বাস্তবতা হলো—ভ্যাক্সিন ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। Smallpox নির্মূল হওয়া, polio নিয়ন্ত্রণ এবং হামজনিত মৃত্যুহার কমে যাওয়ার পেছনে টিকাদানের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। তাই ভ্যাক্সিন সম্পর্কে ভুল তথ্য বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিভ্রান্ত না হয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি। জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ মহামারী মোকাবিলায় টিকাদান এখনো মানবসভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন।
সাম্প্রতিক সময়ে Measles বা হাম সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং টিকাদান সংকট নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গোষ্ঠী টিকাবিরোধী বিভিন্ন গুজব ও অপপ্রচার ছড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের দাবি—ভ্যাক্সিন মূলত দরিদ্র দেশগুলোর মানুষের উপর “গোপন পরীক্ষা” চালানোর একটি মাধ্যম। বাস্তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো ভ্যাক্সিন বা ওষুধ বাজারে আসার আগে বহুস্তরীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রিক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন এবং কঠোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক নৈতিক নীতিমালা ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাই বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে “প্রিক্লিনিক্যাল টেস্ট” আসলে কী, কেন করা হয় এবং কীভাবে একটি ওষুধ বা ভ্যাক্সিন মানুষের ব্যবহারের অনুমোদন পায়।

আমি তাহসিন, একজন বায়োটেকনোলজি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি কোর্সের অংশ হিসেবে একদিন আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো Dow University of Health Sciences এর প্রিক্লিনিক্যাল অ্যান্ড টক্সিসিটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। প্রবেশমুখেই চোখে পড়ল Rat House, Rabbit House, Guinea Pig Unit, Horse Shed এবং Snake House। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রিত কক্ষে সাদা ল্যাবরেটরি ইঁদুর, খরগোশ ও অন্যান্য পরীক্ষাগার প্রাণী রাখা হয়েছে। প্রথম দেখায় বিষয়টি অনেকের কাছেই অস্বস্তিকর বা প্রশ্নবিদ্ধ মনে হতে পারে। কেন এই প্রাণীগুলো এখানে রাখা হয়েছে? তাদের উপর কী ধরনের পরীক্ষা করা হয়? এই গবেষণাগারের উদ্দেশ্য কী? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমরা কথা বলি সিনিয়র রিসার্চার ড. সাবানা আরজুর সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকেই জানা যায় আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি—প্রিক্লিনিক্যাল টেস্টিং—সম্পর্কে।
প্রিক্লিনিক্যাল টেস্ট কী?
প্রিক্লিনিক্যাল টেস্ট (Preclinical Test) হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো নতুন ওষুধ, ভ্যাক্সিন, রাসায়নিক যৌগ বা চিকিৎসা প্রযুক্তি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করার আগে ল্যাবরেটরি এবং প্রাণীর উপর পরীক্ষা করা হয়। এই ধাপের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য চিকিৎসা উপাদানটি নিরাপদ কিনা, এটি শরীরে কীভাবে কাজ করে, বিষাক্ততা আছে কিনা এবং কোন মাত্রায় ব্যবহার তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে তা নির্ণয় করা। কারণ সরাসরি মানুষের উপর অপরীক্ষিত ওষুধ প্রয়োগ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনৈতিক। তাই মানবদেহে ব্যবহারের আগেই বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন স্তরে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করেন।

In vitro এবং In vivo গবেষণা
প্রিক্লিনিক্যাল গবেষণা সাধারণত দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত—In vitro এবং In vivo study।
“In vitro” বলতে বোঝায় জীবন্ত শরীরের বাইরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা। এটি সাধারণত test tube, petri dish, cell culture বা tissue sample ব্যবহার করে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো নতুন anticancer compound ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে পারে কিনা তা প্রথমে cancer cell line এর উপর পরীক্ষা করা হয়। একইভাবে কোনো antibiotic ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থামাতে পারে কিনা তা microbiological culture এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হয়। In vitro study তুলনামূলকভাবে দ্রুত, কম ব্যয়বহুল এবং নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় গবেষণার প্রাথমিক ধাপে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
তবে শুধুমাত্র কোষ বা টিস্যুর উপর পরীক্ষা করলেই যথেষ্ট নয়। কারণ একটি ওষুধ পুরো জীবন্ত শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে তা বোঝার জন্য প্রয়োজন In vivo study। “In vivo” অর্থ জীবন্ত প্রাণীর শরীরে পরীক্ষা। এই ধাপে সাধারণত mouse, rat, rabbit, guinea pig কিংবা বিশেষ ক্ষেত্রে monkey ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে গবেষকরা ওষুধের absorption, distribution, metabolism এবং excretion অর্থাৎ ADME বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি acute toxicity, chronic toxicity, carcinogenicity এবং reproductive toxicity এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও মূল্যায়ন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি ওষুধ লিভার বা কিডনির ক্ষতি করছে কিনা, দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কিনা বা গর্ভস্থ ভ্রূণের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে কিনা—এসব তথ্য In vivo গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়।
Animal House এবং 3Rs Principle
প্রিক্লিনিক্যাল গবেষণায় ব্যবহৃত Animal House বা গবেষণাগার প্রাণীকেন্দ্রগুলো অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত হয়। এখানে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো, খাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী বজায় রাখা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে “3Rs Principle”—Replacement, Reduction এবং Refinement—অনুসরণ করা হয় যাতে প্রাণীর ব্যবহার কমানো যায় এবং তাদের কষ্ট সর্বনিম্ন রাখা সম্ভব হয়। বর্তমানে organ-on-chip technology, computer simulation এবং advanced cell culture system এর মতো বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টাও চলছে যাতে ভবিষ্যতে প্রাণীর উপর নির্ভরতা আরও কমে আসে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ধাপসমূহ
যদি প্রিক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় কোনো ওষুধ বা ভ্যাক্সিন নিরাপদ ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়, তখন শুরু হয় Clinical Trial বা মানুষের উপর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রিত ধাপগুলোর একটি। এটি কয়েকটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয় এবং প্রতিটি ধাপের উদ্দেশ্য আলাদা।
কিছু ক্ষেত্রে গবেষণা শুরু হয় Phase 0 দিয়ে, যেখানে খুব অল্পসংখ্যক মানুষের উপর অতি ক্ষুদ্র ডোজ প্রয়োগ করে দেখা হয় ওষুধ শরীরে প্রবেশ করছে কিনা এবং কীভাবে আচরণ করছে। এরপর আসে Phase 1 trial, যেখানে সাধারণত ২০–১০০ জন সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকের উপর ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। এই ধাপের মূল লক্ষ্য নিরাপত্তা মূল্যায়ন, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া শনাক্ত করা এবং নিরাপদ ডোজ নির্ধারণ করা। অনেক ক্ষেত্রে এটিই মানুষের শরীরে প্রথম প্রয়োগ হওয়া ধাপ।

Phase 2 trial এ প্রায় ১০০–৩০০ জন রোগীর উপর পরীক্ষা চালানো হয়। এখানে দেখা হয় ওষুধটি সত্যিই রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর কিনা। একইসঙ্গে আরও নিরাপত্তা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। যদি এই ধাপ সফল হয়, তাহলে শুরু হয় বৃহৎ পরিসরের Phase 3 trial। এখানে হাজার হাজার মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে ওষুধের কার্যকারিতা বিদ্যমান চিকিৎসার সঙ্গে তুলনা করা হয় এবং বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুঁজে বের করা হয়। এই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সরকারি অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে পারে।
ওষুধ বাজারে আসার পরও গবেষণা শেষ হয় না। তখন শুরু হয় Phase 4 বা Post-marketing surveillance। বাস্তব জীবনে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ফলে নতুন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হয়। ইতিহাসে এমন উদাহরণও আছে যেখানে বাজারজাত হওয়ার পর কোনো ওষুধের গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ধরা পড়ায় সেটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদনের পরও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ চলতেই থাকে।
নৈতিকতা ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নৈতিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে গবেষণার সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি বিস্তারিতভাবে জানিয়ে লিখিত সম্মতি নেওয়া হয়, যাকে বলা হয় Informed Consent। এছাড়া একটি স্বাধীন Ethics Committee বা Institutional Review Board (IRB) পুরো গবেষণা নিরাপদ ও নৈতিক কিনা তা তদারকি করে। Randomization, placebo control এবং double blind study এর মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় যাতে ফলাফল নির্ভরযোগ্য হয় এবং ব্যক্তিগত পক্ষপাত কমে।
COVID-19 ভ্যাক্সিন উন্নয়নের বাস্তবতা
COVID-19 মহামারীর সময় বিশ্ববাসী খুব কাছ থেকে দেখেছে কীভাবে দ্রুতগতিতে ভ্যাক্সিন তৈরি করা হলেও সেটি প্রিক্লিনিক্যাল এবং ক্লিনিক্যাল গবেষণার সব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করেছে। mRNA vaccine technology নিয়ে বহু বছর আগে থেকেই গবেষণা চলছিল, ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে উন্নয়ন দ্রুত সম্ভব হয়েছে। তবুও প্রতিটি ভ্যাক্সিনকে নিরাপত্তা, কার্যকারিতা এবং ইমিউন প্রতিক্রিয়া মূল্যায়নের জন্য কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে।
নমুনা পর্যবেক্ষণ:
ইন্সটিটিউট অফ প্রিক্লিনিক্যাল এন্ড টক্সিসিটি
ডাও ইউনিভার্সিটি ওফ হেলথ সায়েন্স

তথ্যসূত্র:
গবেষণাপত্র,ফিল্ড ভিজিট ও ইন্টারনেটলেখক:
তাহসিন আহমেদ সুপ্তি
বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক
ডাও কলেজ অব বায়োটেকনোলজি
ডাও ইউনিভার্সিটি ওফ হেলথ সায়েন্স,করাচী।

Leave a comment