ্যা, কারিগরিবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্র কোথায় এর প্রয়োগ নেই?

এহেন এক বিষয়ের উপর লিখতে গিয়ে বিখ্যাত আমেরিকান পদার্থবিদ গুডনেইন তাঁর “পদার্থের অবস্থা” বইয়ে পরিসংখ্যান তাপগতিবিদ্যার অধ্যায় এর শুরুতেই করলেন এক কঠিন মন্তব্য—“লুডভিগ বোল্টজমান যিনি পরিসংখ্যান তাপগতিবিদ্যা নিয়ে সারাজীবন কাটিয়েছেন তিনি ১৯০৬ সালে আত্মহত্যা করেন। পল এহরেনফেস্ট যিনি এই কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁকেও একইভাবে আত্মহত্যা করতে হয় ১৯৩৩ সালে। এবার আমরা পরিসংখ্যান তাপগতিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে যাচ্ছি। সম্ভবত আমাদের একটু সতর্কভাবে এগোনোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে”।

কোনও সন্দেহই নেই যে তিনি নেহাত মজার ছলেই কথাটা বলেছিলেন কিন্তু তাপগতিবিদ্যার ইতিহাস ঘেঁটে বিজ্ঞান ইতিহাস রচয়িতাদের একদল অদ্ভুত এক পরিসংখ্যান আমাদের সামনে নিয়ে এলেন। তাঁদের দাবি হল আত্মহন্তাকারী বা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এমন বিজ্ঞানীদের মধ্যে তাপগতিবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল এদের মধ্যে কয়েকজন আবার তাপগতিবিদ্যার নতুন নতুন শাখার স্রষ্টাও রয়েছেন।

আজকাল মনোবিজ্ঞানীদের অনেকেই মনে করেন বুদ্ধিমান মানুষরা নাকি অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হন। তাপগতিবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আবেগপ্রবণতার সম্পর্ক আছে কী না তা মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় হয়তো হতেই পারে। এই গবেষণা থেকে কোন দিন যদি এটা প্রমাণিতও হয় যে তাপগতিবিদ্যা নিয়ে যারা চর্চা করেন তারা সাধারণ মানুষজনের চাইতে অনেক বেশি আবেগপ্রবণ এবং বুদ্ধিমান হন, তাতে হয়তো বিতর্ক হতে পারে তবে কিন্তু অবাক হবার কিছুই নেই। আপাতত চলুন একবার তাঁদের পেশ করা তালিকাটার দিকে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

তাপগতিবিদ্যার শাখা আত্মহন্তাকারী আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এমন বিজ্ঞানীদের নাম

সনাতন তাপগতিবিদ্যার জনক

  • জুলিয়াস রবার্ট ভন মেয়ার
  • ক্লারা হেবার
  • গিলবার্ট লুইস
  • ব্রিজম্যান

পরিসংখ্যান তাপগতিবিদ্যার স্রষ্টা

  • লুডভিগ বোল্টজমান
  • পল এহরেনফেস্ট

মানব রসায়ন তাপগতিবিদ্যার স্রষ্টা

  • গনর্, অ্যাডামস, এনিংগার

অঙ্গসংস্থানসংক্রান্ত তাপগতিবিদ্যার জনক

  • টুরিং

তাঁদের অনেকেরই দাবি এই পরিসংখ্যান তালিকা আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর এবং সত্যিই অবাক হবার মতোই। আসুন এবার দেখে নেওয়া যাক বাস্তবটা কী এবং এইসব বিদগ্ধ ব্যক্তিরা কে কীভাবে এবং কেন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। এতেই বোঝা যাবে তাপগতিবিদ্যার সঙ্গে তাঁদের আত্মহত্যার কোনও সম্পর্ক নেই।

প্রথমেই আসি জুলিয়াস রবার্ট ভন মেয়ার এর কথায়। তিনি পেশাগত ভাবে ছিলেন একজন চিকিৎসক। এই জার্মান চিকিৎসক এবং অবশ্যই পদার্থবিজ্ঞানী, রবার্ট মেয়ার, 1840 সালে, ইস্ট ইন্ডিজ সাগরতীর একটি ডাচ জাহাজে জাহাজের ডাক্তার হিসাবে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেন জাহাজের কর্মীদের রক্তের রঙ ক্রান্তীয় এবং ইউরোপের ঠান্ডা অঞ্চলে তাপমাত্রার পার্থক্য এর সাথে সাথে পাল্টে যায়। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাপ যে কাজের যান্ত্রিক সমতুল্য এই ধারণা করেছিলেন এবং 1842 সালে, জার্মানিতে ফিরে আসার পর, তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলি রসায়ন ও জীববিদ্যার কয়েকটি গবেষণাপত্রে প্রকাশও করেন। তিনিই প্রথম জানান যে “শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না এর শুধু রূপান্তর ঘটে”। কিন্তু পদার্থ বিজ্ঞানীদের নজরে না আসার কারণে সেসব গবেষণা কোনও গুরুত্বই পায় নি। আবার যাঁরা সেগুলো দেখেছিলেন তাঁরাও এর পরীক্ষণীয় তথ্য যথাযথ নয় মনে করে একে কোনও মান্যতাই দেননি।

অন্যদিকে 1843 সালে, জেমস জুল একটি ছোট্ট পরীক্ষার মাধ্যমে তাপের সঙ্গে যান্ত্রিক শক্তির সম্পর্ক সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন। একটি পাল্লার একপাশে তিনি একটি ভারী ওজন বেঁধেছিলেন এবং অন্যপাশে একটি প্যাডেলের চাকা। প্যাডেলের চাকা জলে ডোবানো ছিল, যার তাপমাত্রা তিনি আগে নিয়েছিলেন। একপাশের ওজন কমার সঙ্গে সঙ্গে এর শক্তি প্যাডেলের চাকা ঘুরিয়ে দেয় এবং জলকে নাড়া দেয়। ওজন মাটিতে আঘাত করার পর, তিনি আবার জলের তাপমাত্রা নিলেন এবং দেখলেন এর তাপমাত্রা বেড়েছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে যান্ত্রিক গতি এবং তাপ বিনিময়যোগ্য হতে পারে। এই পরীক্ষার উপর নির্ভর করেই W=JH সূত্র গড়ে ওঠে যা তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র হিসেবে বিখ্যাত।

আমাদের প্রচলিত ধারণা ছিল যে যান্ত্রিক শক্তি এবং তাপ সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস সেটা যে ভুল তা তিনি প্রমাণ করলেন এবং তাপগতিবিদ্যায়, শক্তির ধ্বংস হয় না তার রূপান্তর ঘটে সেটা জানালেন। তাই সারা বিশ্বের কাছে তিনি সমাদৃত হলেন তাঁর নাম শক্তির একটি বিখ্যাত ইউনিট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হল। ফলে রবার্ট মেয়ার যিনি তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্রের জনক হতে পারতেন তিনি উপেক্ষিতই থেকে যান।

এবার তাঁর একটু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসা যাক। এই সময়ের মধ্যে, তাঁর এক ছেলে এবং দুই মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তিন বছর বয়সের আগেই সবাই মারা যায়। 1850 সালে তিনি অনিদ্রা রোগে ভুগতে থাকেন। তিনি ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এই সময় মেয়ার আত্মহত্যা করার জন্য একটি হোটেলের তৃতীয় তলার জানালা থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং প্রায় দশ ফুট নিচে মাটিতে পড়ে যান। এতে তাঁর দুটো পা-ই ভেঙে যায়, কিন্তু তিনি প্রাণে বেঁচে যান। হতাশাগ্রস্ত মেয়ারকে ১৮৫১ সালে একটি মানসিক হাসপাতালের আশ্রয়ে রাখা হয়েছিল, কিন্তু পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি শেষ জীবনে কিছুদিনের জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও এসেছিলেন এবং তাঁকে বিজ্ঞানের জগতে কিছু স্বীকৃতিও দেওয়া হয় কিন্তু তাঁর যোগ্য সম্মান তিনি জীবিতকালে কখনই পাননি।

এবার আসি ক্লারা হেবারের কথায়। তিনি হলেন প্রথম জার্মান মহিলা যিনি কোনও জার্মান ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে পি এইচ ডি ডিগ্রি পান। শুধু তাই নয় তাঁর ডিগ্রি “magna cum laude” কিনা বিশেষ সম্মানের সঙ্গে সম্মানিত। স্থানীয় এক খবরের কাগজের তথ্য অনুসারে যে অনুষ্ঠানে তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয় সেই অনুষ্ঠানে তিনি শপথ নিয়ে বলেছিলেন—“আমি এমন কোনও বক্তব্য রাখব না বা লিখব না যা আমি অন্তর থেকে বিশ্বাস করি না। সত্যের খাতিরে বিজ্ঞানের উন্নতি ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব”। এতেই বোঝা যায় কত উন্নত মানসিকতার অধিকারিণী ছিলেন তিনি।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হয়তো হেবারকে জীবনসঙ্গী করা কারণ হেবার ছিলেন প্রচণ্ড উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং অন্ধ দেশভক্ত। দেশের এবং নিজের স্বার্থের জন্য তিনি কুখ্যাত হয়েছিলেন রাসায়নিক যুদ্ধের জনক হিসেবে।

তাপগতিবিদ্যায় অসামান্য পারদর্শিনী ছিলেন ক্লারা। আসলে হেবার যে “গ্যাসীয় বিক্রিয়ার তাপ গতিতত্ত্ব” নামে পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছিলেন ক্লারা তাতে সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন। যে অ্যামোনিয়ার কৃত্রিম সংশ্লেষ করার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান সেই পদ্ধতি সবিস্তারে ক্লারাই প্রথম এই বইটিতে লেখেন। তিনিই প্রথম গাণিতিক ভাবে দেখান যে লোহাকে অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করলে বিক্রিয়ার গতি অনেক বেড়ে যায়।

১৯০৫ সালে যখন বইটি প্রথম প্রকাশিত হল তখন দেখা গেল বইটির যুগ্ম লেখিকা হিসেবে ক্লারার নাম নেই। তবে বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ক্লারাকে এই বলে “beloved wife, Mrs. Clara Haber, Ph.D., with thanks for quiet collaboration.” ক্লারা এতে বেশ খানিকটা হতাশ হয়েছিলেন, হয়তো বা তিনি হেবার এর কাছ থেকে এর চেয়েও বেশি কিছু আশা করেছিলেন।

ক্লারা মাঝে মধ্যে মেয়েদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান বক্তৃতা দিতে যেতেন, এখানেও তাকে অনেক সময় শুনতে হতো বক্তৃতাটা হেবার লিখে দিয়েছেন কি না বা দেখে দিয়েছেন কি না, ইত্যাদি নানান কথা। অর্থাৎ হেবার যতই উন্নতির শিখরে উঠেছেন ক্লারা যেন ততই হতাশার সাগরে ডুবে গেছেন। হেবারের ক্লারার প্রতি ঔদাসীন্য, জার্মানির তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা ক্লারাকে দিনের পর দিন জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে।

হেবার এর মত একজন বিজ্ঞানী হেগ সম্মেলনের চুক্তি অগ্রাহ্য করে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় যেভাবে হত্যালীলায় মেতে উঠেছিলেন তাতে ক্লারার মত এক স্বাধীনচেতা বিজ্ঞানমনস্ক মহিলার মানসিক অবস্থা কী হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। এদিকে হেবার তখন জার্মান সেনাবাহিনীর কাছে রীতিমত হিরো। তাঁকে সরাসরি ক্যাপ্টেন বানানো হলো।

১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে হেবার ফিরে এলেন বার্লিনে। তাঁকে সম্বর্ধনা জানানোর জন্য ১লা মে রাতে এক বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল। বেচারা ক্লারা, তাঁকেও কিন্তু রীতি অনুসারে সহধর্মিণী হিসেবে সেই সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে ইংরেজ বিরুদ্ধে উপস্থিত থাকতে হয় যদিও তার মন চায়নি বিজ্ঞান কোনও ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে যুক্ত হোক।

তিনি শপথ নিয়েছিলেন—সত্যের খাতিরে বিজ্ঞানের উন্নত ও মর্যাদা রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। তার মনে সর্বদাই দ্বন্দ্ব—তিনি কী বিজ্ঞানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারছেন?

সেই অনুষ্ঠানে গিয়ে ক্লারা জানতে পারলেন জার্মানরা এবার দ্বিতীয় ক্লোরিন গ্যাস হামলার জন্য প্রস্তুত হবে। ফরাসিদের পর এবার সেন্ট্রাল ফ্রন্ট এর উপর গ্যাস হামলা হবে এবং তা খুব শীঘ্রই। হেবার হিসাব করে দেখেছেন বাতাসের গতিপথকে কাজে লাগিয়ে ক্লোরিন গ্যাস হামলার এটি মোক্ষম সময়, তাই কালক্ষেপ না করে আগামীকাল, ২রা মে তেই তিনি বেরিয়ে পড়তে চান।

অনুষ্ঠানে মুহূর্তের মধ্যেই খবর ছড়িয়ে পড়ল। সেনাবাহিনীর বড় বড় কর্তাদের মধ্যে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। সবারই বিশ্বাস জার্মানীনকে আর ঠেকায় কে? যুদ্ধজয়ের আনন্দে সবাই ফেটে পড়ল।

ক্লারা আর থাকতে পারলেন না, জার্মানির সমস্ত সামাজিক রীতিনীতি বিসর্জন দিয়ে বিজ্ঞানের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রকাশ্যে হেবারের কাছে অনুরোধ জানালেন যেন জার্মান আর এই ধরনের হত্যালীলায় মেতে না ওঠে, এত বিজ্ঞানকে অমর্যাদা করা হয়, এটা হেগ সম্মেলনে স্বাক্ষর করা চুক্তির বিরোধী, এতে দেশের সম্মান বাড়ার তো কথা নয়।

প্রকাশ্য সভাতে ক্লারার এ হেন আচরণে হেবার ভীষণই বিরক্ত হলেন। বাড়ী ফিরে দুজনন তুমুল ঝগড়া শুরু হল। হেবার বিস্মিত হলেন ক্লারার এই রূপ দেখে। ক্লারার দীর্ঘ দিনের অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটলো। দুজনের কেউই নতি স্বীকার করলেন না।

ভোর হয়ে এলো, হেবার যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। ক্লারাও এদিকে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। তিনি ঘর লন থেকে বেরিয়ে এলেন হেবারেরই সার্ভিস রিভলবার হাতে। হয়তো বা ছেলে হারমানের জন্য মন কেঁদে উঠল কিন্তু বিজ্ঞানের মর্যাদা রক্ষাকরার দায়িত্ব—তার কাছে সব কিছুকে তুচ্ছ করে দিল।

তিনি হেবারের সার্ভিস রিভলবার দিয়ে মাথায় গুলি করে আত্মবলিদান দিলেন। গুলির শব্দ শুনে তের বছরের ছেলে হারমান ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল। তাঁর কোলে মাথা রেখে ক্লারা হয়তো এই আশা রেখে মারা গেলেন যে হেবার এবার নিশ্চয় এই মরণখেলা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন। হায় ক্লারা! তিনি কোনদিনই হেবারকে পুরোপুরি চিনতে পারলেন না।

চিৎকার চেঁচামেচি শুনে হেবার যখন স্নানঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তখন সব শেষ। তাঁর এই আত্মদান হেবারের কাছে কোনও গুরুত্বই পেল না; তিনি ছোট্ট হারমান আর পরিজনদের হাতে ক্লারার শেষকৃত্যের ভার দিয়ে চলে গেলেন যুদ্ধক্ষেত্রে।

তাঁর এই নীরব আত্মদান জার্মান দেশে সেই মুহূর্তে কোনও সাড়া জাগালো না। ছয় দিন পর ৮ই মে স্থানীয় এক খবরের কাগজে প্রতিবেদক লিখলেন “ডক্টর হেবার; যিনি এখন যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর স্ত্রী আত্মহত্যা করেছেন। এই অসুখী মহিলার আত্মহত্যার কারণ অজ্ঞাত”। মানুষজন জানলো সাংসারিকভাবে খুশি না হতে পেরে তিনি আত্মঘাতিনী হয়েছেন।

ক্লারার হেবার সম্পর্কে মোহভঙ্গ হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯০৯ সালে এক চিঠিতে তিনি তাঁর গাইড রিচার্ড এনিগকে লিখেছিলেন—“বিশ্বের এই আট বছরে হেবার যা পেয়েছে তাঁর চাইনতে আমি হারিয়েছি অনেক বেশি”। তিনি হেবারের এমন আচরণকে-বিজ্ঞানের বিকৃত মনস্কতা, বর্বরতা বলতে দ্বিধা করেন নি। ক্লারা হেবারের জীবনী পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে তিনি তাপগতিতত্ত্ব নয় বিজ্ঞানের অপব্যবহারের প্রতিবাদে আত্মহত্যা করে শহীদ হয়েছিলেন।

এবার আসি এক পরিসংখ্যান তাপগতিতত্ত্ববিদ লুডভিগ বোল্টজমানের কথায়। পুরো নাম লুডভিগ এডুয়ার্ড বোল্টজমান। একজন ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন, ছোটখাটো ও মোটাসোটা মানুষ যার মুখভুড়ে ভঙ্গলের মত নাক ও বিশাল দাড়ির থাকায় দেখে বোঝা সম্ভব নয়, পরিসংখ্যান তাপগতিতত্ত্বের জন্য লড়াই করতে পুরো জীবন তাঁকে কতটা যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে।

উনিশ শতকেও নিউটোনিয়ান পদার্থবিদ্যা বেশ ভালভাবে রাজত্ব করছিল, পরমাণুর ধারণা তখনও সেকালের শীর্ষ বিজ্ঞানীরা মেনে নেননি। কিন্তু বোল্টজমান বিশ্বাস করতেন নিউটনের গতির সূত্রগুলি দিয়ে গ্যাসের অসংখ্য অণুর মধ্যে প্রতিটির গতি নির্ধারণ করা একেবারেই অসম্ভব। গাণিতিকভাবে পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনা তত্ত্বের ব্যবহার চোখ ধাঁধানো নতুন সূত্র বার করে তিনি প্রথম এদের গতি নির্ধারণ করার পদ্ধতি বার করেন যা পদার্থবিজ্ঞানের নতুন শাখার জন্ম দেয়। এ শাখাটির নাম স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিকস বা পরিসংখ্যানিক বলবিদ্যা।

১৮৭০-এর দশকে তিনি এক ধাপ এগিয়ে এনট্রপির সঙ্গে বিশৃঙ্খলার সংযোগ স্থাপন করে তাপগতিবিদ্যার পরিসংখ্যানগত ব্যাখ্যা হাজির করেন। এটি বোল্টজমানের নীতি হিসেবে পরিচিত। এ নীতি অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় থাকা সিস্টেম খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা পরিমাপ হলো এনট্রপি। তিনিই প্রথম বলেন একটি সিস্টেমের বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে অনেক বেশি শৃঙ্খলার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

কোন গ্যাসের এনট্রপি গণনার জন্য বোল্টজমানের ধারণাটি ছিল বেশ সরল। বোল্টজমান যুক্তি দিয়ে দেখালেন, গ্যাসের সবচেয়ে সম্ভাব্য অবস্থা সেটাই হবে, যার মধ্যে প্রাপ্ত শক্তির সর্বোচ্চ সংখ্যক সম্ভাব্য বিন্যাস থাকবে। ওই শক্তিই সর্বোচ্চ এনট্রপির প্রতিনিধিত্ব করবে। সর্বোচ্চ সংখ্যক সম্ভাব্য বিন্যাসের সঙ্গে শক্তির সবচেয়ে সম্ভাব্য বণ্টন সমকক্ষ হিসেবে বর্ণনা করে তুলনামূলকভাবে সহজে খোদ এনট্রপির হিসাব করা যায়।

কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে বোল্টজমানের এই গণনা পদ্ধতির দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছিলেন পদার্থবিদ ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কও। এভাবেই চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানকে ভেঙেচুরে কোয়ান্টাম তত্ত্বে পৌঁছান তিনি।

উনিশ শতকেও পরমাণুর অস্তিত্ব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছিল। সেকালের নামকরা বিজ্ঞানীরা, যেমন দার্শনিক আর্নেস্ট মাখ তা নিয়ে প্রায়ই বিদ্রুপ করতেন। অভিমানী আর প্রায় বিষাদগ্রস্ত মানুষ বোল্টজমান সেই সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

পরমাণুবাদ বিরোধীরা প্রায়ই তাঁকে ভয়াবহভাবে আক্রমণ করত। পরমাণুবাদ বিরোধীদের মতে, যে জিনিস পরিমাপ করা যায় না, তার কোনও অস্তিত্বও নেই। বোঝাই যায়, তাঁদের বাতিল তালিকার মধ্যে পরমাণুও ছিল।

বোল্টজমানের জন্য আরও ভয়াবহ অপমানজনক ব্যাপারটা ছিল, তাঁর বেশ কিছু গবেষণাপত্র বাতিল হয় সেকালের নামকরা কিছু জার্মান পদার্থবিজ্ঞান জার্নালগুলোতে। এ সম্পর্কে অভিযোগের তীর প্ল্যাঙ্কের দিকেও তোলেন কেউ কেউ।

একের পর এক ব্যক্তিগত আক্রমণে ক্লান্তি আর তিক্ততায় একসময় চরম হতাশায় ডুবে যান বোল্টজমান। অনেকদিন ধরে অসুস্থও ছিলেন। হাঁপানি, মাইগ্রেন, ক্ষীণ দৃষ্টি আর হৃদরোগে ভুগতে ভুগতে শারীরিক ও মানসিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। এগুলোর চেয়ে তাঁকে চরমভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল মানসিক বিষণ্ণতা। এ অবস্থায় চাকরি থেকেও অবসর নিতে বাধ্য হন তিনি।

এর চার মাস পর সবকিছু থেকে মুক্তি পেতে একদিন এক ছুটির দিনে নিঃসঙ্গ অবস্থায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। তাঁর বয়স তখন ৬২ বছর। ১৯০৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাঁর লাশ যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তাঁর পাশে পরিবারের কেউই ছিল না। তাঁর কাছ থেকে অনেক দূরে বেনিস্তর কাছে তাঁর স্ত্রী কী ও সন্তানরা সাগরতীরে অবসর সময় কাটাচ্ছিল। শারীরিক ও মানসিক বিষাদগ্রস্ততাই ছিল এই মহান বিজ্ঞানীর আত্মহত্যার কারণ।

গিলবার্ট লুইস ছিলেন একজন নামজাদা তড়িৎ রসায়নবিদ এবং তাপগতিতত্ত্ববিদ। ১৯৪৬ সালে যখন তাঁর বয়স ৭০ বছর একদিন তাঁকে তাঁর গবেষণাগারে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। যদিও মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিকিৎসকদের রিপোর্টে হৃদরোগের কথা উল্লেখ আছে তথাপি অনেকে মনে করেন তিনি নাকি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন কারণ তাঁর মৃতদেহের সামনেই ছিল পটাশিয়াম সায়ানাইডের খালি অ্যাম্পুল।

এটা রটনা বা ঘটনা যাই হোক না কেন সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর আত্মহত্যার ঘটনাই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়েছে। এর পেছনে আছে গিলবার্ট লুইস এর ব্যক্তিগত জীবনে বঞ্চনার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। রসায়নে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম ৩৫ বার মনোনয়নের জন্য পাঠানো হলেও তিনি নোবেল পুরস্কার পাননি অথচ তিনি জীবিত থাকাকালীনই তাঁরই কাজের সূত্র ধরে অননেকে নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেছেন।

এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানের জগতের সবচেয়ে কলঙ্কিত দিক বিজ্ঞানীদের নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত শত্রুতা। লুইস এর আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে যে রটনা তা আরও বেশি গুরুত্ব পায় কারণ তাঁর মৃত্যুর ঠিক আগের দিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর চিরশত্রু বিজ্ঞানী ল্যাংমুর এর এবং বলাই বাহুল্য এই সাক্ষাৎ সুখকর ছিল না। মানসিক বিষাদগ্রস্ততাই হয়তো এই মহান বিজ্ঞানীর আত্মহত্যার কারণ।

এলান টুরিং; অনেকেই যাকে অঙ্গসংস্থানসংক্রান্ত তাপগতিবিদ্যার জনক বলে মনে করেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন সমকামী যার জন্য তখনকার দিনের আইনে তিনি ছিলেন অপরাধী। এই অপরাধের জন্য তাঁকে ১৮ মাসের জেল অথবা চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য মহামান্য আদালত নির্দেশ দেয়।

দ্বিতীয় পদ্ধতিটি তখনকার দিনে ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক হলেও তিনি বেছে নেন এবং শেষ পর্যন্ত তা সহ্য না করতে পেরে পটাশিয়াম সায়ানাইড মেশানো আপেল খেয়ে আত্মহত্যা করেন। শারীরিক অবসাদগ্রস্ততাই হয়তো এই মহান বিজ্ঞানীর আত্মহত্যার কারণ।

এইভাবে যদি আমরা তালিকাভুক্ত অন্যান্য বিজ্ঞানীদের জীবনী পর্যালোচনা করি তবে দেখতে পাব তাপগতিতত্ত্ব নয় ব্যক্তিগত জীবনে এইসব বিজ্ঞানীরা প্রকৃত অর্থে সুখী হতে পারেননি।

এখন প্রশ্ন হল বিশেষভাবে তাপগতিতত্ত্ব এর সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রেই কী এই সম্ভাবনা বেশি? আসলে যাঁরা একথা বিশ্বাস করেন তাঁরা সঠিক পরিসংখ্যান রাখেন না।

প্রথমেই বলেছি বিজ্ঞানের প্রায় সব জায়গাতেই, যেমন পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা, কারিগরিবিদ্যা, চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো সব শাখাতেই তাপগতিতত্ত্ব এর প্রয়োগ রয়েছে। সুতরাং এ কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন লক্ষ লক্ষ বিজ্ঞানী। তাই স্বাভাবিক ভাবেই অসুখী মানুষের সংখ‍্যাও এখানে বেশি। আর এখানেই লুকিয়ে আছে এই প্রশ্নের উত্তর।

তাই পদার্থবিদ গুডনেইন এর মন্তব্য যে নেহাতই মজার ছলে এবং যাতে ছেলেমেয়েরা ভবিষ্যৎ জীবনে তাপগতিবিদ্যাকে তাঁদের গবেষণার বিষয় হিসাবে গ্রহণ করে এই উদ্দেশ্যেই তিনি এই তির্যক মন্তব্য করেছিলেন, তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই।

ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায়
বেলা বিজ্ঞান কেন্দ্র, পুরুলিয়া।

কিছু ছবি:

জুলিয়াস রবার্ট ভন মেয়ার

জুলিয়াস রবার্ট ভন মেয়ার

ক্লারা হেবার

লুডভিগ বোল্টজমান

গিলবার্ট লুইস

Dhrubajyoti Chattopadhyay
District Science Officer
District Science Centre, Purulia

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles