পদার্থবিদ্যাবিজ্ঞান বিষয়ক খবর

যে কণা ধরা প্রায় অসম্ভব, তাকে ধরেই ইতিহাস গড়লেন ফ্রান্সিস হালজেন

Share
Share

ছবি: বিজ্ঞানী. অর্গ

পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ২০২৬ · ৬ অক্টোবর ২০২৬

লেখিকা:
শাহনাজ মুন্নী
সম্পাদকীয় পর্যালোচনায়:
মো. মঞ্জুরুল ইসলাম
তথ্য যাচাই:
মো. ইফতেখার হোসেন

প্রকাশ:
০৬ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ হালনাগাদ:
০৬ অক্টোবর ২০২৬

এই মুহূর্তে আপনার হাতের ভেতর দিয়ে ১০০ কোটিরও বেশি কণা ছুটে যাচ্ছে। প্রতি সেকেন্ডে। অথচ আপনি কিছুই টের পাচ্ছেন না।

এই কণাগুলো গোটা পৃথিবীকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। দেয়াল, পাহাড়, এমনকি পৃথিবীর লোহার কেন্দ্রও এদের থামাতে পারে না।

এমন কণাকে ধরা কি সম্ভব? এক বিজ্ঞানী বললেন, সম্ভব। তবে শর্ত আছে। লাগবে দক্ষিণ মেরুর বরফ। দৈর্ঘ্য, প্রস্থ আর উচ্চতায় প্রতিটি এক কিলোমিটার!

লোকে হেসেছিল। আজ সেই জেদের জন্যই নোবেল পুরস্কার পেলেন ফ্রান্সিস হালজেন। কিন্তু কণাটা আসলে কী?

ভূতুড়ে কণা: নিউট্রিনো

কণাটার নাম নিউট্রিনো। বিজ্ঞানীরা একে ডাকেন “ভূতুড়ে কণা”।

কারণ এর ওজন প্রায় নেই। বিদ্যুতের চার্জও নেই। সিনেমার ভূত যেমন দেয়াল ভেদ করে চলে যায়, এরাও তেমনই প্রায় কিছুতেই আটকায় না।

তবে খুব কম সময়ে একটা নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর কেন্দ্রে ধাক্কা দেয়। ঠিক ওই মুহূর্তটাই ধরার সুযোগ। কিন্তু ধরে লাভ কী?

মহাকাশের ঠিকানা-মুছে-যাওয়া চিঠি

মহাকাশ থেকে সারাক্ষণ পৃথিবীর ওপর কণার বৃষ্টি ঝরছে। একে বলে মহাজাগতিক রশ্মি। আইসকিউব যন্ত্র প্রতিদিন এমন প্রায় ২৭ কোটি রশ্মি ধরে।

মহাকাশে আছে প্রকৃতির তৈরি কণা-ছোড়ার যন্ত্র। পৃথিবীর সেরা ল্যাবে যতটা শক্তি দেওয়া যায়, এরা তার প্রায় দশ লাখ গুণ শক্তিতে কণা ছুড়ে দেয়। কিন্তু এগুলো কী, কোথায় আছে, ভেতরে কী ঘটছে, তা আজও রহস্য।

মহাজাগতিক রশ্মির উৎস খোঁজা এত কঠিন কেন? কারণ পথে চুম্বকক্ষেত্রের ধাক্কায় এরা এঁকেবেঁকে যায়। ঠিকানা মুছে যাওয়া চিঠির মতো। কোথা থেকে এল, বোঝার উপায় নেই।

চিত্র ১: বাঁকা পথে আসা মহাজাগতিক রশ্মি উৎসের ঠিকানা হারিয়ে ফেলে। নিউট্রিনো আসে তীরের মতো সোজা। তাই তার পথ ধরে পিছিয়ে গেলেই পাওয়া যায় মহাবিশ্বের সেই ভয়ংকর বিস্ফোরণ।

চিত্র: মৌলিক ইলাস্ট্রেশন (এই আর্টিকেলের জন্য তৈরি)। তথ্যভিত্তি: Royal Swedish Academy of Sciences প্রেস রিলিজ; Scientific American (F. Halzen)।

এখানেই নিউট্রিনোর জাদু। পথে এদের দিক বদলায় না, শক্তিও কমে না। তাই এরা সরাসরি বলে দিতে পারে, চিঠিটা কোথা থেকে এসেছে।

এ ধরনের খবর আর কোনো উপায়ে মেলে না। কিন্তু সমস্যা একটাই। নিউট্রিনো ধরার জন্য চাই বিশাল এক ফাঁদ।

বরফ দিয়ে তৈরি দানব যন্ত্র

সেই ফাঁদের নাম আইসকিউব (IceCube)। এটি বসানো দক্ষিণ মেরুর বরফের গভীরে।

বরফের ১.৫ কিলোমিটার নিচে আছে এক বিশাল ঘন চাঁই। এর প্রতিটি দিক এক কিলোমিটার লম্বা। বরফটা প্রায় এক লাখ বছরের পুরোনো, একদম পরিষ্কার আর অন্ধকার।

এই বরফে বসানো আছে ৫ হাজার ১৬০টি আলোক-সেন্সর। প্রতিটি কাচের গোলকে মোড়া। এরা অন্ধকারে চোখ মেলে বসে আছে।

চিত্র ২: আইসকিউবের নকশা। বরফের গভীরে এক ঘন কিলোমিটারজুড়ে ছড়ানো সেন্সর। নিউট্রিনো ধাক্কা দিলে যে নীল আলোর ঝলক তৈরি হয়, সেন্সরগুলো তা ধরে ফেলে।

চিত্র: মৌলিক ইলাস্ট্রেশন, অনুপাত বাস্তবের মতো নয়। তথ্যভিত্তি: Scientific American (F. Halzen); Royal Swedish Academy of Sciences প্রেস রিলিজ।

কোনো নিউট্রিনো বরফের পরমাণুতে ধাক্কা দিলে নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধকার ঘরে হঠাৎ জ্বলে ওঠা নীল জোনাকির মতো। বিজ্ঞানীরা সেই আলোর ছাঁচ দেখে বুঝে নেন, কণাটা কতটা শক্তিশালী আর কোন দিক থেকে এসেছে।

সবচেয়ে শক্তিশালী নিউট্রিনোর আলো ছড়ায় প্রায় এক লাখ আলোর কণা হয়ে, শহরের ছয়টা ব্লক জুড়ে।

তবে সব নিউট্রিনো মহাকাশের নয়। প্রতি ছয় মিনিটে গড়ে একটি নিউট্রিনো ধরা পড়ে, যা তৈরি হয় আমাদেরই বাতাসে। বিজ্ঞানীরা এগুলো ছেঁকে ফেলেন। যা বাকি থাকে, সেটাই মহাবিশ্বের সত্যিকারের দূত।

কিন্তু এমন পাগলামির স্বপ্ন কে দেখেছিলেন?

এক জেদি বিজ্ঞানী আর একটি “মজার” স্বপ্ন

তিনি ফ্রান্সিস হালজেন। জন্ম ১৯৪৪ সালে বেলজিয়ামের টিনেন শহরে। ১৯৬৯ সালে কেইউ লিউভেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। ১৯৭২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন।

১৯৮৮ সালে তিনি প্রথম বললেন, দক্ষিণ মেরুর বরফেই নিউট্রিনো ধরা যাবে। সেখানকার বরফ স্বচ্ছ। বাইরের উৎপাত নেই। ভূমিকম্পও হয় না।

শুরুতে অনেকে ভাবতেন, এটা নিছকই “মজার একটা আইডিয়া”। অ্যান্টার্কটিকার মাঝখানে এত বড় যন্ত্র বসাবে কে?

হালজেন হাল ছাড়েননি। তাঁর ভাবনায় শিগগিরই ভরসা রাখলেন আরও গবেষক। কয়েক বছরের মধ্যেই বরফে সেন্সরের প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হলো।

বছরের পর বছর চলল কাজ। ২০১১ সালে পুরো আইসকিউব তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু নির্মাণের সময়ের প্রথম কয়েক বছরের তথ্যে অস্বাভাবিক কিছুই মিলল না। তারপর এল ২০১২।

“বার্ট” আর “আর্নি”-র চমক

দলের সদস্যরা তখন একটা রুটিন কনফারেন্স কলে ব্যস্ত। হঠাৎ পর্দায় ফুটে উঠল অচেনা এক নকশা।

দুটি নিউট্রিনো ধরা পড়েছে! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কণা-ত্বরণযন্ত্রে বানানো সবচেয়ে শক্তিশালী নিউট্রিনোর চেয়েও এদের শক্তি ১ হাজার গুণের বেশি। সূর্যের নিউট্রিনোর চেয়ে প্রায় ১০০ কোটি গুণ বেশি।

ঘরজুড়ে উত্তেজনা। এক গবেষক ছাত্র মজা করে কণা দুটির নাম দিয়ে দিলেন “বার্ট” আর “আর্নি”। সেসেমি স্ট্রিটের দুই জনপ্রিয় চরিত্রের নামে। লম্বা নম্বরের চেয়ে মজার নাম মনে রাখা সহজ!

কিন্তু বিজ্ঞানে উচ্ছ্বাস যথেষ্ট নয়। চাই প্রমাণ। পুরো এক বছর একই তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করে দলটি নিশ্চিত হলো, কণা দুটি সত্যিই মহাকাশ থেকে এসেছে।

তারপর একে একে আরও এল। মোট ধরা পড়ল ৫৪টি। এদের একটির নাম “বিগ বার্ড”, যার শক্তি বার্ট বা আর্নির প্রায় দ্বিগুণ। আর সেই ৫৪টি কণা কী বলল?

এরা প্রমাণ করল, মহাবিশ্ব থেকে নিউট্রিনো সত্যিই আসছে। জন্ম নিল এক নতুন বিজ্ঞান, নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান।

চিত্র ৩: এক স্বপ্নের ৩৮ বছর। ১৯৮৮ সালের প্রস্তাব থেকে ২০২৬ সালের নোবেল পর্যন্ত আইসকিউবের পথচলা।

চিত্র: মৌলিক ইলাস্ট্রেশন। তথ্যভিত্তি: Royal Swedish Academy of Sciences প্রেস রিলিজ; Scientific American; UW–Madison Physics (হালজেনের প্রোফাইল ও সিভি)।

এরপর পাওয়া গেল উৎসের সন্ধানও। ২০১৮ সালে একটি নিউট্রিনোকে মেলানো গেল মহাকাশের এক দূরবর্তী উজ্জ্বল গ্যালাক্সির সঙ্গে। ২০২২ সালে মিলল কাছের আরেকটি সক্রিয় গ্যালাক্সির খোঁজ। সম্প্রতি আমাদের নিজেদের ছায়াপথ থেকেও নিউট্রিনো ধরা পড়েছে।

নোবেল কমিটির প্রধান মার্ক পিয়ার্স বলেছেন, হালজেন এক আন্তর্জাতিক দল গড়ে তুলেছেন, যারা পৃথিবীকে এক অসাধারণ যন্ত্র দিয়েছে। তাঁর জেদ আর দূরদৃষ্টিই খুলে দিয়েছে নতুন এক ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ।

এ বছর পুরস্কারের অর্থ ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার। এটি পাচ্ছেন তিনি একাই। কিন্তু আমার-আপনার তাতে কী?

এটা আপনার জন্য কেন জরুরি

সৎভাবে বলি। এই আবিষ্কার কাল সকালে আপনার ফোন বা ওষুধ বদলে দেবে না। এটা মৌলিক বিজ্ঞান।

তবে ইতিহাস বলে, মহাবিশ্ব দেখার নতুন জানালা খুললেই মানুষের ভাবনা বদলে যায়। গ্যালিলিওর দূরবীন তা-ই করেছিল। এতদিন আমরা মহাবিশ্বকে দেখেছি শুধু আলো দিয়ে। এখন তাকে “শুনছি” নিউট্রিনো দিয়ে।

এই খবরে লুকিয়ে আছে বড় সব প্রশ্নের উত্তর। যে মহাজাগতিক রশ্মি প্রতিদিন আমাদের ঘিরে রেখেছে, তা কোথা থেকে আসে? মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর বিস্ফোরণগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে?

কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, এই কণা অদৃশ্য “ডার্ক ম্যাটার”-এরও সূত্র দিতে পারে। মহাবিশ্বের বস্তুর বেশির ভাগই সেই রহস্যময় জিনিস, যাকে আমরা চোখে দেখতে পাই না।

নোবেল কমিটি আরও বলছে, আইসকিউবের তথ্য থেকে এমন মহাজাগতিক ঘটনার খবরও মিলতে পারে, যার কথা আমরা এখনো জানিই না।

আর ভবিষ্যৎ? আইসকিউবের দল এখন এর প্রায় দশ গুণ বড় এক নতুন যন্ত্র বানানোর কথা ভাবছে। তখন ধরা পড়বে হাজার হাজার নতুন কণা। গল্পটা সবে শুরু।

শেষ কথা

প্রায় চার দশক আগে একজন মানুষ এক অসম্ভব স্বপ্ন দেখেছিলেন। লোকে হেসেছিল। তিনি সেই স্বপ্নকে বসিয়ে দিয়েছেন বরফের নিচে।

আজ সেই যন্ত্র অদৃশ্য কণার ভাষায় আমাদের শোনাচ্ছে মহাবিশ্বের গল্প। আজ যা “মজার আইডিয়া”, কাল তা-ই হয়তো নতুন এক দুনিয়া।

আপনার কী মনে হয়? মহাবিশ্বের কোন রহস্যের উত্তর নিউট্রিনো আমাদের সবার আগে দেবে? 

তথ্যসূত্র (Sources)

১. The Royal Swedish Academy of Sciences, প্রেস রিলিজ “Elusive particles from the universe captured at the South Pole” (৬ অক্টোবর ২০২৬)

২. Francis Halzen, “South Pole Experiment Traps Neutrinos from Beyond the Galaxy”, Scientific American (বিশেষ সংস্করণ, ২০১৫)

৩. Nature, “Nobel physics prize awarded for detection of ghostly neutrinos” (Elizabeth Gibney ও Davide Castelvecchi, ৬ অক্টোবর ২০২৬)

৪. France 24, “Nobel Prize in Physics awarded to Francis Halzen for ice research”

৫. The Associated Press (CP24-এ প্রকাশিত কপি), “Francis Halzen wins Nobel Prize in physics…”

৬. University of Wisconsin–Madison Physics, “Francis Halzen” (প্রোফাইল)

৭. Francis Halzen, সংক্ষিপ্ত সিভি (২০২৬)

৮. WIPAC / APS Physics, “Prof. Francis Halzen honored with the 2026 APS Medal”

ছবির সূত্র (Image credits):

চিত্র ১, ২ ও ৩ এই আর্টিকেলের জন্য বিশেষভাবে তৈরি মৌলিক ইলাস্ট্রেশন। এগুলোতে কোনো সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠানের ছবি ব্যবহার করা হয়নি। তথ্যভিত্তি ওপরের ১ ও ২ নম্বর সূত্র।

সর্বশেষ হালনাগাদ:
০৬ অক্টোবর ২০২৬

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles