হাইড্রোজেন দিয়ে রান্না: সম্ভাবনা আছে, তবে নিরাপত্তাই প্রথম শর্ত
“হাইড্রোজেন একটি এক্সপ্লোসিভ গ্যাস; তাই উৎপাদন, প্রবাহ ও ব্যবহার—সবকিছু সেফটির বিষয় মাথায় রেখে ডিজাইন করতে হবে।”
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই সতর্ক কথাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভবিষ্যতের জ্বালানি শুধু আবিষ্কার করলেই হবে না; সেটিকে নিরাপদ, ব্যবহারযোগ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের উপযোগী করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হাইড্রোজেনের মতো শক্তিশালী জ্বালানির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের পাশাপাশি নিরাপত্তা-চিন্তাও অত্যন্ত জরুরি।
সাক্ষাৎকারের প্রশ্নোত্তর পর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক দিলীপ কুমার সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন। তাঁর ভাবনা ছিল—গ্রামাঞ্চলে সৌরশক্তি ব্যবহার করে পানি থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করে সেটি কি এলপিজির বিকল্প রান্নার গ্যাস হিসেবে ব্যবহার করা যায়? বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রশ্নটি খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ গ্রামীণ এলাকায় রান্নার জ্বালানি, এলপিজির খরচ, নিরাপদ জ্বালানি ব্যবস্থার অভাব এবং নবায়নযোগ্য শক্তির সম্ভাবনা—সবকিছু মিলিয়ে এটি ভবিষ্যতের একটি আকর্ষণীয় গবেষণা ক্ষেত্র হতে পারে।
হাইড্রোজেনের মূল আকর্ষণ হলো এটি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। পানি থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করা যায়, আবার সেই হাইড্রোজেন ব্যবহার করলে প্রধান উপজাত হিসেবে পানি তৈরি হয়। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন, গাড়ি চালানো বা শিল্পক্ষেত্রে হাইড্রোজেন ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু রান্নার কাজে সরাসরি হাইড্রোজেন ব্যবহার করতে গেলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
কারণ হাইড্রোজেন খুবই দাহ্য গ্যাস। বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশলে এটি দ্রুত জ্বলে উঠতে পারে। তাই সাধারণ এলপিজি চুলার মতো সরাসরি ব্যবহার করার কথা ভাবলেই হবে না। এখানে দরকার বিশেষভাবে নকশা করা বার্নার, সঠিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, গ্যাস প্রবাহের নিরাপদ ব্যবস্থা, লিকেজ শনাক্ত করার প্রযুক্তি এবং জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা।
সহজভাবে বললে, হাইড্রোজেন দিয়ে রান্না করা মানে শুধু গ্যাস বদলে দেওয়া নয়; পুরো রান্নার প্রযুক্তি নতুনভাবে ভাবা। যেমন একটি গাড়ি পেট্রোল থেকে বিদ্যুতে রূপান্তর করতে গেলে শুধু জ্বালানি বদলালেই হয় না—ইঞ্জিন, ব্যাটারি, চার্জিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা—সবকিছু নতুনভাবে তৈরি করতে হয়। তেমনি হাইড্রোজেন চুলার ক্ষেত্রেও সম্পূর্ণ নিরাপদ নকশা প্রয়োজন।
ড. রানা বলেন, সৌরশক্তি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন করে রান্নার কাজে ব্যবহারের ধারণা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তবে তা এখনো ব্যাপক বাণিজ্যিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর একটি কারণ হলো নিরাপত্তা, আরেকটি কারণ হলো খরচ ও বাস্তব প্রয়োগের জটিলতা। ছোট স্কেলে গ্রামীণ ব্যবহারের জন্য প্রযুক্তি তৈরি করতে হলে সেটি শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর হলেই চলবে না; সেটি হতে হবে সাশ্রয়ী, সহজে ব্যবহারযোগ্য এবং নিরাপদ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই গবেষণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আমাদের দেশে সূর্যালোক আছে, পানি আছে, গ্রামীণ জ্বালানি চাহিদা আছে, আবার এলপিজি আমদানির ওপর নির্ভরতাও আছে। যদি ভবিষ্যতে সৌরশক্তি ব্যবহার করে ছোট আকারে নিরাপদ হাইড্রোজেন উৎপাদন ও ব্যবহার সম্ভব হয়, তাহলে গ্রামীণ শক্তি ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তার আগে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, বাস্তব পরীক্ষা, প্রকৌশল নকশা এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ।
এই আলোচনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—প্রতিটি নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে সুযোগ যেমন থাকে, ঝুঁকিও থাকে। বিজ্ঞানীর কাজ শুধু সম্ভাবনার কথা বলা নয়; সেই সম্ভাবনাকে নিরাপদভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করা। হাইড্রোজেন এনার্জি ভবিষ্যতের বড় জ্বালানি হতে পারে, কিন্তু তার প্রতিটি প্রয়োগে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার হাইড্রোজেন এনার্জি গবেষণা, রিজেনারেটিভ ফুয়েল সেল প্রযুক্তি, সাশ্রয়ী ক্যাটালিস্ট উন্নয়ন এবং তরুণ গবেষকদের জন্য তাঁর পরামর্শ জানতে পড়ুন বিজ্ঞানী অর্গে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার।

Leave a comment