ড. মশিউর রহমান
একটি কাল্পনিক ভ্রমণের কথা কল্পনা করা যাক। আপনি গাড়ি নিয়ে একটি গ্রামে বেড়াতে গেছেন। আজকের দিনের আধুনিক গ্রাম নয়—বিদ্যুৎ, গ্যাস, তেল কিছুই নেই। সেই গ্রামের রাস্তায় কোনো এক মাঠের পাশে এসে আপনার গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেল। মহাসমস্যায় পড়লেন আপনি। কিন্তু হঠাৎ গ্রামের এক কৃষক তার ক্ষেতের ভুট্টাগাছ থেকে আপনার গাড়ির জন্য তেলের বদলে একধরনের জ্বালানি তৈরি করে দিলেন।
কাল্পনিক শোনালেও এমন ব্যাপার একদিন হয়তো সত্যি হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্য কিংবা উন্নত বিশ্বের জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর না করে গ্রামে উৎপাদিত কৃষিপণ্য দিয়েই তৈরি করা যাবে তেলের বিকল্প জ্বালানি। এই জ্বালানির নাম—ইথানল জ্বালানি।
কেন ইথানল?
বর্তমান বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত ডিজেল, পেট্রল বা অকটেনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে মানুষ বহু বছর ধরেই বিকল্প জ্বালানির খোঁজ করছে। নানা ধরনের বিকল্প জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে মনে করা হচ্ছে ইথানলকে। এই ক্ষেত্রে পৃথিবীতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ব্রাজিল—দেশটি ১৯৭৮ সাল থেকেই গাড়িতে ইথানল ব্যবহার করে আসছে। ব্রাজিলে সাধারণ পেট্রলের মতোই বাণিজ্যিকভাবে ইথানল জ্বালানি বিক্রি হয়।
সাধারণ গাড়ির ইঞ্জিনেই ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। তবে মিশ্রণের পরিমাণ বাড়ালে ইঞ্জিনে সামান্য পরিবর্তন আনতে হয়—অনেকটা আমাদের দেশে সিএনজি ব্যবহারের জন্য যেমন ইঞ্জিন পরিবর্তন করা হয়, সে রকম। এই বিশেষ গাড়িগুলোকে বলা হয় ফ্লেক্স ফুয়েল গাড়ি (Flex-Fuel Vehicle)। টয়োটাসহ বিশ্বের অনেক গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখন এই ধরনের ফ্লেক্স গাড়ি তৈরি করছে।
কীভাবে কাজ করে?
এবার দেখা যাক জ্বালানি হিসেবে ইথানল কীভাবে কাজ করে। আমরা জানি, উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোকের শক্তি কাজে লাগিয়ে বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও পানিকে গ্লুকোজে রূপান্তরিত করে।
ইথানল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হলে অক্সিজেনের সঙ্গে দহন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও পানিতে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটিকে সরলভাবে দেখলে বোঝা যায়—সূর্যের আলোকশক্তিই এখানে তাপে রূপান্তরিত হয়ে গাড়ি চালাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইথানলকে এভাবে গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করলে পেট্রলজাতীয় জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বায়ো-ইথানল
জ্বালানি হিসেবে ইথানলের ব্যবহার আশাব্যঞ্জক হলেও একটি সমস্যা রয়েছে—ইথানল তৈরির জন্য বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। ইথানল সাধারণত আখ, আলু বা ভুট্টা থেকে তৈরি হয়। কৃষিপণ্য থেকে তৈরি হয় বলেই একে বলা হয় বায়ো-ইথানল। কৃষিপণ্য থেকে উৎপাদিত হওয়ায় এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা অর্থনীতিবিদেরা বারবার বলছেন। এই কারণেই বিজ্ঞানীরা এমন উদ্ভিদ থেকে ইথানল তৈরির গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন, যা সরাসরি আমাদের খাদ্য বা কৃষিপণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না।
গাছের গ্লুকোজকে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ইথানলে রূপান্তরিত করা হয়। বিজ্ঞানীরা এখন গাছের অপ্রয়োজনীয় অংশ—যেমন কাণ্ড ও পাতা থেকেও ইথানল তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। গাছের সেলুলোজ থেকে ইথানল তৈরির এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সেলুলোসিক ইথানল। এ ছাড়া কমলার খোসা ও পুরোনো সংবাদপত্র থেকেও ইথানল তৈরির পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে শৈবাল থেকে ইথানল তৈরির প্রক্রিয়া। ব্রাজিলে ইতিমধ্যে শৈবাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে ইথানল উৎপাদন শুরু হয়েছে। শৈবাল থেকে ইথানল তৈরি করলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় খরচ প্রায় চল্লিশ গুণ কম পড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশেও গাড়ির জ্বালানি হিসেবে ইথানল ব্যবহারের প্রক্রিয়া চলছে। চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ২০০৭ সাল থেকে ইথানল প্ল্যান্ট তৈরির কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া আরও দুটি কারখানা তৈরির প্রক্রিয়া চলমান। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইথানলের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আরেকজন কৃতী বিজ্ঞানী ড. আতাউল করিমের গবেষক দলও এই বিষয়ে কাজ করছেন।
সেই দিন বোধহয় খুব বেশি দূরে নয়, যখন পেট্রলজাতীয় জ্বালানির ওপর আমাদের নির্ভরতা কমবে এবং আমাদের গাড়িগুলো চলবে ইথানলে। তখন হয়তো শুরুতে বলা কল্পকাহিনিই বাস্তবে রূপ নেবে।
(লেখাটি ২০০৯ মার্চ মাসে লিখিত)
লেখক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত এবং একটি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক পোর্টালের সম্পাদক।

Leave a comment