একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল তার ভবন, ছাত্রসংখ্যা বা র্যাংকিং দিয়ে মাপা যায় না। টেকসই গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি স্পষ্ট ও সুসংহত দিকনির্দেশনা—একটি ভিশন। ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের দীর্ঘ একাডেমিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতায় এই বিষয়টি বারবার স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পষ্ট ভিশন না থাকলে গবেষণা কার্যক্রম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠান তার প্রকৃত সক্ষমতা অনুযায়ী অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না।
ড. করিম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখেছেন, যখন গবেষণার জন্য নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার বা ফোকাল এরিয়া নির্ধারিত থাকে না, তখন শিক্ষক-গবেষকরা ব্যক্তিগত আগ্রহ অনুযায়ী কাজ করেন। এতে বিচ্ছিন্নভাবে ভালো কিছু গবেষণা হতে পারে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক শক্তি কোনো একটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত হয় না। ফলাফল হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় তার গবেষণা সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুসংহতভাবে তুলে ধরতে পারে না। একটি স্পষ্ট ভিশন থাকলে, গবেষণা তহবিল বণ্টন, নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—সবকিছুই একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
ভিশনের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে ড. করিম প্রায়ই ‘রিসার্চ ইকোসিস্টেম’-এর কথা বলেন। একটি ইকোসিস্টেমে যেমন প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিবেশেও শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন ও শিল্পখাতের সংযোগ থাকা জরুরি। স্পষ্ট ভিশন না থাকলে এই উপাদানগুলোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি হয় না। কিন্তু যখন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তখন গবেষণা প্রকল্পগুলো একে অপরকে শক্তিশালী করে তোলে।
ড. করিমের অভিজ্ঞতায়, ভিশন বাস্তবায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনবল নিয়োগ ও পদোন্নতির নীতিমালা। যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তবে সেই ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং গবেষণায় অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এতে করে শিক্ষক-গবেষকরাও বুঝতে পারেন যে তাঁদের কাজ কীভাবে বৃহত্তর প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এই উপলব্ধি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। অনেক প্রতিষ্ঠানে একই সঙ্গে সব বিষয়ে বড় হওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। ফলে সীমিত সম্পদ ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানের উৎকর্ষ গড়ে ওঠে না। ড. করিমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, স্থানীয় প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনায় কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গবেষণার ভিশন নির্ধারণ করলে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী গবেষণা পরিচিতি গড়ে তুলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পষ্ট ভিশন গবেষণাকে কেবল দিকনির্দেশনা দেয় না; এটি গবেষকদের কাজকে অর্থবহ করে তোলে। যখন একটি প্রতিষ্ঠান জানে সে কোথায় যেতে চায়, তখন গবেষণাও এলোমেলো না হয়ে একটি সুসংহত পথ ধরে এগিয়ে যায়।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment