উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগগবেষণায় হাতে খড়ি

“ভুল মানেই ব্যর্থতা নয়, ভুলই গবেষণার শিক্ষক” – ড. মো. হাফিজুর রহমান

Share
Share

“ভুল গবেষণার ব্যর্থতা নয়; ভুল হলো শেখার দরজা। যে ভুল থেকে শেখে, সেই ধীরে ধীরে ভালো গবেষক হয়ে ওঠে।”

শিক্ষাজীবনে আমরা অনেক সময় ভুলকে ভয় পাই। পরীক্ষায় ভুল উত্তর দিলে নম্বর কমে যায়, কোনো প্রজেক্টে ভুল করলে শিক্ষক সংশোধন করেন, গবেষণাপত্র প্রত্যাখ্যাত হলে মন খারাপ হয়। তাই অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, ভুল মানেই ব্যর্থতা। কিন্তু গবেষণার জগতে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। এখানে ভুল, প্রত্যাখ্যান, সংশোধন—এসবই শেখার স্বাভাবিক অংশ।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকারে এই শিক্ষা খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি নিজেই বলেছেন, বাংলাদেশে ফিরে গবেষণা শুরু করার পর শুরুতে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো প্রয়োজনীয় উপকরণ ছিল না, কখনো যন্ত্রপাতি ছিল না, কখনো যে কাজ জাপানে তিন মাসে করা যেত, বাংলাদেশে সেটি শেষ করতে এক বছর লেগেছে। কষ্ট করে গবেষণাপত্র লিখলেও ভালো জার্নালে জমা দিলে প্রথম দিকে প্রত্যাখ্যান এসেছে। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এ অভিজ্ঞতা তাঁকে বারবার মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি থেমে যাননি; ধীরে ধীরে কাজের মান, লেখা, বিশ্লেষণ ও গবেষণার উপস্থাপনা উন্নত করে ২০২০-২১ সালের দিকে কিউওয়ান জার্নালেও গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন।

এই অভিজ্ঞতা তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ গবেষণা কোনো সরল রাস্তা নয়। এখানে প্রথম চেষ্টাতেই সবকিছু ঠিক হবে—এমন আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। একটি পরীক্ষা ব্যর্থ হতে পারে, কোনো উপাদান ঠিকমতো কাজ না করতে পারে, ডাটা প্রত্যাশামতো না আসতে পারে, গবেষণাপত্র জার্নাল থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু এগুলো গবেষণার শেষ নয়; বরং এগুলোই গবেষণাকে পরিণত করে।

একজন শিক্ষার্থী যদি ভুলকে ব্যক্তিগত অপমান মনে করে, তাহলে সে দ্রুত ভেঙে পড়ে। কিন্তু যদি ভুলকে তথ্য হিসেবে দেখে—“কেন হলো?”, “কোথায় সমস্যা?”, “কীভাবে উন্নত করা যায়?”—তাহলে সেই ভুলই তাকে পরবর্তী ধাপে এগিয়ে দেয়।

গবেষণার ভাষায় ব্যর্থ পরীক্ষা মানেই অকারণ কাজ নয়। অনেক সময় একটি ব্যর্থ পরীক্ষা আমাদের জানায় কোন পথে এগোনো উচিত নয়। যেমন একজন পথিক যদি ভুল রাস্তা ধরে বুঝতে পারেন যে এ পথে গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না, সেটিও মূল্যবান জ্ঞান। কারণ এখন তিনি জানেন কোন পথ এড়িয়ে চলতে হবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসেও বহু বড় আবিষ্কার এসেছে ভুল, ব্যর্থতা বা অপ্রত্যাশিত ফলাফল থেকে।

ড. হাফিজুর রহমান তরুণদের বলেছেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভুল মানুষেরই হয়। তাঁর নিজেরও ভুল হয়। কোনো কাজই শতভাগ নিখুঁত হবে—এমন নয়। কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নিতে পারলে সেটিই গবেষণার শক্তি হয়ে ওঠে। তিনি শিক্ষার্থীদের শেখার মানসিকতার ওপর জোর দিয়েছেন—শুধু কাজ শেষ করা নয়, কাজের প্রক্রিয়াটি বোঝা জরুরি।

আজকের অনেক শিক্ষার্থীর একটি বড় সমস্যা হলো তারা ব্যর্থতাকে সহ্য করতে শেখেনি। একটি গবেষণাপত্র ফিরিয়ে দিলে তারা ভাবে, “আমি পারব না।” একটি প্রেজেন্টেশন খারাপ হলে ভাবে, “আমি গবেষণার জন্য উপযুক্ত নই।” একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করতে না পারলে ভাবে, “এটা আমার দ্বারা হবে না।” কিন্তু ড. হাফিজুর রহমানের জীবন আমাদের বলে—প্রথম ব্যর্থতা শেষ কথা নয়; বরং সেটিই আসল প্রস্তুতির শুরু।

আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। একটি প্রবন্ধ প্রত্যাখ্যাত হওয়া মানে গবেষণাটি মূল্যহীন—তা নয়। কখনো জার্নালের পরিধির সঙ্গে বিষয়টি মেলে না, কখনো পদ্ধতিগত উন্নতি দরকার হয়, কখনো ভাষা বা উপস্থাপনা আরও স্পষ্ট করতে হয়, কখনো ফলাফলের বিশ্লেষণ শক্তিশালী করতে হয়। ভালো গবেষক এই প্রতিক্রিয়াকে আক্রমণ হিসেবে দেখেন না; তিনি এটিকে উন্নতির নির্দেশনা হিসেবে দেখেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় গবেষণার চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। সীমিত ল্যাব সুবিধা, কম ফান্ড, প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বা যন্ত্রের অভাব, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা—এসব বাধা গবেষককে ধীর করে দেয়। কিন্তু এগুলোই অনেক সময় গবেষককে আরও সৃজনশীল হতে শেখায়। সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করা মানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভেবে নেওয়া, প্রতিটি ডাটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা, প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানো।

এই জায়গায় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় শিক্ষা হলো—ভুলের ভয় যেন শেখার আগ্রহকে মেরে না ফেলে। আপনি যদি গবেষণাপত্র পড়তে গিয়ে বুঝতে না পারেন, সেটি ব্যর্থতা নয়। আবার পড়ুন। সিনিয়রকে জিজ্ঞেস করুন। শিক্ষককে প্রশ্ন করুন। আপনি যদি প্রথমবার গ্রাফ ভালো বানাতে না পারেন, সেটিও ব্যর্থতা নয়। আবার চেষ্টা করুন। সফটওয়্যার শিখুন। উদাহরণ দেখুন। আপনি যদি প্রেজেন্টেশনে আটকে যান, সেটিও শেষ নয়। পরেরবার আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিন।

গবেষক হওয়ার পথে ভুল হলো একধরনের আয়না। এটি আমাদের দুর্বলতা দেখায়। আর দুর্বলতা দেখার সুযোগ পাওয়া মানেই উন্নতির সুযোগ পাওয়া। যে শিক্ষার্থী নিজের ভুল দেখতে পারে না, সে এগোতে পারে না। যে শিক্ষার্থী ভুল স্বীকার করতে পারে, সে নিজেকে বদলাতে পারে।

ড. হাফিজুর রহমানের অভিজ্ঞতা তাই শিক্ষার্থীদের মনে সাহস জাগায়। তিনি জাপানের উন্নত গবেষণাগারেও শিখেছেন, দেশে ফিরে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিখেছেন, প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়েও এগিয়েছেন। তাঁর গবেষণাপথ আমাদের বলে—গবেষণায় সফলতা আসে একদিনে নয়; আসে বারবার চেষ্টা, সংশোধন, ধৈর্য এবং শেখার মানসিকতার মধ্য দিয়ে।

তাই শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার—

ভুল করলে ভয় পাবেন না।

প্রত্যাখ্যাত হলে থেমে যাবেন না।

না পারলে লজ্জা পাবেন না।

জিজ্ঞেস করুন, শিখুন, আবার চেষ্টা করুন।

কারণ ভুল গবেষণার বিপরীত নয়; ভুল গবেষণারই অংশ।

আর যে ভুল থেকে শেখে, সে-ই একদিন ভালো গবেষক হয়ে ওঠে।

তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার :

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org