কম্পিউটার টিপসতথ্যপ্রযুক্তিতথ্যপ্রযুক্তি - বাংলা কম্পিউটিং

সবিনয় নিবেদনঃ কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার করুন

Share
Share

ড. মশিউর রহমান

আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কম্পিউটারে বাংলা ভাষার ব্যবহারের প্রতি আমাদের আগ্রহ অনেকখানি বেড়েছে। অনেকেই এখন কম্পিউটারে বাংলা টাইপ করার চেষ্টা করছেন। সেটা খুব ভাল লক্ষণ এবং সেটাতে আপনারা অনেকে সন্তুষ্ট হলেও আমি মোটেও সন্তুষ্ট নই। কেননা কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহারের জন্য আমাদের আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আমি অনেক বাংলাদেশিদেরই জানি যারা কম্পিউটারে রীতিমতো দক্ষ, অথচ তারা জানেনই না যে কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার করা যায়। কোন বাংলাদেশি একে অপরের সাথে ইংরেজিতে কথা বলছে, এমন দৃশ্য আমি কখনও দেখিনি। অথচ একজন বাংলাদেশি আরেকজনের সাথে বাংলায় ই-মেইল করছে, তেমনটা খুব কমই দেখেছি। কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহারে এত দীনতা কেন? আমরা কি তবে ইংরেজিতে ভাব প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি? অসম্ভব। আশা করি আমার সাথে আপনারাও একমত হবেন। তবে কেন আমরা ইংরেজিতে একে অপরের সাথে ই-মেইল লিখছি। একজন বাংলাদেশি হিসাবে এই কথা স্বীকার করতে আমার সত্যিই লজ্জা লাগে। অনেকেই বলে থাকেন যে কম্পিউটারে বাংলা টাইপিং বেশ কঠিন? সত্যি কি তাই? তবে আপনাদের আমি জাপানিজ দের উদাহরণ দিব। জাপানিজরা তাদের বিশ হাজার কাঞ্জি (জাপানি অক্ষরগুলিকে কাঞ্জি বলে) যদি কম্পিউটারে টাইপ করতে পারে তবে আমরা পারব না কেন? আসলে সত্যি কথা হল কম্পিউটারে বাংলা ভাষা প্রয়োগের এই বর্তমান দুর্দশার জন্য আমাদের ইচ্ছার অভাব।

একটু পিছনে তাকান যাক, ৮০ এর দশকে হাতে গোনা কিছু প্রতিষ্ঠান কম্পিউটারে বাংলা ভাষা প্রয়োগের শুরু করেছিল। আজকের এই একবিংশ শতাব্দীতে সেখানে অজস্র প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে যারা কম্পিউটারে বাংলা প্রয়োগের জন্য কাজ করছে। এখন বাংলায় অনেক সফটওয়্যারও বের হয়েছে। আজ হতে দশ বছর আগে এই দৃশ্য কখনও দেখতে পাইনি। আর এই এতটা উন্নতির পিছনে ব্যবহারকারীদের থেকে যারা অতি উৎসাহে ব্যবসায়িকভাবে অসাফল্য হবে জেনেও কম্পিউটারে বাংলা প্রয়োগের জন্য চেষ্টা করে আসছেন তাদের ভুমিকাই বেশী। আমি অতি শ্রদ্ধার সাথে তাদের কৃতিত্ব স্বীকার করতে চাই। সেই সাথে সাধারণ ব্যবহারকারীদের বাংলা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সদিচ্ছার অভাবকে আমি তীব্র ভাষায় ধিক্কার জানাই। আসুন আমরা আরো বেশী করে কম্পিউটারে বাংলা প্রয়োগের চেষ্টা করি। আমি বলছি না কম্পিউটারে বাংলা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমস্ত প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু যত বেশী ব্যবহারকারী বাড়বে, কম্পিউটারে বাংলা প্রয়োগের প্রযুক্তি ততই উন্নত হবে। যদিও অর্থনীতি সম্বন্ধে আমি তেমন বুঝি না, তবে এতটুকু বুঝি যে পণ্যের চাহিদা বাজারে যত বেশী থাকবে তার মান ততই উন্নত হবে। আমাদের অনেক মেধাবী প্রোগ্রামার রয়েছেন, তারা যখন অসুবিধাগুলি আমাদের কাছ থেকে শুনবে বা জানবে, তখনই তারা পোগ্রামটির উন্নয়নের চেষ্টা করবেন। আমি এই কথা দ্বিধাহীন ভাবে বলতে পারি। তার অর্থ দাঁড়ালো আমরা যত বেশী কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার করবো প্রযুক্তিগত অসুবিধাগুলি ততই সমাধান হবে। আমরা কেউ ব্যবহার না করলে তার উন্নয়ন সাধন হবেনা। আর সেটা করবেটা কে? আমরা সবাই, এই প্রবন্ধের পাঠক আপনিই।

এইবার আসা যাক কীভাবে কম্পিউটারে বাংলা প্রয়োগ করতে পারি। না এর জন্য কোন খরচ আপনাদের করতে হবেনা, কোন সফট কিনতে হবেনা। তারপরেও কি কম্পিউটারে বাংলায় টাইপ করবেন না? যেহেতু আমাদের বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই হল Windows ব্যবহারকারী, তাই আজ আমি সহজ ভাবে তাদেরকেই উদ্দেশ্য করে লিখব।

আপনার কম্পিউটারটি যদি আপনি তা নিয়মিত আপডেট করেন তবে তাতেই আপনি বাংলা দেখতে পারবেন। মাইক্রোসফট তাদের কম্পিউটারে বাংলা প্রদর্শনের জন্য “বৃন্দা” নামক একটি ফন্টকে ডিফল্ট হিসাবে ব্যবহার করেছে। তবে ইচ্ছা করলে আপনি অনেক ওয়েবসাইট থেকে আরো কিছু সুন্দর সুন্দর ফন্ট আপনার কম্পিউটারে ইন্সটল করে নিতে পারেন। ওয়েবসাইটগুলির লিস্ট পরবর্তী পাতায় দেয়া হয়েছে। এছাড়া মাইক্রোসফট Windows xp এর জন্য ২৭শে জানুয়ারি ২০০৬ এ Bengali Language Pack ছেড়েছে, ফলে আপনার কম্পিউটারের কমান্ডগুলো বাংলায় দেখতে পারবেন। (তথ্য সংযুক্ত: ২০২৪ এর সময়ে আমাদের ব্যবহৃত সমস্ত কম্পিউটার, উইন্ডোজ, ম্যাক কিংবা মোবাইল ফোন, সবই বর্তমানে ইউনিকোড বাংলা সংযুক্ত আছে)

ইউনিকোড কি?

কম্পিউটারে প্রতিটি বর্ণকে মূলত কিছু সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করে। কেননা কম্পিউটারের ভিতরে সমস্ত কাজই হয় সংখ্যা দিয়ে। কম্পিউটার আমাদের মত বিভিন্ন ভাষা বুঝেনা, সে বুঝে শুধু “এক” ও “শূন্য”। তাই কম্পিউটারে প্রতিটি ভাষার বর্ণগুলিকে প্রকাশ করবার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড আছে। নির্ধারিত আছে কোন বর্ণটির কি কোড। সমস্যা হল বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সেরকম কোন সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড ছিলনা। যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলি প্রথম দিকে বাংলা টাইপিং সিস্টেম উদ্ভাবন করেছে তারা তাদের সুবিধামতো কোড ব্যবহার করেছে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের ফন্ট দিয়ে কোন ডকুমেন্ট (ফাইল) তৈরি করলে অন্য কম্পিউটারে সেই ফন্টটি না থাকলে তা দেখা যেত না। শুধু ডকুমেন্টই নয়, কোন ডাটাবেজ তৈরির ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা দিত। এই সমস্যার সমাধান হল ইউনিকোডের আবির্ভাবে। ইউনিকোড পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার বর্ণগুলিকে প্রকাশ করার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড চার্ট তৈরি করেছে এবং তাতে বাংলা ভাষাও স্থান পায়। আর ইউনিকোডকে মেনে নিয়েই বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলি। ফলে সুবিধা হল আপনি যদি ইউনিকোডে বাংলা লিখেন তবে ইমেইলটি কিংবা ফাইলটি অন্য কাউকে দিলে তার কম্পিউটারে ইউনিকোড ফন্ট থাকলে দেখতে কোন অসুবিধা হবেনা। এছাড়া Google, Yahoo, Hotmail জাতীয় ইমেইলও আপনি বাংলাতে লিখতে পারবেন।

এইবার আসা যাক কম্পিউটারে বাংলা টাইপ করবেন কীভাবে? আপনার কম্পিউটারে বাংলা ফন্ট থাকলে বাংলা দেখতে অসুবিধা হবেনা, কিন্তু বাংলা টাইপ করবার জন্য আপনাকে বিশেষ কিছু করতে হবে। মাইক্রোসফট যদিও ভারতের উদ্ভাবিত ইন্সক্রিপ টাইপিং পদ্ধতিটি ডিফল্ট হিসাবে গ্রহণ করেছে। তবে আমাদের দেশের সোনার ছেলেরা বসে নেই। তাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতির কথা আমি উল্লেখ করব।

ইউনিকোডে বাংলা টাইপিং

বাংলা টাইপের জন্য সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে টাইপ করা যায়। একটি হল বাংলা কিবোর্ড অপরটি হল ফনেটিক কিবোর্ড। বাংলা কিবোর্ড হল বিশেষ ধরনের কিবোর্ডের লেআউট যা বাংলা টাইপিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই কিবোর্ডের বিণ্যাসগুলি (layout) ইংরেজীর থেকে ভিন্ন, কেননা ইংরেজীর থেকে বাংলার বর্ণের সংখ্যা বেশী। বাংলা কিবোর্ড লেআউটগুলির মধ্যে প্রচলিত হল মুনির, ন্যাশনাল/জাতীয়, বিজয় ইত্যাদি। মুনির কিবোর্ড প্রচলিত হয় ১৯৭৩ সনে এবং এতদিন পর্যন্ত তা দিয়েই কম্পোজ এর কাজগুলি হয়ে এসেছে। আপনারা কোন টাইপরাইটার এর দোকানে গেলে সেরকম মুনির টাইপরাইটার দেখতে পারবেন। কিন্তু আমাদের সবারই কম্পিউটারের কিবোর্ড যেহেতু ইংরেজী কিবোর্ড তাই এই ইংরেজী কিবোর্ড দিয়ে বাংলার সমস্ত বর্ণগুলিকে টাইপ করা অসম্ভব। এছাড়া রয়েছে বাংলাতে যুক্তবর্ণ। এই সমস্যা সমাধানের জন্য মোস্তাফা জব্বার বিজয় নামে যুগান্তকারী পদ্ধতি নিয়ে আসেন। বিজয় কিবোর্ড তার যাত্রা শুরু করে ১৯৮৮ সনে। তবে তার আগেও অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলা টাইপিং নিয়ে কাজ করে, কে প্রথম কাজ শুরু করে তা হয়তো বিতর্কের বিষয়। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে বিজয় বাংলা টাইপিংয়ের ক্ষেত্রে এক বিপ্লব এনেছিল।

আর ফনেটিক টাইপিং হল ইংরেজী কিবোর্ড দিয়েই ইংরেজী উচ্চারণে বাংলা টাইপ করা। আপনি কোনটি দিয়ে টাইপ করবেন তা একান্তই আপনার ব্যাপার। যদি কোন কিবোর্ড মুখস্ত করাকে ঝামেলা বলে মনে হয় তবে ফনেটিক ব্যবহার করতে পারেন। তবে ফনেটিক ব্যবহারে ক্ষেত্রে অনেক সময়ই জটিল শব্দগুলি ইংরেজী উচ্চারণে প্রকাশ করতে যেয়ে বেশ সমস্যা হয়। তবে যে কোন একটা কিবোর্ড এর লেআউট মুখস্ত করে নিতে খুব কি কষ্ট করতে হবে? বাংলা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সেই কষ্টটুকু কি স্বীকার করবেন না? নাকি আগের মতই ইংরেজীতেই মনের ভাব প্রকাশ করবেন।

ফ্রি বাংলা টাইপিং এর সফটঃ

বর্তমানে বাণিজ্যিক অনেক সফটের পাশাপাশি কিছু ফ্রি সফটও বের হচ্ছে। নিম্নে কিছু বাংলা টাইপের ফ্রি সফটের সাইট উল্লেখ করলাম। এই সমস্ত সাইটের পোগ্রামাররা অনেক কষ্ট স্বীকার করে বিনামূল্যে তাদের উদ্ভাবিত সফটগুলি রেখেছে আপনাদের ব্যবহারের জন্যই। আপনারা যত ব্যবহার করবেন তাদের কষ্টটুকু সার্থক হবে।

  • অভ্র http://www.omicronlab.com [অভ্র ফনেটিক, সহজ অভ্র, বর্ণনা, জাতীয়, ইউনিবিজয়]
  • একুশে স্বাধীনতা http://www.ekushey.org/projects/shadhinota [রুপালী, ইনস্ক্রিপ্ট, প্রভাত, জাতীয়, ইউনিজয়]

যদি আপনার ঘরে কম্পিউটার থাকে আর যদি বন্ধুবান্ধবদের সাথে ইমেইলে যোগাযোগ করেন তবে বাঙালি হিসাবে প্রমাণ করার জন্য খামাখা পহেলা বৈশাখে পান্তাভাত খেয়ে প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। বরং একটু কষ্ট করে কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার করে নিজের বাঙালিত্ব প্রকাশ করুন। চলুন বাংলা ভাষাকে আরো সমৃদ্ধ করি। সেটাই আমি সবিনয়ে নিবেদন করছি।

মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকা

unicode_bangla.pdf

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org