সম্পাদকীয়

বায়োডিগ্রেডেবল মানেই কি পরিবেশবান্ধব?

Share
Share

মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে “Biodegradable”, “Compostable”, “Bio-based” কিংবা “Eco-friendly” লেখা পণ্যের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। একটি কাপ, ব্যাগ বা খাবারের প্যাকেটে এমন কোনো শব্দ দেখলে আমাদের অনেকেরই মনে হয়, এটি নিশ্চয়ই প্রচলিত প্লাস্টিকের তুলনায় পরিবেশের জন্য নিরাপদ। এমনকি অনেক সময় মনে হয়, ব্যবহার শেষে এটি মাটিতে বা প্রকৃতিতে ফেলে দিলেও তেমন সমস্যা নেই—কারণ একসময় এটি “নিজে থেকেই” ভেঙে যাবে। কিন্তু এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি। Biodegradability আর sustainability এক বিষয় নয়। Biodegradability মূলত একটি উপাদানের এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যার মাধ্যমে অণুজীবের কার্যকলাপে সেটি নির্দিষ্ট পরিবেশে তুলনামূলক সরল যৌগে ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু sustainability অনেক বিস্তৃত ধারণা। একটি পণ্য তৈরির কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে, সেই কাঁচামাল উৎপাদনে কত জমি, পানি, সার বা জ্বালানি ব্যবহার হয়েছে, কারখানায় কত শক্তি লেগেছে, পরিবহনে কত নিঃসরণ হয়েছে, পণ্যটি কতবার ব্যবহার করা যায় এবং ব্যবহারের পর কোথায় ও কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হবে, সবকিছু মিলিয়েই তার প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব নির্ধারিত হয়। ফলে একটি disposable পণ্যের গায়ে biodegradable লেখা থাকলেই সেটি reusable বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো পণ্যের চেয়ে বেশি sustainable, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে bio-based হওয়া এবং biodegradable হওয়াও এক নয়। কোনো প্লাস্টিক উদ্ভিদজাত কাঁচামাল থেকে তৈরি হলেও তা সহজে biodegrade নাও করতে পারে, আবার কোনো উপাদান জীবাশ্ম উৎস থেকে তৈরি হলেও বিশেষ পরিবেশে biodegradable হতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধবতার আলোচনায় শুধু উপাদানের নাম, উৎস বা একটি আকর্ষণীয় সবুজ লেবেল নয়, পুরো জীবনচক্র দেখতে হবে। 

Biodegradable পণ্য নিয়ে দ্বিতীয় বড় ভুল ধারণাটি হলো, যদি এটি biodegradable হয়, তবে যেকোনো জায়গায় সহজেই ভেঙে যাবে। বাস্তবে biodegradation কোনো জাদুকরী প্রক্রিয়া নয়; এটি তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, অক্সিজেন, অণুজীবের উপস্থিতি, উপাদানের গঠন এবং সেখানে কতদিন থাকার সুযোগ পাচ্ছে, এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। একটি industrially compostable প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রিত কম্পোস্টিং স্থাপনায় উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় ভালোভাবে ভেঙে যেতে পারে, কিন্তু একই বস্তু বাড়ির উঠোনে, নদীর পানিতে, সমুদ্রে কিংবা সাধারণ landfill-এ একই সময়ের মধ্যে একইভাবে ভাঙবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এখানেই উপাদানের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোর গুরুত্ব আসে। একটি শহরে যদি compostable packaging ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু আলাদাভাবে তা সংগ্রহের ব্যবস্থা না থাকে কিংবা শিল্প-কম্পোস্টিং স্থাপনা না থাকে, তাহলে সেই পণ্যের compostable হওয়ার সুবিধাই বাস্তবে কাজে লাগবে না। সেটি হয়তো সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে landfill-এ চলে যাবে অথবা প্রচলিত recyclable plastic-এর সঙ্গে মিশে recycling stream-কে জটিল করে তুলবে। অর্থাৎ আমরা একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি ব্যবস্থাগত সমস্যা তৈরি করতে পারি। শুধু এমন উপাদান উদ্ভাবন করলেই হবে না, যা পরীক্ষাগারে বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে biodegrade করতে পারে; সেই উপাদানের জন্য বাস্তব জগতে সংগ্রহ, বাছাই, পরিবহন এবং সঠিক treatment-এর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। পরিবেশগত সমাধান তখনই কার্যকর, যখন material design এবং waste-management system একসঙ্গে কাজ করে। ভোক্তার ভূমিকার কথাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যের গায়ে যদি স্পষ্টভাবে না লেখা থাকে এটি home compostable, industrially compostable নাকি অন্য কোনো শর্তে biodegradable, তাহলে মানুষ সহজেই ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। “Biodegradable” শব্দটি তখন বৈজ্ঞানিক তথ্যের চেয়ে একটি marketing claim হিসেবেই বেশি কাজ করতে শুরু করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, biodegradable পণ্যের জনপ্রিয়তা আমাদের single-use culture-কে সত্যিই কমাচ্ছে, নাকি শুধু তার চেহারা বদলাচ্ছে? প্লাস্টিক দূষণের সমস্যার একটি বড় অংশই হলো আমাদের “নাও, ব্যবহার করো, ফেলে দাও” ধরনের অর্থনৈতিক ও ভোগব্যবস্থা। এখন যদি প্রচলিত single-use plastic-এর জায়গায় একই পরিমাণ single-use biodegradable plastic ব্যবহার করা হয়, তাহলে উপাদান বদলালেও অতিরিক্ত ভোগের মূল কাঠামোটি থেকে যায়। একটি কফির কাপ ব্যবহারের পর biodegrade করতে পারে, এটি নিঃসন্দেহে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটি সুবিধা। কিন্তু সেই কাপটি যদি একবার ব্যবহারের জন্যই তৈরি হয়, আর তার কাঁচামাল উৎপাদন, কারখানায় রূপান্তর, প্যাকেজিং ও পরিবহনে উল্লেখযোগ্য সম্পদ ব্যবহার হয়, তাহলে শুধু শেষ জীবনে ভেঙে যাওয়ার কারণে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে sustainable বলা যায় না। অন্যদিকে একটি reusable কাপ তৈরিতে শুরুতে বেশি উপকরণ বা শক্তি লাগলেও সেটি বহুবার ব্যবহার করা গেলে প্রতিবার ব্যবহারের ভিত্তিতে তার পরিবেশগত প্রভাব কমে আসতে পারে। অবশ্য reusable পণ্যও তখনই সুবিধা দেবে, যখন সেটি যথেষ্টবার ব্যবহার করা হবে এবং পরিষ্কার করতে অস্বাভাবিকভাবে বেশি পানি বা শক্তির প্রয়োজন হবে না। অর্থাৎ এখানেও কোনো সহজ উত্তর নেই। এই জটিলতার কারণেই পরিবেশনীতি ও circular economy-র আলোচনায় সাধারণত প্রথমে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো, তারপর পুনঃব্যবহার, এরপর উপকরণ পুনরুদ্ধার বা recycling-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। Biodegradable বা compostable materials গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সেগুলোকে এমন জায়গায় ব্যবহার করা বেশি যুক্তিসংগত যেখানে পুনঃব্যবহার বা recycling বাস্তবসম্মত নয়, যেমন কিছু খাদ্যদূষিত প্যাকেজিং বা জৈব বর্জ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত পণ্য। কিন্তু শুধু “সব প্লাস্টিকের জায়গায় biodegradable plastic বসিয়ে দিলেই সমস্যা শেষ”, এমন ধারণা আমাদের প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করতে পারে। বরং এটি ভোক্তাকে এমন এক ধরনের মানসিক স্বস্তি দিতে পারে যে বেশি ব্যবহার করলেও ক্ষতি নেই, কারণ বস্তুটি একসময় “প্রকৃতিতে মিশে যাবে”। অথচ sustainability-এর লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু বর্জ্যের রাসায়নিক গঠন বদলানো নয়, বরং বর্জ্য তৈরির পরিমাণই কমিয়ে আনা।

তাই biodegradable plastic-কে শত্রু বা ত্রাণকর্তা—কোনোটিই ভাবার প্রয়োজন নেই। এটি একটি tool, এবং অন্য যেকোনো প্রযুক্তির মতো এর কার্যকারিতা নির্ভর করে কোথায়, কেন এবং কীভাবে সেটি ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর। নির্দিষ্ট কিছু ব্যবহারে biodegradable বা compostable materials পরিবেশগতভাবে যৌক্তিক সমাধান দিতে পারে, বিশেষ করে যখন সঠিক collection system ও treatment infrastructure উপস্থিত থাকে। কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে reusable, recyclable কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কোনো পণ্য আরও কার্যকর হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের sustainability debate-এ আমাদের “এই পণ্যটি biodegradable কি না?” প্রশ্নের চেয়ে আরও কয়েকটি প্রশ্ন করা দরকার, 

– পণ্যটি আদৌ প্রয়োজন কি না? 

– এটি কতবার ব্যবহার করা যাবে? 

– কাঁচামাল কোথা থেকে এসেছে? 

– উৎপাদনে কত সম্পদ ব্যবহার হয়েছে? 

– ব্যবহারের পর সেটি কোন বর্জ্য ব্যবস্থায় যাবে? 

– সেই এলাকায় প্রয়োজনীয় treatment facility আছে কি? 

– আর পুরো জীবনচক্র বিবেচনায় এর বিকল্পগুলোর তুলনায় পরিবেশগত প্রভাব কতটা? 

এই প্রশ্নগুলো কঠিন, কিন্তু sustainability নিজেই একটি কঠিন ও বহুমাত্রিক বিষয়। কোনো একটি শব্দ, একটি সবুজ লোগো কিংবা একটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে এর উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। বিজ্ঞান আমাদের শেখায়, পরিবেশগত সমস্যার সমাধান করতে হলে উপাদান নয়, পুরো ব্যবস্থাকে দেখতে হয়। তাই “biodegradable” লেখা দেখেই নিশ্চিন্ত হওয়ার আগে আমাদের ভাবা উচিত, এটি কোথায় যাবে এবং আমাদের বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সত্যিই কি এটিকে সঠিকভাবে সামলাতে পারবে? কারণ শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রয়োজন শুধু এমন পণ্য নয়, যা ফেলে দেওয়ার পর ভেঙে যায়; বরং প্রয়োজন এমন উৎপাদন ও ভোগব্যবস্থা, যেখানে অপ্রয়োজনীয় পণ্য কম তৈরি হয়, যতটা সম্ভব দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয়, উপকরণ পুনরুদ্ধার করা হয় এবং বর্জ্যকে সমস্যা হিসেবে তৈরি হওয়ার আগেই কমিয়ে আনা যায়। Biodegradability একটি উপকারী বৈশিষ্ট্য হতে পারে; কিন্তু sustainability হলো পুরো ব্যবস্থার ফলাফল। এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে পারাই হতে পারে আরও দায়িত্বশীল ভবিষ্যতের প্রথম ধাপ।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ