Home / সাক্ষাৎকার / সাক্ষাৎকারঃ ড. মাহ্দী মিরাজ
সাক্ষাৎকারঃ ড. মাহ্দী মিরাজ

সাক্ষাৎকারঃ ড. মাহ্দী মিরাজ

বিজ্ঞানী.অর্গঃ বিজ্ঞানী.অর্গ এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। প্রথমেই আপনার সমন্ধে আমাদের একটু বলুন।

ড. মাহ্দী মিরাজঃ আমার কাছে, যেকোনো সাক্ষাতকারে, এই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা সবচেয়ে কঠিন মনে হয়। অনেক পূর্ব-প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও, সবসময় মনে হয় ঠিকমতো গুছিয়ে উপস্থাপন করা হলো না। তারপরও, আপনি যেহেতু সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন দিয়েই শুরু করেছেন, আরেকবার চেষ্টা করা যাকঃ

আমার জন্ম ভোলা জেলাতে। শৈশব ভোলাতে কাটলেও, ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুবাদে কৈশোরের একটা বড় অংশ কেটেছে বরিশালে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বোর্ডের মেধা তালিকায় ১২তম স্থান অর্জনের মাধ্যমে ক্যাডেট কলেজে পড়ালেখার সমাপ্তি। তারপর কিছুদিন বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে চলে যাই যুক্তরাজ্যে। সেখানকার একটি ছিমছাম ছোট্ট শহর রেকছামে (Wrexham) অবস্থিত গ্লিনডুর বিশ্ববিদ্যালয় (Wrexham Glyndŵr University) থেকেই ব্যাচেলর, মাস্টার্স এবং পরবর্তীতে পিএইছডি ডিগ্রি অর্জন করি।এ পর্যায়ে একটা কথা না বললেই নয়ঃ গ্লিনডুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম এবং পরপর দু’বার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হই। আমরাই, আমি এবং আমার বন্ধু আনোয়ারুল কারিম সুমন, গ্লিনডুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের প্রথম বিদেশী সম্পাদক। আমি এখনো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের CURI (Centre for Ultra-realistic Imaging) গবেষণা সেন্টারের সাথে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে যুক্ত আছি।
এছাড়া আমি সৌদি আরবের হায়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Ha’il) প্রভাষক এবং তার Cisco Network Academy-এর ডিরেক্টর হিসেবে সাত বৎসর, বাহরাইনের এএমএ আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে (AMA International University BAHRAIN) সহকারী অধ্যাপক হিসেবে দেড় বৎসর শিক্ষকতা করে বর্তমানে হংকং-এর চাইনীজ ইউনিভার্সিটি অফ হংকং (The Chinese University of Hong Kong)-এ পোস্ট-ডক্টোরাল ফেলো হিসেবে ব্লকচেইন (Blockchain) প্রযুক্তির উপরে গবেষণা করছি।
আমার আজকের “আমি” হয়ে উঠার পেছনে আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যের, বিশেষ করে আমার মা, (প্রয়াত) বাবা, স্ত্রী এবং বোনদের, অনেক ভূমিকা রয়েছে। সেইসাথে বারিশাল ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদেরও রয়েছে অনেক আবদান। তাছাড়া গ্লিনডুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Wrexham Glyndŵr University) প্রফেসর পিটার এক্সেল, প্রফেসর ভিক গ্রোউট, জন পলটন এবং হায়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকর্মী ডঃ মারুফ আলীর দিক নির্দেশনা পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে।
আমরা তিন ভাইবোন। বোনদের চেয়ে আমি ছোট হওয়ায় ওদের অনেক আদরের মাঝে “দুষ্ট” হয়ে বেড়ে উঠা! বিয়ে পরবর্তী জীবনে, স্ত্রী ছাড়াও মহান সৃষ্টিকর্তা আমাকে একটি কন্যা সন্তান, যার বয়স এখন সাড়ে তিন বৎসর, দান করে ধন্য করেছেন।

 

বিজ্ঞানী.অর্গঃ বর্তমানে আপনি কি নিয়ে গবেষনা করছেন?

ড. মাহ্দী মিরাজঃ আমি বর্তমানে হংকং-এর চাইনীজ ইউনিভার্সিটি অফ হংকং (The Chinese University of Hong Kong)- এর Centre for Financial Regulation and Economic Development (CFRED)- এ ফিনটেক (FinTech) এবং রেজটেকের (RegTech) উপর কাজ করছি।  এই প্রজেক্টের মূল কাজ হলো ব্লকচেইন (Blockchain) প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মার্ট কন্ট্রাক্টের (Smart Contract) উপর গবেষণা করা।

  

বিজ্ঞানী.অর্গঃ আইওটি নিয়ে আপনি অনেকদিন ধরে কাজ করছেন। এটি কিভাবে বাংলাদেশে প্রয়োগ করে আমরা উপকার পেতে পারি?

ড. মাহ্দী মিরাজঃ বাংলাদেশে আইওটি (IoT – Internet of Things) টেকনোলজি ব্যাবহারের অনেক সুযোগ রয়েছে। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেয়া যাক। নদীতে পানি দূষণ আমাদের একটা বড় সমস্যা। নদীর বিভিন্ন স্থানে এবং গভীরতায় দূষণ পরিমাপ করার জন্য আইওটি প্রযুক্তিতে তৈরি  aquatic বা fish robot ব্যাবহার করা যেতে পারে। আবার আমাদের স্মার্ট কার্ডে আইওটি প্রযুক্তি ব্যাবহার করে বিভিন্ন ধরণের সেবা দেয়া যেতে পারে যার মাঝে  ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া সহজিকরন অন্যতম। আবার স্বাস্থ্য খাতে, বিশেষ করে হাসপাতালে রুগীর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে আইওটি প্রযুক্তি ব্যাবহার করা যেতে পারে।- আসলে আইওটি প্রযুক্তির ব্যাবহার সীমাহীন, কিছু উদহারন দিয়ে এর ব্যাপ্তি বোঝানো খুব কঠিন কাজ।

বিজ্ঞানী.অর্গঃ আইওটি এর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বেশ চ্যালেঞ্জিং বলে সবাই বলছেন – এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

ড. মাহ্দী মিরাজঃ অবশ্যই আইওটি এর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বেশ চ্যালেঞ্জিং। অনেকগুলো কারনের মাঝে একটি প্রধান কারন হলো আইওটি ডিভাইসগুলোর প্রসেসিং পাওয়ার খুব কম হওয়া আর তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যও প্রয়োজনীয় এলগোরিদম চালাতে না পারা। তাই বিকল্প হিসেবে Statistical Fingerprint প্রযুক্তি ব্যাবহারের উপর আমি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের কিন্ডি (KINDI Centre for Computing Research) গবেষণা কেন্দ্রের সাথে একটি প্রোজেক্টে কাজ করছি।

বিজ্ঞানী.অর্গঃ আপনি প্রায় দুই বছরের মতন বাহরাইন এ কাজ করেছেন। কেমন লাগল সেখানে কাজ করতে? সেখানে আপনার অভিজ্ঞতা সমন্ধে আমাদের বলুন।

ড. মাহ্দী মিরাজঃ সৌদি থেকে বাহরাইনে চলে আসাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। যদিও অন্য সবার মত আমারও ধারনা ছিল দুটো পাশাপাশি আরব দেশ, তাই সব কিছু মোটামুটি একি ধরণের হবে। কিন্তু আমার সে ধারণা ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি। বাহরাইন আরব দেশ হলেও, দুবাইয়ের মতো বহুমাত্রিক সংস্কৃতিতে গড়ে উঠা একটা দেশ। বাহরাইনের বাতাসে জলীয়বাস্পের উপস্থিতি খুব বেশি হওয়াতে, গ্রীষ্মকালটা খুব কঠিন।
বাহরাইনে আমি IEEE র সাথে সক্রিয় ভাবে যুক্ত হই এবং পরবর্তীতে SIGHT Group এর সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হই। বাহরাইনে আমি বাংলাদেশ স্কুলে বোর্ডের মাধ্যমিক পরীক্ষায় ইনফর্মেশন টেকনোলজি (ব্যাবহারিক) বিষয়ের বহিরাগত পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। দেশের বাইরে থেকে দেশের জন্য কাজ করতে পারাটা বেশ উপভোগ্য ছিল।একটা কথা না বললেই নয় আর তা হলোঃ বাহরাইনে কাজ করার সময় বাংলাদেশ এম্বেসি থেকে শুরু করে সকল বাংলাদেশীদের অনেক আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি।

 বিজ্ঞানী.অর্গঃ ৫ম শ্রেণীর নেটওয়ার্ক নিয়ে আপনি ইংল্যান্ডে বেশ কাজ করেছেন। এটি ভবিষ্যতে কিভাবে আমাদের আরো সাহায্য করতে পারে? (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য কোন প্রয়োগ?)

ড. মাহ্দী মিরাজঃ আসলে ৫ম প্রজন্মের নেটওয়ার্কের সার্বজনীনভাবে ব্যাবহার এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি এর মাধ্যমে 4K/5K Television এর সরাসরি সম্প্রচার এবং Holographic Image ট্রান্সফারের সেবার গুণগত মানের (Quality of Service, QoS) উপর কাজ করছি।
বর্তমানের অন্যান্য নেটওয়ার্কের তুলনায় ৫ম প্রজন্মের নেটওয়ার্কের সক্ষমতা অনেক বেশী হবেঃ ডাউন লিঙ্ক ডাটারেট 20/Gbits এবং আপ লিঙ্ক ডাটারেট 10G/bits বা তারচেয়েও বেশী। বৈদ্যুতিক শক্তির প্রয়জিনিয়তা প্রায় ৯০ শতাংশ কবে যাবে এবং এর ফলে আইওটি ডিভাইসের ব্যাটারিগুলো ১০ বৎসরের উপর সেবা প্রদান করতে পারবে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে VR( virtual reality) এবং AR( Augmented reality) প্রযুক্তির ব্যাবহার সম্ভব হবে.
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর নানাবিধ ব্যাবহার হতে পারে। যেমন ধরুন, VR( virtual reality) এবং AR( Augmented reality)ব্যাবহার করে আমাদের দেশীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হতে পারে।

বিজ্ঞানী.অর্গঃ ভবিষ্যতে কি নিয়ে কাজ করতে চান?

ড. মাহ্দী মিরাজঃ ভবিষ্যতে “বাংলাদেশ” নিয়ে কাজ করতে চাই। উপোযুক্ত সুযোগ পেলে, ২-৩ বৎসরের মাঝে বাংলাদেশে ফেরত আসার পরিকল্পনা আছে।
CURI (Centre for Ultra-realistic Imaging, Glyndwr University)-এর অধীনে একটা গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরী প্রায় শেষ পর্যায়ে। সেটা হলো Holographic Image এর মাধ্যমে আমাদের রাজেন্দ্রপুর জাদুঘরের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহগুলো সংরক্ষণ এবং সেই সাথে সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা।

বিজ্ঞানী.অর্গঃ প্রবাসে বসেও বাংলাদেশের তরুনদের নিয়ে আপনি বেশ কিছু কাজ করছেন। প্রজেক্টগুলি সমন্ধে একটু বলুন।

ড. মাহ্দী মিরাজঃ অবশ্যই (ভবিষ্যতের) রাজেন্দ্রপুর প্রোজেক্ট তার মাঝে অন্যতম। তাছাড়া ব্লকচেইনের মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থা, Android ব্যাবহার করে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, উন্নয়ন এবং সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, শপিংমল অ্যাপ্লিকেশান, মোবাইল লারনিং (mLearning)-এর অ্যাপ্লিকেশান “মোবাইল একাডেমী” ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 
গবেষণায় আগ্রহি বাংলাদেশী তরুণদের সাথে কাজ করার জন্য বা গবেষণা সংক্রান্ত নির্দেশনা অথবা আমার সাধ্যের মধ্যে যেকোনো ধরণের সহায়তা প্রদানের জন্য আমি সবসময় প্রস্তুত।

বিজ্ঞানী.অর্গঃ তরুন শিক্ষার্থি যারা বিজ্ঞানে কাজ করতে চায় তাদের জন্য আপনার কোন উপদেশ বা বক্তব্য কি?

ড. মাহ্দী মিরাজঃ  

  • সকল বাঁধা উপেক্ষা করে নিষ্ঠা এবং সততার সাথে কাজ করে যাওয়া।
  • কোন অর্জনেই যেন নিজের ভেতর অহংবোধ চলে না আসে সে ব্যাপারে সবসময় খেয়াল রাখা। সবসময় মনে রাখতে হবে আমাদের যা অর্জন সেটা সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ মাত্র, তাই সেটা নিয়ে অহংকার করার কিছু নাই। বরং তার অনুগ্রহের জন্য আরও বেশী বিনয়ী হওয়া খুব জরুরী।
  • আন্ডারগ্রাজুয়েট বা মাস্টার ডিগ্রী করার সময়েই গবেষণা পত্র লেখার চেষ্টা করা, এতে করে একাডেমীক লেখালেখির হাতেখড়ির পাশাপাশি স্কলারশীপ প্রাপ্তি সহজ হবে। 
  • নিজ নিজ বিষয়ের প্রফেসনালস বা প্রফেসরদের সাথে যোগাযোগ (Networking) তৈরী করা।
  • নিজের চিন্তার স্বাধীনতার (Fredoom of Thought) উপলব্ধি ও প্রয়গের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গণ্ডির বাহিরে (Out of the Box) চিন্তা করা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে আরো নতুন নতুন সংবাদ জানতে সাবস্ক্রাইব করুন।

About নিউজডেস্ক

Check Also

সাক্ষাৎকার: ড. মাহফুজুল ইসলাম

ড. মাহফুজুল ইসলাম ২০০১ সনে সিলেট ক্যাডেট কলেজে এইচএসসি পাশ করে বুয়েটে কম্পিউটার সাইন্স বিভাগে …

ফেসবুক কমেন্ট


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।