চিকিৎসা বিদ্যাপদার্থবিদ্যা

“ক্যান্সার যখন স্টেজ-১ এ থাকে তখন টিউমার অনেক নরম থাকে”—ক্যান্সারের ভেতরের লুকানো পদার্থবিদ্যা

Share
Share

ক্যান্সার সম্পর্কে আমরা সাধারণত যেটুকু জানি, তা মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়—কোন ওষুধ কাজ করে, কোন থেরাপি দেওয়া হয়, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী। কিন্তু ক্যান্সারের ভেতরের জগৎ যে শুধু জৈবিক (biological) নয়, সেখানে পদার্থবিদ্যা ও যান্ত্রিক প্রকৃতিরও একটি গভীর ভূমিকা রয়েছে—সে কথা খুব কম মানুষই ভাবেন।

বাংলাদেশি গবেষক ড. বাশার ইমন তাঁর গবেষণায় এই অদেখা দিকটিকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, “ক্যান্সার যখন স্টেজ-১ এ থাকে তখন টিউমার অনেক নরম থাকে, কিন্তু স্টেজ-৪ এর দিকে যেতে যেতে টিউমার অনেক শক্ত হয়ে যায়।” কথাটা শুনতে সহজ হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্যান্সারের অগ্রগতির এক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

আমরা যেমন হাতে কোনো ফল চেপে ধরে বুঝতে পারি সেটি কাঁচা না পাকা, ঠিক তেমনি টিউমারের শক্ত বা নরম হওয়াও তার অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। প্রাথমিক অবস্থায় টিউমার নরম থাকে, মানে কোষগুলো তখনো তুলনামূলকভাবে ছড়ানো ও কম সংগঠিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিউমারের ভেতরের পরিবেশ বদলে যায়—কোষগুলো আরও শক্তভাবে জড়ো হয়, আশপাশের টিস্যুকে চেপে ধরে এবং পুরো টিউমারটি হয়ে ওঠে শক্ত বা “কঠিন”। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় টিস্যুর ‘স্টিফনেস’ বা stiffness।

এই পরিবর্তন কেন হয়—এই প্রশ্নটাই ড. বাশার ইমনের গবেষণার কেন্দ্রে। তিনি দেখিয়েছেন, ক্যান্সার কোষ একা একা এই শক্ত হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী নয়। বরং টিউমারের ভেতরে থাকা কিছু বিশেষ কোষ, যাদের নাম ফাইব্রোব্লাস্ট (Fibroblast), তারা বড় ভূমিকা রাখে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফাইব্রোব্লাস্ট আমাদের শরীরের ক্ষত সারাতে সাহায্য করে। যেমন, কেটে গেলে ক্ষত শুকিয়ে যায়—এই কাজে ফাইব্রোব্লাস্ট কোলাজেন জমা করে টিস্যুকে জোড়া লাগায়।

কিন্তু ক্যান্সারের ভেতরে গিয়ে এই কোষগুলো যেন “ভুল পথে” পরিচালিত হয়। ক্যান্সার কোষগুলো তাদের এমনভাবে প্রভাবিত করে যে ফাইব্রোব্লাস্ট অতিরিক্ত কোলাজেন জমা করতে থাকে। ফলাফল হিসেবে টিউমারের চারপাশে একটি শক্ত আবরণ তৈরি হয়। এই শক্ত পরিবেশ ক্যান্সার কোষকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলে এবং শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ছড়িয়ে পড়াকে বলা হয় মেটাস্ট্যাসিস (metastasis)।

ড. ইমনের গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই ‘শক্ত’ হওয়াকে পরিমাপ করার প্রযুক্তি। সাধারণত ল্যাবে কোষগুলোকে সমতল পাত্রে রেখে গবেষণা করা হয়। কিন্তু মানবদেহে কোষ থাকে ত্রিমাত্রিক পরিবেশে। এই বাস্তব পরিবেশের কাছাকাছি গিয়ে কোষের ভেতরের বল বা চাপ কীভাবে কাজ করে, তা মাপার জন্য তিনি বিশেষ ধরনের সেন্সর তৈরি করেছেন। খুব ছোট মাত্রার বল—ন্যানো-নিউটন পর্যায়ের চাপ—পরিমাপ করে বোঝা যায় কোষগুলো কীভাবে একে অপরকে ঠেলে বা টেনে প্রভাবিত করছে।

এই ধরনের গবেষণা হয়তো আজই কোনো ওষুধ এনে দিচ্ছে না, কিন্তু ভবিষ্যতের ক্যান্সার চিকিৎসার ভিত গড়ে দিচ্ছে। কারণ, ক্যান্সারকে শুধু ‘কোষের রোগ’ হিসেবে না দেখে যদি আমরা তাকে একটি ‘যান্ত্রিক সমস্যা’ হিসেবেও বুঝতে পারি, তাহলে নতুন ধরনের থেরাপির পথ খুলে যেতে পারে—যেখানে টিউমারের শক্ত হওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেই ক্যান্সারের বিস্তার থামানোর চেষ্টা করা যাবে।

একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে উঠে আসা গবেষকের হাতে ক্যান্সারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞানে কোনো একক পথ নেই। ভিন্ন শাখার জ্ঞান এক জায়গায় মিললেই বড় সমস্যার ভেতরের নতুন দরজা খুলে যায়।

🔗 পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ