কৃষিপরিবেশ ও পৃথিবীবিজ্ঞান বিষয়ক খবর

“শহরে সেমিনার হয়, কিন্তু গ্রামের মানুষের সাথে আমাদের দূরত্ব বেড়ে গেছে”—ড. আবেদ চৌধুরী

Share
Share

বাংলাদেশে কৃষি নিয়ে আলোচনা কম হয় না। রাজধানীতে সেমিনার হয়, সম্মেলন হয়, নীতিপত্র প্রকাশ হয়। তবু মাঠের কৃষকের জীবনে খুব দ্রুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে না। এই বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলে উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, “শহরে সেমিনার হয়, কিন্তু গ্রামের মানুষের সাথে আমাদের দূরত্ব বেড়ে গেছে।” তাঁর এই মন্তব্য আসলে দেশের কৃষিনীতি ও উন্নয়নচর্চার এক গভীর সংকটকে প্রকাশ করে।

নীতিনির্ধারণে মাঠের কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত

ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, কৃষি নিয়ে নীতিনির্ধারণ অনেক সময় শহরের কনফারেন্স রুমে বসে হয়, যেখানে গ্রামের কৃষকের বাস্তব অভিজ্ঞতা সরাসরি প্রতিফলিত হয় না। ফলে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়, সেগুলো কাগজে সুন্দর হলেও মাঠে প্রয়োগ করতে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বীজ, সার বা প্রযুক্তি বিতরণ নিয়ে নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে অনেক কৃষক সেগুলোর সুবিধা পান না।

এখানে সমস্যাটি শুধু প্রশাসনিক নয়; এটি একটি মানসিক দূরত্বের ফল। শহরের নীতিনির্ধারকরা অনেক সময় গ্রামকে ‘উন্নয়নের লক্ষ্য’ হিসেবে দেখেন, কিন্তু গ্রামবাসীকে ‘সহযোগী অংশীদার’ হিসেবে দেখেন না। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে নীতির বাস্তবায়ন কার্যকর হয় না।

বিনিয়োগের ঘাটতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব

কৃষি উন্নয়নে বিনিয়োগের কথা বলা হয় প্রায়ই, কিন্তু এই বিনিয়োগ কতটা গবেষণা ও উদ্ভাবনের দিকে যায়—সে প্রশ্ন তুলেছেন ড. আবেদ চৌধুরী। তাঁর মতে, বীজ উন্নয়ন, ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো বা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকলে কৃষি টেকসইভাবে এগোবে না।

অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্বল্পমেয়াদি ফল দেখানোর দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। এতে মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না হয়ে উপরিভাগে কিছু পরিবর্তন আসে, যা কয়েক বছর পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। কৃষির মতো একটি খাত, যেখানে ফল পেতে সময় লাগে, সেখানে ধৈর্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।

কৃষককে অংশীদার হিসেবে দেখা জরুরি

ড. আবেদ চৌধুরীর মতে, কৃষককে শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে না দেখে উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। কৃষকের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞান অনেক সময় নীতিনির্ধারণে মূল্যবান ইনপুট হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোন জাতের ধান কোন এলাকায় ভালো হয়, কোন রোগ বেশি দেখা যায়—এই বাস্তব জ্ঞান কৃষকের কাছেই সবচেয়ে বেশি থাকে। নীতিনির্ধারণে এই জ্ঞান যুক্ত না হলে সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় মাঠের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।

বিজ্ঞান ও নীতির সংযোগ

ড. আবেদ চৌধুরী মনে করেন, বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা জরুরি। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি যদি নীতির মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে না পারে, তবে সেই গবেষণার সামাজিক প্রভাব সীমিত থেকে যায়। একইভাবে নীতিনির্ধারকদের যদি বৈজ্ঞানিক তথ্য ও গবেষণার আপডেট না থাকে, তবে তাঁদের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপ্রস্তুত থেকে যেতে পারে।

শেষকথা

“শহরে সেমিনার হয়, কিন্তু গ্রামের মানুষের সাথে আমাদের দূরত্ব বেড়ে গেছে”—এই একটি বাক্য আমাদের কৃষি উন্নয়ন ভাবনার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে। কৃষিকে এগিয়ে নিতে হলে কাগুজে নীতির পাশাপাশি মাঠের বাস্তবতা বোঝা জরুরি। গ্রাম ও শহরের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি না হলে কৃষির মৌলিক সংকটগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অমীমাংসিত থেকে যাবে।

ড. আবেদ চৌধুরীর পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles