একজন বিজ্ঞানীর পরিচয় সাধারণত তাঁর গবেষণাপত্র, প্রকাশনা বা পদবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু অনেক সময় একটি ছোট আগ্রহই ভবিষ্যতের বড় উদ্ভাবনের বীজ বপন করে। ড. আবুল হুস্সামের ক্ষেত্রে সেই বীজটি ছিল যন্ত্রপাতি বানানোর নেশা। তাঁর নিজের কথায়, “আমার আগ্রহ যন্ত্রপাতি তৈরিতে।” এই এক বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাঁর গবেষণাজীবনের দর্শন—বিজ্ঞান মানে কেবল তত্ত্ব নয়, বরং সমস্যার সমাধানযোগ্য যন্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা।
শৈশব থেকেই ড. হুস্সামের মধ্যে যন্ত্রের প্রতি কৌতূহল ছিল। বাবার ল্যাবরেটরিতে কাচের ফ্লাস্ক, পাইপেট, রঙিন দ্রবণ আর নানা পরীক্ষার যন্ত্র দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত—এসব কীভাবে কাজ করে? কেমন করে এগুলো দিয়ে অদৃশ্য কোনো উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়ে? এই প্রশ্ন থেকেই তিনি নিজেই ছোটখাটো যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করতেন। কিশোর বয়সে বানানো সেই সাধারণ পরীক্ষাগারই একসময় তাঁকে অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রির মতো যন্ত্রনির্ভর একটি শাখায় নিয়ে যায়।
অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রিতে যন্ত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পানিতে আর্সেনিক আছে কি না, বাতাসে দূষকের পরিমাণ কত—এসব প্রশ্নের উত্তর আসে সূক্ষ্ম পরিমাপের মাধ্যমে। ড. হুস্সাম শুধু এই যন্ত্রগুলো ব্যবহার করেই থেমে থাকেননি; প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেই নতুন যন্ত্র তৈরি করেছেন বা বিদ্যমান যন্ত্রকে উন্নত করেছেন। তাঁর গবেষণাগারে তৈরি অনেক যন্ত্রই পরে মাঠপর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই যন্ত্র বানানোর আগ্রহই তাঁকে সোনো ফিল্টারের মতো একটি সামাজিক উদ্ভাবনের দিকে নিয়ে যায়। আর্সেনিক দূষণের সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, কেবল পরীক্ষাগারের উন্নত যন্ত্র দিয়ে সমস্যা শনাক্ত করলেই চলবে না; গ্রামের মানুষের হাতে এমন একটি সহজ যন্ত্র দিতে হবে, যা তারা নিজেরাই ব্যবহার করতে পারবে। ফলে তিনি প্রযুক্তিকে জটিলতার জগৎ থেকে নামিয়ে আনেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিসরে। সোনো ফিল্টার তাই শুধু একটি গবেষণার ফল নয়, এটি একটি ব্যবহারিক যন্ত্র—যার মাধ্যমে গ্রামের মানুষ নিজেরাই নিরাপদ পানি পেতে পারে।
এই উদাহরণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উদ্ভাবন মানেই শুধু উচ্চপ্রযুক্তির ল্যাবরেটরিতে বসে কাজ করা নয়। প্রকৃত উদ্ভাবন ঘটে তখনই, যখন কোনো প্রযুক্তি মানুষের বাস্তব জীবনে কাজে লাগে। ড. হুস্সামের যন্ত্রনির্ভর গবেষণা দেখিয়ে দেয়, কৌতূহল আর হাতে-কলমে তৈরি করার অভ্যাস একজন বিজ্ঞানীকে কীভাবে সমাজের সমস্যার সমাধানকারী করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক সময় যন্ত্রপাতির অভাব বা প্র্যাকটিসের সুযোগ কম থাকায় শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানকে কেবল তত্ত্বের বিষয় হিসেবে দেখে। ড. হুস্সামের জীবনের গল্প তরুণদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে—যন্ত্র বানানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে তত্ত্ব ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা সম্ভব। আজকের একজন কৌতূহলী ছাত্রই আগামী দিনের এমন উদ্ভাবক হতে পারে, যার যন্ত্র মানুষের জীবন সহজ করে তুলবে।
এই কারণে, “আমার আগ্রহ যন্ত্রপাতি তৈরিতে”—এই কথাটি কেবল একটি ব্যক্তিগত পছন্দের কথা নয়; এটি এক ধরনের বৈজ্ঞানিক দর্শন। এই দর্শন আমাদের শেখায়, বিজ্ঞান মানে শুধু বোঝা নয়, বরং তৈরি করা—এবং সেই তৈরি করা জিনিসের মাধ্যমে সমাজের উপকার করা।
ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment