বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর বহু গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সংখ্যাও কম নয়। তবু সাধারণ মানুষের জীবনে এসব গবেষণার প্রভাব সীমিত বলেই মনে হয়। প্রশ্ন উঠে আসে—আমাদের গবেষণার অগ্রাধিকার আসলে কী হওয়া উচিত? ড. আবুল হুস্সামের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর দেয়। তাঁর মতে, “আমাদের গবেষণার অগ্রাধিকার মানুষের বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত।” এই উক্তিটি বাংলাদেশের গবেষণা সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার তালিকা দীর্ঘ—পানীয় জলের নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ, জনস্বাস্থ্য, কৃষির উৎপাদনশীলতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। এগুলো সবই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। কিন্তু গবেষণার বিষয় নির্ধারণের সময় অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড, তাত্ত্বিক আগ্রহ বা প্রকাশনার সুযোগ বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে গবেষণা হয়, কিন্তু তা অনেক সময় দেশের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারে না।
ড. হুস্সামের কাজ দেখিয়ে দেয়, স্থানীয় সমস্যাকে গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখলে তার সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি হয়। আর্সেনিক দূষণ নিয়ে তাঁর গবেষণা ও সোনো ফিল্টার উদ্ভাবন কোনো বিমূর্ত তত্ত্ব নয়; এটি গ্রামবাংলার মানুষের পানির কলসে সরাসরি পরিবর্তন এনেছে। এই উদাহরণ প্রমাণ করে, গবেষণার অগ্রাধিকার যদি মানুষের মৌলিক চাহিদাকে কেন্দ্র করে নির্ধারণ করা হয়, তবে বিজ্ঞান মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গবেষণার বহুমাত্রিকতা। পানীয় জলের নিরাপত্তা শুধু রসায়নের বিষয় নয়; এর সঙ্গে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞান, নীতিনির্ধারণ ও সামাজিক আচরণও জড়িত। বাংলাদেশের গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণের সময় এই আন্তঃবিভাগীয় দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। একটি সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন শাখার গবেষক একসঙ্গে কাজ করলে সমাধান আরও কার্যকর ও টেকসই হতে পারে।
গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণে নীতিনির্ধারকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তা যদি বাস্তব সমস্যাকেন্দ্রিক গবেষণার দিকে প্রবাহিত হয়, তবে গবেষকরা স্বাভাবিকভাবেই সেই দিকেই আগ্রহী হবেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োগমূলক গবেষণাকে মূল্যায়নের মানদণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শুধু প্রকাশনার সংখ্যা নয়, গবেষণার সামাজিক প্রভাবও সাফল্যের সূচক হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
তরুণ গবেষকদের জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। গবেষণার বিষয় বাছাইয়ের সময় নিজেদের জিজ্ঞেস করা দরকার—এই কাজটি শেষ পর্যন্ত কার উপকারে আসবে? যদি গবেষণার ফলাফল সমাজের কোনো সমস্যার সমাধানে অবদান রাখতে পারে, তবে সেটিই হতে পারে সবচেয়ে অর্থবহ গবেষণা। ড. হুস্সামের জীবন দেখায়, গবেষণার অগ্রাধিকার সঠিকভাবে নির্ধারণ করা গেলে বিজ্ঞান কেবল জ্ঞানের পরিধি বাড়ায় না, মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনও আনে।
ড. আবুল হুস্সাম এর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment