উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগসাধারণ বিজ্ঞান

রাতারাতি বিজ্ঞানী হওয়া যায় না”—ড. জুবায়ের শামীমের চোখে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির গুরুত্ব

Share
Share

আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই দ্রুত ফলাফল চাই। কয়েক মাসের কোর্সে ‘এক্সপার্ট’ হয়ে যাওয়া, অল্প সময়ে বড় অর্জন—এই ধরনের প্রত্যাশা তরুণদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়। কিন্তু বিজ্ঞান ও গবেষণার পথ এই ত্বরিত সাফল্যের ধারণার সঙ্গে খুব কমই খাপ খায়। বিজ্ঞানী ডট অর্গ-এর সাক্ষাৎকারে ড. জুবায়ের শামীম স্পষ্টভাবে বলেন—গবেষণার প্রস্তুতি রাতারাতি হয় না; এটি সময় নিয়ে, ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে।

গবেষণায় সফল হতে হলে প্রথমেই দরকার একটি দৃঢ় ভিত্তি। যে বিষয়ের ওপর গবেষণা করতে চান, সেই বিষয়ের মৌলিক ধারণা ভালোভাবে আয়ত্ত করা জরুরি। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, কেউ যদি তাপগতিবিদ্যা বা ফ্লুইড মেকানিক্সে গবেষণা করতে চান, তবে তাঁকে কেবল পাঠ্যবইয়ের সূত্র মুখস্থ করলে চলবে না। তাকে সেই সূত্রগুলোর পেছনের যুক্তি বুঝতে হবে, বাস্তব সমস্যায় কীভাবে এগুলো প্রয়োগ করা যায়—সেটিও শিখতে হবে। এই ধরনের গভীর বোঝাপড়া তৈরি হতে সময় লাগে, এবং এই সময়কে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো শর্টকাট নেই।

ড. জুবায়ের শামীমের নিজের যাত্রাও এই দীর্ঘ প্রস্তুতিরই উদাহরণ। বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করার পর তিনি শিল্পখাতে কাজ করেছেন, পরে মাস্টার্স ও পিএইচডির মধ্য দিয়ে গবেষণার গভীরে গিয়েছেন। প্রতিটি ধাপে তিনি নতুন নতুন দক্ষতা শিখেছেন—সিমুলেশন টুল ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখা, কনফারেন্সে কাজ উপস্থাপন। এই দক্ষতাগুলো একদিনে তৈরি হয়নি; বরং বছরের পর বছর ধরে চর্চার ফলেই তাঁর গবেষক হিসেবে পরিচিতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী যখন বিদেশে পিএইচডির কথা ভাবেন, তখন অনেক সময় তারা শেষ মুহূর্তে প্রস্তুতি শুরু করেন। হঠাৎ করে GRE বা IELTS-এর প্রস্তুতি, তাড়াহুড়া করে প্রফেসরদের ইমেইল—এই তড়িঘড়ি প্রচেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। ড. জুবায়ের শামীমের পরামর্শ হলো—যদি গবেষণার পথে যেতে চান, তবে অন্তত এক থেকে দুই বছর আগে থেকেই পরিকল্পনা শুরু করা উচিত। এই সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্কিল শেখা, প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করা, ছোটখাটো গবেষণা প্রজেক্টে যুক্ত হওয়া—এসব ধাপে ধাপে এগোতে হয়।

এই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির আরেকটি দিক হলো মানসিক প্রস্তুতি। গবেষণার পথে ব্যর্থতা আসবে—একটি এক্সপেরিমেন্ট কাজ করবে না, একটি পেপার রিজেক্ট হবে, কোনো প্রজেক্ট কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। এই ব্যর্থতাগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে সময় লাগে। ড. জুবায়ের শামীমের অভিজ্ঞতায়, যারা দীর্ঘ সময় ধরে একই লক্ষ্যের দিকে কাজ করে, তারাই এই ব্যর্থতাগুলোকে শেখার সুযোগ হিসেবে নিতে পারে।

তরুণদের জন্য এই বার্তাটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—গবেষণাকে যদি জীবনের পথ হিসেবে বেছে নিতে চান, তবে ধৈর্য ধরতে হবে। রাতারাতি বড় সাফল্যের আশা করলে হতাশা আসবেই। বরং ছোট ছোট অগ্রগতিকে মূল্য দিতে শিখতে হবে। আজ একটি নতুন টুল শিখলেন, কাল একটি পেপার ভালোভাবে বুঝলেন, পরশু একটি ছোট প্রজেক্ট শেষ করলেন—এই ছোট অর্জনগুলোর সমষ্টিই একসময় বড় প্রস্তুতিতে রূপ নেয়।

ড. জুবায়ের শামীমের কথায় স্পষ্ট—বিজ্ঞানী হওয়া মানে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করা নয়; এটি একটি দীর্ঘ শেখার প্রক্রিয়া। যে এই প্রক্রিয়াকে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে গ্রহণ করতে পারে, সে-ই শেষ পর্যন্ত গবেষণার পথে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

🔗 মূল সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles