গবেষণার প্রথম পদক্ষেপসাধারণ বিজ্ঞান

“গবেষণার পাশাপাশি গবেষক তৈরি করাই আমার বড় প্রেরণা” – ড. আতাউল করিম

Share
Share

বিজ্ঞানের অগ্রগতি সাধারণত নতুন আবিষ্কার, গবেষণাপত্র বা প্রযুক্তিগত সাফল্যের মাধ্যমে মাপা হয়। কিন্তু একজন অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে এই সাফল্যের চেয়েও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী একটি অর্জন আছে—নতুন প্রজন্মের গবেষক তৈরি করা। ডক্টর মোহাম্মদ আতাউল করিমের গবেষণা-জীবনের অন্যতম প্রধান প্রেরণা এই জায়গাতেই নিহিত। তাঁর ভাষায়, “গবেষণার পাশাপাশি গবেষক তৈরি করাই আমার বড় প্রেরণা।” এই উপলব্ধি তাঁর পুরো কর্মজীবনের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করেছে।

ডক্টর করিমের অভিজ্ঞতায়, একটি গবেষণা প্রকল্প শেষ হলে তার ফলাফল হয়তো কয়েকটি প্রকাশনা বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী বা তরুণ গবেষক যদি সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চিন্তাশীল, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল বিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে ওঠেন, তবে তার প্রভাব বহুগুণ দীর্ঘস্থায়ী হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, গবেষণার প্রকৃত সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই গবেষণা ভবিষ্যৎ গবেষকদের তৈরি করতে পারে। তাই তিনি নিজের গবেষণাগারে শিক্ষার্থীদের কেবল নির্দেশ দেননি; বরং প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করেছেন, ভুল করতে দিয়েছেন এবং সেই ভুল থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করেছেন।

তাঁর তত্ত্বাবধানে কাজ করা বহু শিক্ষার্থী আজ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ডক্টর করিম মনে করেন, একজন শিক্ষক বা গবেষক যখন শিক্ষার্থীদের কেবল সহকারী হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন তাদের সৃজনশীলতা বিকশিত হয় না। কিন্তু যখন শিক্ষার্থীদের গবেষণার অংশীদার হিসেবে দেখা হয়, তখন তারা নিজেরাই নতুন ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসে। এই অংশীদারত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলাই তাঁর শিক্ষাদর্শনের মূলভিত্তি।

গবেষক তৈরি করার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিবেশ সৃষ্টি করা। ডক্টর করিম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন গবেষণা কর্মসূচি ও বিভাগ গড়ে তোলার পেছনে কাজ করেছেন মূলত এই কারণেই। তাঁর মতে, একজন শিক্ষার্থী যত মেধাবীই হোক না কেন, যদি তাঁর চারপাশে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সহায়ক পরিবেশ ও মেন্টরশিপ না থাকে, তবে সেই মেধার পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হয় না। তাই গবেষণাগার, তহবিল সংগ্রহ, আন্তঃবিষয়ক সহযোগিতা—এসব কিছুই গবেষক তৈরির প্রক্রিয়ার অংশ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দর্শনের গুরুত্ব আরও গভীর। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগের অভাবে তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে না। ডক্টর করিমের মতে, গবেষণার পাশাপাশি গবেষক তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে দেশীয় গবেষণা পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের নতুন ধরন, যেখানে শ্রেণিকক্ষের বাইরে গবেষণাগারেও শেখার সুযোগ তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত “গবেষণার পাশাপাশি গবেষক তৈরি করাই আমার বড় প্রেরণা”—এই উক্তিটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিজ্ঞানচর্চার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ আসলে মানুষ। গবেষণাপত্র বা পেটেন্ট সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যেতে পারে, কিন্তু একজন গবেষকের মধ্যে গড়ে ওঠা অনুসন্ধিৎসু মন ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে বহু বছর ধরে আলোকিত করে।

ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles