টরন্টোর এক হাসপাতালের ভেতর এলিভেটরে উঠলে প্রায়ই দেখা যায় একজন নীরব কর্মী ধীরে ধীরে বোতাম টিপছেন। অনেকেরই জানা থাকে না যে এই ব্যক্তি একসময় নিজের দেশে ছিলেন একজন অভিজ্ঞ সার্জন। তার হাত একসময় মানুষের বুকের ভেতর tumor অপসারণ করত, তার সিদ্ধান্তে জীবন-মৃত্যুর দ্বন্দ্ব মীমাংসা হতো। নতুন দেশে এসে তিনি হয়ে গেছেন একজন এলিভেটর অপারেটর, কারণ কানাডার কঠোর লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার কারণে তিনি আর আগের পেশায় ফিরতে পারেননি।
এই দৃশ্যটি কোনো একক মানুষের নয়। কানাডায় আসা হাজারো আন্তর্জাতিক চিকিৎসকের একই রকম ভাগ্য হয়। সরকারি পরিসংখ্যান শীতলভাবে জানায় যে কানাডায় বিদেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের মাত্র তিন থেকে পাঁচ শতাংশ লাইসেন্স পান, আর বাকি পঁচানব্বই থেকে সাতানব্বই শতাংশ সেই কাঙ্ক্ষিত অনুমতির বাইরে থেকে যান। তবে এই সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে যে মানবিক গল্প, যে মানসিক বিপর্যয় আর যে আত্মপরিচয়ের সংকট, তা কোনো গবেষণাপত্রে ফুটে ওঠে না।
অনেক চিকিৎসক নতুন দেশে এসে দেখেন যে তাদের দক্ষতা আর জানাশোনা যেন হঠাৎ করেই মূল্যহীন হয়ে গেছে। লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার পরীক্ষা, নথিপত্র যাচাই, রেসিডেন্সি পাওয়ার প্রতিযোগিতা, উচ্চ ব্যয় আর বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার কারণে তারা পেশায় ফিরতে পারেন না। কিছুদিন পর তারা বাধ্য হন জীবনধারণের জন্য এমন কাজ করতে যেগুলোর সঙ্গে তাদের পেশাগত পরিচয়ের কোনো মিল নেই। কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ করেন, কেউ ট্যাক্সি চালান, কেউ গুদামে মাল গুছান, আর কেউ গ্রোসারি স্টোরের ক্যাশ কাউন্টারে দাঁড়ান। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পতন নয়, বরং গভীর মানসিক আঘাতও বটে।
অনেকেই দীর্ঘসময় ধরে হতাশা, স্ট্রেস এবং পরিচয় হারানোর যন্ত্রণায় ভোগেন। একজন চিকিৎসক যেখানে শপথ নিয়েছিলেন মানুষের জীবন বাঁচানোর, সেখানে তাকে কাজ খুঁজতে হয় এমন জায়গায় যেখানে তার দক্ষতা বা জ্ঞান ব্যবহার হয় না। এই হতাশা পরিবারেও প্রভাব ফেলে, সম্পর্ক ভেঙে যায়, আত্মমর্যাদা ক্ষয়ে যায় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একধরনের অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে।
যারা হাল ছাড়েন না, তাদের অনেকেই বিকল্প পথ খোঁজেন। এই বিকল্প পথের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ Internationally Trained Medical Doctors বা ITMD Program। এই প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছেন একজন বাংলাদেশি গবেষক এবং জনস্বাস্থ্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, ড. শফি ভূঁইয়া, যিনি নিজেও কানাডায় এসে অভিবাসী চিকিৎসকদের সংগ্রাম firsthand দেখেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে বিদেশি চিকিৎসকরা শুধুই ডাক্তার নন, তারা দক্ষ গবেষক, বিশ্লেষক, প্রজেক্ট ম্যানেজার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্যনীতির ভাষ্যকারও হতে পারেন।
তার উদ্যোগে টরন্টো মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে যাত্রা শুরু করে ITMD Program, যা অভিবাসী চিকিৎসকদের জন্য তিন মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং পরবর্তী প্র্যাকটিকাম সুযোগ তৈরি করে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্যগবেষণা, ডেটা বিশ্লেষণ, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, স্বাস্থ্যনীতির কাঠামো এবং কানাডার স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতা সম্পর্কে জানেন। এর ফলে তারা গবেষণাগার, সরকারি স্বাস্থ্য দপ্তর, হাসপাতালের পলিসি ইউনিট, কমিউনিটি হেলথ অর্গানাইজেশন বা স্বাস্থ্য-ডেটা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ পান।
এই প্রোগ্রাম কানাডায় অভিবাসী চিকিৎসকদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। এখন পর্যন্ত শত শত বিদেশি চিকিৎসক এই প্রোগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন এবং তারা দেশটির স্বাস্থ্যসেক্টরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তারা আবার ফিরেছেন আত্মমর্যাদায়, পেশাগত পরিচয়ে, এবং সমাজে অর্থবহ ভূমিকা পালনের পথে।

তবে প্রশ্ন একই থাকে। কেন এত দক্ষ চিকিৎসক লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার বাইরের অন্ধকারে পড়ে থাকবেন? কেন কানাডা তাদের দক্ষতাকে যথাযথ সম্মান দেয় না? বিশেষত এমন সময়ে যখন দেশের সর্বত্র চিকিৎসক সংকট, নার্স সংকট এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে।
অভিবাসী চিকিৎসকদের এই অদৃশ্য সংগ্রাম আসলে একটি বৃহত্তর নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। একজন সার্জন যখন শপিং মলের সিকিউরিটি গার্ড হন, একজন গাইনোকোলজিস্ট যখন গুদামে নাইট শিফটে কাজ করেন, তখন শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি হয় না, বরং পুরো সমাজ একটি সম্ভাবনা হারায়।
কানাডার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও এটি এক বিরাট অপচয়। এই দেশ যখন অভিবাসীদের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে চায়, তখন সেই দক্ষতাকে মূল্যায়নের উপযুক্ত কাঠামোও তৈরি করতে হয়। ITMD এর মতো উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে যে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবধর্মী সেতুবন্ধন থাকলে সাতানব্বই শতাংশ মানুষও নিজেদের নতুনভাবে গড়তে পারেন।
যে তিন শতাংশ লাইসেন্স পান, তারা অবশ্যই সফল হন। কিন্তু যে সাতানব্বই শতাংশ অদৃশ্য থেকে যান, তাদের গল্পও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের হারানো আত্মমর্যাদা, তাদের বেদনা, তাদের সম্ভাবনা এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়ন নিয়ে আমাদের আরও খোলামেলা আলোচনা প্রয়োজন। কারণ দক্ষতা হারায় না, সুযোগ না পেলে তা শুধু অন্ধকারেই আলো খুঁজতে থাকে।
বিদেশি চিকিৎসকদের সক্ষমতাকে ন্যায়সঙ্গতভাবে মূল্যায়ন করতে পারলেই কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ হবে, উন্নত হবে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমৃদ্ধ হবে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি।

Leave a comment