একাডেমিক গবেষণার জগতে অর্থায়ন একটি বাস্তব ও অনিবার্য বিষয়। বড় গবেষণা প্রকল্প, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল—সবকিছুর পেছনেই অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের অভিজ্ঞতায় গবেষণা কেবল ফান্ডিং পাওয়া প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে নতুন ধারণার জন্ম বাধাগ্রস্ত হয়। তাই তিনি গুরুত্ব দেন ফান্ডেড কাজ ও আনফান্ডেড কাজের মধ্যে ভারসাম্যের ওপর। তাঁর মতে, এই ভারসাম্য বজায় থাকলেই গবেষণা পরিবেশে সৃজনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্ভাবন টিকে থাকে।
ফান্ডেড কাজ বলতে বোঝায় সেই সব গবেষণা প্রকল্প, যেগুলো সরকারি সংস্থা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক দাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়। এসব প্রকল্প সাধারণত নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়। এর সুবিধা হলো গবেষকরা পর্যাপ্ত সম্পদ ও অবকাঠামো পান, গবেষণার ফলাফল দ্রুত বাস্তব প্রয়োগের দিকে এগোয়। তবে এই ধরনের প্রকল্পে গবেষণার বিষয় অনেক সময় অর্থায়নকারী সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ফলে মৌলিক বা অনুসন্ধানী গবেষণার সুযোগ কিছুটা সীমিত হতে পারে।
অন্যদিকে আনফান্ডেড কাজ হলো গবেষকদের নিজস্ব আগ্রহ ও কৌতূহল থেকে জন্ম নেওয়া প্রাথমিক অনুসন্ধান। এসব কাজের জন্য সরাসরি তহবিল না থাকলেও এখান থেকেই অনেক সময় নতুন ধারণা, নতুন পদ্ধতি বা ভবিষ্যতের বড় প্রকল্পের বীজ রোপিত হয়। ড. করিমের অভিজ্ঞতায়, বড় কোনো ফান্ডেড প্রজেক্ট শুরু হওয়ার আগে প্রায়ই কয়েক বছরের আনফান্ডেড অনুসন্ধানী কাজ থাকে, যা পরে শক্তিশালী প্রস্তাবনা হিসেবে রূপ নেয়। এই পর্যায়ের কাজ গবেষকদের স্বাধীন চিন্তার সুযোগ দেয় এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করে।
ড. করিমের নেতৃত্বাধীন গবেষণা পরিবেশে এই দুই ধরনের কাজের সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হতো। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু ফান্ডেড প্রকল্পে ব্যস্ত থাকলে গবেষকরা ধীরে ধীরে ‘প্রজেক্ট ডেলিভারি মেশিন’-এ পরিণত হয়। আবার কেবল আনফান্ডেড, তাত্ত্বিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অবকাঠামো ও মানবসম্পদ গড়ে ওঠে না। তাই তিনি দলকে উৎসাহিত করতেন—চলমান ফান্ডেড প্রকল্পের পাশাপাশি কিছু সময় নতুন, ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু সম্ভাবনাময় ধারণায় বিনিয়োগ করতে।
বাংলাদেশের গবেষণা প্রেক্ষাপটে এই ভারসাম্যের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত তহবিলের কারণে অনেক সময় গবেষকরা কেবল অর্থায়ন পাওয়া প্রকল্পের পেছনেই ছুটতে বাধ্য হন। এতে করে নতুন ও মৌলিক ধারণা বিকাশের সুযোগ কমে যায়। ড. করিমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, নীতিনির্ধারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ছোট আকারের অনুসন্ধানী গবেষণাকে উৎসাহ দেয়, তবে ভবিষ্যতে সেখান থেকেই বড় প্রকল্পের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ফান্ডেড কাজ আর আনফান্ডেড কাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা মানে গবেষণাকে একদিকে বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত রাখা, অন্যদিকে নতুন চিন্তার পথ উন্মুক্ত রাখা। এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই একটি গবেষণা পরিবেশকে দীর্ঘমেয়াদে প্রাণবন্ত ও উদ্ভাবনী করে তোলে।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment