ড. মশিউর রহমান
রোবট এর কথা শুনলে আপনারা হয়তবা ভাববেন মানুষের আকৃতির লোহালক্কর দিয়ে তৈরি একটি যন্ত্র যা মানুষের মত কথা বলা, হাঁটার কিংবা কাজ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু মানুষের আকার নয়, বিজ্ঞানীরা অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রোবট বানানোর চেষ্টা করছেন। এই সমস্ত ক্ষুদ্র রোবট চিকিৎসা ক্ষেত্রে বেশ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মনে করা যাক আপনার পায়ের কোথাও ব্যথা হয়েছে। ডাক্তার তখন আপনাকে খাবার কিছু ওষুধ দিলেন। ওষুধটি খাবার পরপরে আপনার পাকস্থলী থেকে রক্তের মাধ্যমে ওষুধটি আপনার পায়ের সেই ব্যথার স্থানে পৌঁছাল এবং ওষুধটি তার কাজ শুরু করল। কিন্তু সমস্যা হল ওষুধটি পায়ে যাবার পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য সব জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়বে। অনেক সময়ই এই অপ্রয়োজনীয় স্থানগুলোতে ওষুধ পৌঁছানোর পরে তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া করে, যাকে আমরা সাইড-ইফেক্ট বলি। সব ওষুধেরই কোন না কোন সাইড-ইফেক্ট রয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা তা কমানোর চেষ্টা করে আসছেন।
ওষুধের সাইড-ইফেক্ট কমানোর পাশাপাশি নতুন একটি কৌশল ভাবা হচ্ছে— ওষুধটি শুধুমাত্র যেখানে প্রয়োজন সেই স্থানেই পৌঁছবে। এই পদ্ধতিকে ড্রাগ ডেলিভারি বলা হচ্ছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট জায়গাতে ওষুধকে পৌঁছানোর কথা ভাবা হচ্ছে। ন্যানোসাইজের ক্ষুদ্র আকারের রোবট বা ন্যানোরোবট দিয়ে পৌঁছানোর ব্যাপারে বেশ গবেষণা চলছে। ন্যানো বা ন্যানোমিটার হল দৈর্ঘ্য পরিমাপের একটি একক। এক মিটারের ১০⁻⁹ বা এক মিটারের ১০০,০০,০০,০০০ (এক শত কোটি) ভাগের এক ভাগকে এক ন্যানোমিটার বলা হয়। এই ন্যানোমিটার আকার এত ক্ষুদ্র যে তা খালি চোখে দেখতে পারবেন না।
ন্যানোরোবট এর সাথে ওষুধ দেয়া হবে এবং তা ইনজেকশনের মাধ্যমে আপনার রক্তের ভিতরে ঢুকানো হবে। ন্যানোরোবট রক্তে সাঁতার কেটে সমস্যার জায়গাটিতে পৌঁছবে এবং ওষুধটি পৌঁছে দিবে। গল্পে ও সিনেমায় আমরা এইরকম অনেক কল্পকাহিনী শুনেছি। তবে কল্পনায় নয়, বিজ্ঞানীরা এখন তা বাস্তবে রূপান্তর করার চেষ্টা করছেন।
গত এক দশক ধরে ন্যানোরোবট তৈরির জন্য বিভিন্নভাবে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন। কী দিয়ে এই ন্যানোরোবট তৈরি করা যায়? সেইরকম ভালো উপকরণের খোঁজে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন। তারা চেষ্টা করছেন বিভিন্ন ধরনের ন্যানো আকারের উপকরণ যেমন— ন্যানোফাইবার, কার্বন ন্যানোটিউব, ন্যানো ক্রিস্টাল ইত্যাদি। এই উপকরণগুলি চমৎকার, কিন্তু এইগুলি দিয়ে ন্যানো আকারের কিছু তৈরি করবার পদ্ধতি খুবই কঠিন। এমন নয় যে এইসব পদার্থ দিয়ে ন্যানো আকারের কিছু তৈরি করা সম্ভবই নয়, তা নয়। আমাদের সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কম্পিউটারের প্রসেসর ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সার্কিটগুলি তৈরি করা হয়, সেই প্রযুক্তি দিয়েও কিছুটা তৈরি করা সম্ভব। এই প্রযুক্তিগুলিকে ফ্যাব্রিকেশন প্রযুক্তি বলা হয়। সমস্যা হল, ন্যানো আকারের ফ্যাব্রিকেশন প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করা অনেক সময়সাপেক্ষ ও অনেক খরচের ব্যাপার।
বিজ্ঞানীরা এমন একটি উপকরণের খোঁজে ছিলেন যাকে খুব সহজেই প্রোগ্রাম করে দেয়া যাবে— আমরা ডিজাইন করব আর তা আপনা-আপনি নিজেই তৈরি হবে। নিজে-নিজেই এই তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে সেলফ অ্যাসেম্বল (self-assemble) বলা হয়। এমন সময় আশার বাণী নিয়ে এলেন ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পল রোথেমুন্ড (Paul Rothemund)। ২০০৬ এর শুরুর দিকে পল আমাদের পরিচিত ডিএনএ দিয়ে পৃথিবীর একটি ম্যাপ ন্যানো আকারের মধ্যে তৈরি করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেন।

পল রোথেমুন্ড এবং তার তৈরী ন্যানো আকারের ম্যাপ
ডিএনএ আমাদের শরীরের কোষের মধ্যে থাকা বিশাল তথ্যকেন্দ্র যা বংশ পরম্পরায় পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে বাহিত হয়। এই ডিএনএ মূলত চারটি উপাদান নিয়ে তৈরি, যেগুলি হল A, T, C এবং G। এর মধ্যে মজার ব্যাপার হল A শুধুমাত্র T এবং C শুধুমাত্র G-এর সাথেই সংযুক্ত হয়। পল দেখালেন যে এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে যদি ভালো মতো একটি সুন্দর টেম্পলেট তৈরি করা যায়, তবে ন্যানো আকারের মনের মতন যেকোনো জিনিস তৈরি করা সম্ভব হবে। মজার ব্যাপার হল, সত্যিই সত্যিই দেখা গেল ডিএনএ-র এই মৌলিক bases গুলিকে একত্র করে মনের মতো ডিজাইনের জিনিস তৈরি করা সম্ভব হবে।
পলের আবিষ্কার একটি নতুন দিকের সূচনা করে। বিজ্ঞানীরা ন্যানোরোবট তৈরির জন্য ডিএনএ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন। এখন সত্যিকারের ন্যানোরোবট তৈরি করতে হলে এটি শুধুমাত্র কোনো কিছুর উপর আঁকা হলে চলবে না, এটি দিয়ে ত্রিমাত্রিক কিছু বানাতে হবে। কয়েক বছর পরে উইলিয়াম শিহ্ (William Shih) বিভিন্ন ধরনের ত্রিমাত্রিক জিনিস তৈরি করতে সফল হন। এর ফলে প্রমাণিত হল, ডিএনএ দিয়ে ন্যানো সাইজের জিনিস তৈরি করা সম্ভব হবে। এতদিন পর্যন্ত ডিএনএ দিয়ে শুধুমাত্র পাশাপাশিভাবে বর্ধিত করা যেত, একে বাঁকানো সত্যিই অসম্ভব একটি ব্যাপার ছিল, যা উইলিয়ামের টিম সম্ভব করেন।

উইলিয়ামের ল্যাবে ডিএনএ দিয়ে তৈরী করা বিভিন্ন ত্রিমাত্রিক ন্যানোসাইজের পদার্থ
এছাড়া আমেরিকার এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক ব্যাথে (Mark Bathe) একটি মজার সফটওয়্যার তৈরি করেন যেটি দিয়ে খুব সহজেই ডিএনএ দিয়ে ন্যানো আকারের বস্তুর ডিজাইন করা যাবে। তার উদ্ভাবিত সফটওয়্যারের নাম CanDo এবং এটি একটি উন্মুক্ত (open-source) সফটওয়্যার। আপনি এটি দিয়ে ন্যানো আকারের ইচ্ছেমতো কিছু ডিজাইন করতে পারবেন, তারপর কোনো কোম্পানিকে সেই ডিজাইনটি পাঠিয়ে দিলে তারা ডিএনএ দিয়ে আপনার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি তৈরি করে দিতে পারবে।
অদূর ভবিষ্যতে ডিএনএ দিয়েই এই ন্যানোরোবট তৈরি করা হয়তবা সম্ভব হবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে ন্যানোরোবট ক্যান্সার নিরাময়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে। ক্যান্সারের দুষ্টু কোষগুলিকে ন্যানোরোবটগুলি তার ডিএনএ দিয়ে সহজেই যাচাই করে খুঁজে বের করতে পারবে এবং তা ধ্বংস করে ফেলতে পারবে।

বিজ্ঞানীদের কল্পনার ন্যানোরোবট
ডিএনএ দিয়ে যেহেতু মনের মতো ডিজাইন করে ন্যানোআকারের বস্তু তৈরি করা যাবে তাই নয়, এই ডিএনএকে ব্যবহার করা সম্ভব তথ্যকেন্দ্র হিসাবেও, যা রোবটের জন্য প্রয়োজন। ডিএনএ-ই নয়, পাশাপাশি প্রোটিন দিয়েও এভাবে ডিজাইন করে ন্যানোরোবট তৈরি করা যায় কিনা তার কাজ চলছে। প্রকৃতি জগতের এই সমস্ত জৈব পদার্থকে উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করে রোবট তৈরি করা সত্যিই বেশ অবাক করা বিষয়। কিন্তু সেইদিন মনে হয় আর বেশি দূরের নয়, যখন আপনি হাসপাতালে গেলে ডাক্তার আর ওষুধ নয়, ইনজেকশনের মাধ্যমে আপনার রক্তে ন্যানোরোবট ঢুকিয়ে দেবেন এবং তা আপনার আক্রান্ত জায়গাতে পৌঁছে আপনার সমস্যার সমাধান করে দেবে।

Leave a comment