পদার্থবিদ্যাপরিবেশ ও পৃথিবীসাধারণ বিজ্ঞান

“হাইড্রোজেন এনার্জির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—এটি কার্বনমুক্ত; এর বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে মূলত পানি তৈরি হয়।” – ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানা

Share
Share

কার্বনমুক্ত শক্তির স্বপ্ন: হাইড্রোজেন কেন ভবিষ্যতের জ্বালানি হতে পারে

“হাইড্রোজেন এনার্জির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো—এটি কার্বনমুক্ত; এর বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে মূলত পানি তৈরি হয়।”

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটির মধ্যেই ভবিষ্যতের জ্বালানি ব্যবস্থার একটি বড় স্বপ্ন লুকিয়ে আছে। এমন এক জ্বালানি, যা শক্তি দেবে, কিন্তু বাতাসকে বিষাক্ত করবে না; বিদ্যুৎ তৈরি করবে, কিন্তু আকাশে কার্বনের বোঝা বাড়াবে না; শিল্প, পরিবহন ও ঘরবাড়ির প্রয়োজন মেটাবে, কিন্তু জলবায়ু সংকটকে আরও গভীর করবে না।

আজকের পৃথিবীতে আমরা যে শক্তি ব্যবহার করি, তার বড় অংশ এখনো আসে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে—কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস। এগুলো পোড়ালে শক্তি পাওয়া যায়, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি হয় কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ নানা ক্ষতিকর গ্যাস। এই কার্বন ডাই-অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে জমে পৃথিবীর তাপ ধরে রাখে। এর ফলে বাড়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বদলে যায় জলবায়ুর স্বাভাবিক ছন্দ, বাড়ে ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি, খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি।

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই সংকট আরও বাস্তব। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অস্বাভাবিক বন্যা—এসব শুধু ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এগুলো এখনই মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। তাই জ্বালানি নিয়ে আলোচনা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের আলোচনা নয়; এটি পরিবেশ, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।

এই জায়গাতেই হাইড্রোজেন এনার্জি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাইড্রোজেন ব্যবহার করে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে সাধারণ জীবাশ্ম জ্বালানির মতো ধোঁয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয় না। এর প্রধান উপজাত হলো পানি। অর্থাৎ, যেখানে কয়লা পোড়ালে ধোঁয়া ও কার্বন তৈরি হয়, সেখানে হাইড্রোজেন ব্যবহার করলে পাওয়া যায় বিদ্যুৎ এবং পানি।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। সব হাইড্রোজেন একই রকম পরিবেশবান্ধব নয়। যদি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে হাইড্রোজেন তৈরি করা হয়, তাহলে সেই প্রক্রিয়ায় কার্বন নির্গমন হতে পারে। কিন্তু যদি পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করা হয় এবং সেই পানি ভাঙার বিদ্যুৎ আসে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি বা অন্য কোনো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে, তখন তাকে বলা যায় গ্রিন হাইড্রোজেন। এই গ্রিন হাইড্রোজেনই ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিকগুলোর একটি।

ড. রানা তাঁর গবেষণায় এই পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সাশ্রয়ী করার চেষ্টা করছেন। কারণ প্রযুক্তি শুধু পরিবেশবান্ধব হলেই যথেষ্ট নয়; সেটি মানুষের নাগালের মধ্যেও আসতে হবে। যদি কোনো প্রযুক্তির খরচ এত বেশি হয় যে সাধারণ মানুষ বা উন্নয়নশীল দেশগুলো তা ব্যবহার করতে না পারে, তাহলে তার বাস্তব প্রভাব সীমিত থেকে যায়। এ কারণেই তিনি ব্যয়বহুল প্লাটিনাম বা ইরিডিয়ামের মতো ধাতুর বদলে তুলনামূলক সস্তা নন-নোবেল মেটাল ক্যাটালিস্ট নিয়ে কাজ করছেন।

কার্বনমুক্ত জ্বালানির ধারণা আমাদের উন্নয়ন-ভাবনাকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এতদিন শিল্পায়ন মানেই ছিল বেশি জ্বালানি ব্যবহার, বেশি ধোঁয়া, বেশি কার্বন। কিন্তু ভবিষ্যতের বিজ্ঞান বলছে—উন্নয়ন ও পরিবেশকে মুখোমুখি দাঁড় করানো প্রয়োজন নেই। সঠিক প্রযুক্তি, নীতিনির্ধারণ এবং গবেষণা বিনিয়োগ থাকলে এমন শক্তি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব, যা অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে, আবার পরিবেশকেও রক্ষা করবে।

বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য এই ক্ষেত্রটি বিশেষ সম্ভাবনাময়। আমাদের দেশে পানি আছে, সূর্যালোক আছে, জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ আছে, আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও আছে। তাই হাইড্রোজেন এনার্জি শুধু উন্নত দেশের গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার কথাটি তাই শুধু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নয়, একটি দিকনির্দেশনাও—ভবিষ্যতের জ্বালানি হতে হবে পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। কার্বনমুক্ত শক্তির এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন গবেষণা, ধৈর্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ।

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org