শিক্ষাজীবনের শুরুর দিক থেকেই অনেক শিক্ষার্থী একটি মানসিক চাপের ভেতর বড় হয়—ভুল প্রশ্ন করলে লজ্জা পেতে হবে, শিক্ষক কী ভাববেন, সহপাঠীরা হাসবে কি না। এই ভয় ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার স্বাভাবিক প্রবণতাকে দমিয়ে দেয়। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের মতে, এই মানসিক বাধাই শেখার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক। তাঁর কথায়, “ভুল প্রশ্ন বলে কিছু নেই—প্রশ্ন না করলে শেখাই শুরু হয় না।” এই বক্তব্য শেখার সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্ন করা শুধু অনুমোদিত নয়, বরং উৎসাহিত হওয়া উচিত। বিজ্ঞান বিশেষভাবে প্রশ্ননির্ভর একটি শাস্ত্র। কোনো ধারণা বা তত্ত্ব যাচাই করতে হলে প্রথমে প্রশ্ন তুলতেই হয়। কিন্তু আমাদের শ্রেণিকক্ষে প্রায়ই দেখা যায়, শিক্ষক কথা বলেন আর শিক্ষার্থীরা নীরবে শোনে। এই একমুখী যোগাযোগে কৌতূহলের জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। ড. আশরাফউদ্দিনের অভিজ্ঞতায়, গবেষণাগারে সবচেয়ে কার্যকর শেখা হয় প্রশ্নের মাধ্যমেই—সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা, নিজের সন্দেহ প্রকাশ, এবং বারবার “কেন” জিজ্ঞেস করা।
প্রশ্ন করার ভয় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়; অনেক সময় তরুণ গবেষকরাও সিনিয়রদের সামনে প্রশ্ন তুলতে সংকোচ বোধ করেন। ফলে নতুন ধারণা প্রকাশ পায় না। অথচ বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ হওয়া উচিত এমন—যেখানে ভিন্নমত বা অপরিণত ধারণাও আলোচনার জায়গা পায়। ড. আশরাফউদ্দিন মনে করেন, গবেষণাগারে ভুল ধারণা প্রকাশ পেলেও সেটি সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে। প্রশ্ন না করলে ভুলটি ধরা পড়ার সুযোগই থাকে না।
এই বক্তব্যের আরেকটি দিক হলো—ভুল প্রশ্ন আসলে ভুল নয়; বরং সেটি শেখার একটি ধাপ। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রশ্ন করে, তখন সে নিজের অজানা জায়গাটি চিহ্নিত করছে। শিক্ষক বা গবেষকের দায়িত্ব হলো সেই প্রশ্নকে অবহেলা না করে ব্যাখ্যা দেওয়া, প্রয়োজনে প্রশ্নটিকে আরও পরিশীলিত করতে সাহায্য করা। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর চিন্তার পরিধি বিস্তৃত হয়।
ড. আশরাফউদ্দিনের গবেষণাজীবনেও প্রশ্ন করার সাহস নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এনজাইমের কার্যপ্রণালী নিয়ে কাজ করার সময় তিনি এমন সব প্রশ্ন তুলেছেন, যেগুলো আগে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। সেসব প্রশ্ন থেকেই নতুন পরীক্ষা, নতুন ফলাফল এসেছে। অর্থাৎ প্রশ্নই গবেষণার ইঞ্জিন।
সবশেষে, এই বক্তব্য তরুণদের একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী শিক্ষা দেয়—নিজের কৌতূহলকে দমিয়ে রাখবেন না। প্রশ্ন করুন, ভুল হলেও করুন। কারণ প্রশ্ন ছাড়া শেখা শুরুই হয় না। ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শিক্ষা ও গবেষণা সংস্কৃতিতে একটি মানবিক ও উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়।
ড. আশরাফউদ্দিন আহমেদের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment