
কম শক্তিতে শীতলতা: টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ড. জুবায়ের শামীমের গবেষণা-যাত্রা
বাংলাদেশের অনেক তরুণ প্রকৌশলীর কাছে “যন্ত্র প্রকৌশল” শব্দটি এখনও অনেকটা পিস্টন–গিয়ার–ইঞ্জিনের জগতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই শাখা আজ বহুমাত্রিক; রোবোটিক্স থেকে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স থেকে মাইক্রো-ডিভাইস—সবখানেই যন্ত্র প্রকৌশলীদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানী ডট অর্গ-এর ৭০তম পর্বে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের Specially Appointed Assistant Professor (সাক্ষাৎকারে তিনি প্রজেক্ট রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজের কথাও বলেন) ড. জুবায়ের শামীম সেই পরিবর্তনশীল বাস্তবতারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ—যিনি বুয়েট থেকে যাত্রা শুরু করে কোরিয়া ও জাপানের গবেষণা পরিবেশে নিজেকে গড়ে তুলেছেন, আর এখন কাজ করছেন এমন একধরনের “স্মার্ট” উপাদান নিয়ে, যা ভবিষ্যতের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিকে আরও কম-শক্তি, আরও দক্ষ করে তুলতে পারে।
বুয়েট থেকে সিউল, সিউল থেকে টোকিও—একটি ধাপে ধাপে তৈরি হওয়া স্বপ্ন
ড. জুবায়ের শামীমের শিক্ষাজীবনের পথচলা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর মতোই বাস্তবতা ও সুযোগের সমন্বয়ে গড়া। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ স্নাতক শেষ করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য যান দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, যেখানে তিনি নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার্স করেন। পরবর্তীতে জাপানের ইউনিভার্সিটি অব টোকিও থেকে আবার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি আজ টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়েই গবেষণা ও শিক্ষায় যুক্ত।
এই যাত্রাপথটি বাইরে থেকে পরিকল্পিত ও মসৃণ মনে হলেও, ড. জুবায়ের শামীম নিজেই বলেন—শৈশব থেকে “আমি বিজ্ঞানী হব” এমন পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। বরং জীবন চলতে চলতে, এক ধাপ শেষ করে পরের ধাপ কী হবে—তা অনেক সময় নির্ধারণ করেছে পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা, আর নিজের ভেতরের আকাঙ্ক্ষা।
“মেকানিক্যাল” কি শুধু যন্ত্র? আসলে এটি এক “ভার্সেটাইল” মাঠ
বাংলাদেশে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে তুলনামূলক কম “টপ সাবজেক্ট” মনে হওয়ার একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে—বিশেষ করে যখন কম্পিউটার সায়েন্স বা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ড. জুবায়ের শামীম এই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁর ভাষায়, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শুধু যন্ত্র নয়; এখানে রয়েছে—
- থার্মাল ইঞ্জিনিয়ারিং (তাপ ও শক্তি ব্যবস্থাপনা),
- ফ্লুইড মেকানিক্স (তরল–গ্যাসের প্রবাহ),
- থার্মোডাইনামিক্স বা তাপগতিবিদ্যা,
- রোবোটিক্স, নিউক্লিয়ার টেকনোলজি,
- এমনকি ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স—কার্বন ন্যানোটিউব বা নানা উন্নত উপাদান নিয়েও কাজ।
তিনি জানান, বাইরে এসে তিনি দেখেছেন—বিদেশে সাবজেক্ট নিয়ে এ ধরনের “উচ্চ-নিম্ন” বিভাজন তেমন নেই। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণা ও কাজের বিস্তৃত সুযোগ থাকে। মূল কথা: যে বিষয় ভালো লাগে, সেটিতে দক্ষতা তৈরি করতে পারলে পথ খুলে যায়।
তাপগতিবিদ্যা: বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ঘরের এসি—সবখানেই এক সূত্র
ড. জুবায়ের শামীম যে ক্ষেত্রগুলো নিয়ে কাজ করেন, তার ভিত্তি অনেকটাই থার্মোডাইনামিক্স বা তাপগতিবিদ্যা। সহজভাবে বললে, এটি সেই বিজ্ঞান—যেখানে তাপ কীভাবে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, আবার শক্তি কীভাবে তাপকে নিয়ন্ত্রণ করে—তার নিয়মকানুন আলোচনা করা হয়।
একটি পরিচিত উদাহরণ হলো স্টিম পাওয়ার প্ল্যান্ট। সেখানে পানি গরম করে বাষ্প তৈরি হয়; সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এ ধরনের শক্তি রূপান্তরের মূল তত্ত্বগুলোই তাপগতিবিদ্যার বড় প্রয়োগক্ষেত্র। তবে ড. জুবায়ের শামীম পরিষ্কার করেন—বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদাহরণটি তাপগতিবিদ্যার প্রয়োগ বোঝাতে; তাঁর গবেষণার উপাদানগুলো সরাসরি বিদ্যুৎকেন্দ্রে নয়, বরং শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির অন্য প্রয়োগে বেশি প্রাসঙ্গিক।
“মেটাল অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক”: ফাঁপা কিন্তু শক্তিশালী—এক ধরনের ডিজাইন করা যায় এমন উপাদান
ড. জুবায়ের শামীমের বর্তমান গবেষণার একটি বড় অংশ ঘুরে ফিরে আসে একটি আধুনিক উপাদানের কাছে—Metal–Organic Framework (MOF)। বাংলায় এক কথায় নামান্তর করা কঠিন বলে তিনি ইংরেজি নামই ব্যবহার করেন। MOF কী?
তিনি বলেন, MOF হলো পোরাস ম্যাটেরিয়াল—অর্থাৎ এমন উপাদান, যার ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাঁকা জায়গা (পোর/ছিদ্র) থাকে। দৈনন্দিন জীবনে স্পঞ্জ বা ঝাঁঝরি-জাতীয় কাঠামোর কথা ভাবলে ধারণা সহজ হয়—যেমন স্পঞ্জের মধ্যে পানি ঢুকে থাকে, কারণ তার ভেতরে ফাঁকফোকর আছে। MOF-এর ক্ষেত্রেও ধারণাটা একই, তবে ফাঁকগুলো অতিক্ষুদ্র—ন্যানোমিটার স্কেলের।
এই কাঠামো তৈরি হয় দুটি জিনিস মিলিয়ে—
- মেটাল আয়ন (যেমন ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিঙ্ক ইত্যাদি),
- অর্গানিক লিগ্যান্ড (একধরনের জৈব “লিংক” বা সংযোগকারী অণু),
যা মেটাল অংশগুলোকে একটি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক কাঠামোয় বেঁধে দেয়।
MOF-এর বড় শক্তি হলো—এটি ডিজাইন করা যায়। কী ধরনের মেটাল, কী ধরনের লিগ্যান্ড, কী ধরনের সংযোগ—এসব বদলে দিয়ে গবেষকেরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী উপাদানটির বৈশিষ্ট্য “টেইলর” করতে পারেন। অর্থাৎ, একে বলা যায় চাহিদা অনুযায়ী সাজানো যায় এমন ম্যাটেরিয়াল।
ড. জুবায়ের শামীম আরও ব্যাখ্যা করেন, এই ফাঁকা অংশ বা পোরের আকার খুব গুরুত্বপূর্ণ। পোরের আকার অনুযায়ী ম্যাটেরিয়ালকে শ্রেণিবিভাগও করা হয়—যেমন মাইক্রোপোরাস ও মেসোপোরাস। তাঁর কাজের ক্ষেত্রে ন্যানোমিটার স্কেলের নির্দিষ্ট পরিসরের পোর-আকার লক্ষ্য করা হয়—কারণ এই আকার বদলালেই উপাদানটির আচরণ ও সক্ষমতা বদলে যায়।
এসি কেন এত বিদ্যুৎ খায়—এবং “ডেসিকেন্ট” প্রযুক্তি কীভাবে বদলাতে পারে সমীকরণ
ড. জুবায়ের শামীমের গবেষণার সবচেয়ে ব্যবহারিক ও সহজবোধ্য প্রয়োগ আসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এয়ার কন্ডিশনার) প্রসঙ্গে। তিনি বলেন, একটি কনভেনশনাল এসির দুটি লক্ষ্য থাকে—
- তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: গরমের দিনে ঘরকে ১৮–২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা।
- আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ: বাইরে যদি আর্দ্রতা ৮০% হয়, সেটিকে ৫০–৬০%-এ নামানো।
সমস্যা কোথায়? আর্দ্রতা কমাতে গেলে এসিকে বাতাসকে খুব ঠান্ডা করতে হয়, যাতে বাতাসের জলীয় বাষ্প কনডেন্স হয়ে পানিতে পরিণত হয়। ড. জুবায়ের শামীম এর জন্য একটি চমৎকার দৈনন্দিন উদাহরণ দেন—এক গ্লাস ঠান্ডা পানির বাইরে যে পানির ফোঁটা জমে, তা বাতাসের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ঘনীভূত হওয়ার ফল।
এসি-ও একই কাজ করে। আর্দ্রতা সরাতে কখনও বাইরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাতাসকে নামিয়ে আনতে হয় ৭–৮ ডিগ্রির নিচে। কিন্তু এত ঠান্ডা বাতাস সরাসরি ঘরে দেওয়া যায় না—তাই আবার সেটিকে রি-হিট করে “আরামদায়ক” তাপমাত্রায় আনা হয়। এই ঠান্ডা করা ও আবার গরম করার দ্বৈত প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি নষ্ট হয়।
এখানেই আসে ড. জুবায়ের শামীমদের গবেষণা-ধারণা: যদি বাতাস থেকে জলীয় বাষ্পকে আলাদা করে ফেলার জন্য আলাদা এক উপাদান ব্যবহার করা যায়—যেমন বিশেষ ধরনের ফাংশনাল ম্যাটেরিয়াল—তাহলে বাতাসকে অতটা ঠান্ডা করার দরকার পড়ে না। আগে আর্দ্রতা কমিয়ে “ড্রাই এয়ার” বানিয়ে নিলেই পরে শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করলেই কাজ হয়ে যায়। ফলে রি-হিটিংয়ের ঝামেলাও কমে, শক্তি সাশ্রয়ও হয়।
তিনি বলেন, এই পদ্ধতিতে প্রায় ৩৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত এনার্জি সেভ করা সম্ভব হতে পারে। এই প্রযুক্তি পরিচিত Desiccant Air Conditioner, Desiccant Dehumidifier, বা Hybrid Air Conditioning নামে। “ডেসিকেন্ট” শব্দটি সহজ করে বললে—এমন পদার্থ, যা বাতাসের ভেতরকার জলীয় বাষ্প শোষণ করে নেয়, ঠিক যেমন লবণ বা সিলিকা জেল আর্দ্রতা টেনে নেয়—তবে এখানে তা আরও উন্নত ও নিয়ন্ত্রিতভাবে করা হয়।
কেন জাপানে এই গবেষণার গতি বেশি—ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে গবেষণার যোগ
ড. জুবায়ের শামীম উল্লেখ করেন, জাপানের মতো দেশে শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির চাহিদা বেশি, এবং সে কারণে গবেষণায়ও বিনিয়োগ বেশি। বিশেষ করে যেসব শিল্প-প্রতিষ্ঠান এসি বা হিট-পাম্প তৈরি করে—যেমন বড় বড় ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানি—তারা “নেক্সট জেনারেশন” প্রযুক্তি তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে অর্থায়ন করে। ফলে গবেষণা-ল্যাব ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়, যা নতুন ধারণাকে বাস্তব প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে নেয়।
বিজ্ঞানী হওয়ার ইচ্ছে: “চার দেয়ালের বন্দি জীবন” ভাঙার সিদ্ধান্ত
ড. জুবায়ের শামীমের ব্যক্তিগত গল্পের একটি আবেগময় দিক আছে। বুয়েট থেকে পাস করার পর তিনি চট্টগ্রামে একটি অয়েল রিফাইনারিতে চাকরি নেন এবং প্রায় তিন বছর কাজ করেন। কিন্তু একসময় তাঁর মনে হয়—জীবন যেন “চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি” হয়ে যাচ্ছে। দেশের বাইরে কখনও যাওয়া হয়নি; পরিবারও অতটা সচ্ছল ছিল না যে ভ্রমণ সহজ হবে। পৃথিবী দেখার ইচ্ছা, নতুন পরিবেশে শেখার আকাঙ্ক্ষা—এসব মিলেই তাঁর বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগ্রহ জন্মায়।
তবে পথটি সহজ ছিল না। তিনি বলেন, বুয়েটের ফল খুব “টপ টেন পার্সেন্ট”-এর মধ্যে ছিল না, ফলে স্কলারশিপ পাওয়া কঠিন ছিল। এরই মধ্যে বাংলাদেশের পরিচিত দ্বন্দ্ব—বিসিএস নাকি উচ্চশিক্ষা—তাঁর মধ্যেও কাজ করেছে। তিনি বিসিএসের প্রস্তুতিও শুরু করেছিলেন। কিন্তু মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতির সঙ্গে তাঁর নিজের আগ্রহের মিল পাননি। হিট ট্রান্সফার, ফ্লুইড মেকানিক্স, মাল্টিফেজ ফ্লো সিমুলেশনের মতো বিষয় তাঁকে বেশি টানত। শেষমেশ তিনি সিদ্ধান্ত নেন—বিদেশে পড়াশোনার প্রস্তুতিতেই সময় দেবেন।
পিএইচডি শেষে তিনি জাপানের একটি সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে গবেষণা বিভাগে চাকরি করেন। কিন্তু দেড় বছর পর তিনি বুঝতে পারেন—কোম্পানির কাজ স্থিতিশীল হলেও, গবেষণার যে আনন্দ—নতুন ফাইন্ডিংস, পেপার লেখা, কনফারেন্সে উপস্থাপনা, বিজ্ঞানীদের নেটওয়ার্কিং—এসব তিনি মিস করছেন। ঠিক তখনই তাঁর সাবেক সুপারভাইজারের ইমেইল আসে: নতুন একটি প্রজেক্ট, আগ্রহী কি না?
আবার দ্বিধা—স্ট্যাবল চাকরি নাকি অনিশ্চিত প্রজেক্ট? কিন্তু তিনি ফিরে যান নিজের “প্রথম বড় ঝুঁকি”র কাছে—বাংলাদেশে চাকরি ছেড়ে মাস্টার্সে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কাছে। এবং তিনি বেছে নেন গবেষণাই। তাঁর ভাষায়, জীবনে আপনি যদি বুঝতে পারেন আপনি কী চান এবং সেটাকে অনুসরণ করেন, তাহলে ধীরে ধীরে আপনি ঠিক জায়গাতেই পৌঁছান।
তিনি একটি সিনেমার সংলাপকে নিজের মটো হিসেবে তুলে ধরেন:
“যারা প্যাশনের জন্য কাজ করে, তারা সবসময় তাদের চেয়ে বেশি ধনী—যারা শুধু টাকার জন্য কাজ করে।”
এখানে “ধনী” শব্দটি তিনি কেবল অর্থে নয়, জীবনের তৃপ্তি ও অর্থবহতার জায়গা থেকেও বোঝান।
তরুণদের জন্য তাঁর পরামর্শ: “বাইপাস” নয়, প্রস্তুতি—এবং পিএইচডির গুরুত্ব
বাংলাদেশের তরুণদের উদ্দেশে ড. জুবায়ের শামীমের পরামর্শগুলো বাস্তবভিত্তিক এবং অভিজ্ঞতাজনিত।
১) গবেষক হতে হলে পিএইচডি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই ইন্ডাস্ট্রির রিসার্চ ডিভিশনে পিএইচডি ছাড়াও কাজ করেন—তিনি স্বীকার করেন। কিন্তু একজন স্বাধীন গবেষক হিসেবে “গবেষণা কীভাবে করতে হয়”—এই প্রশিক্ষণটি সবচেয়ে শক্তভাবে পাওয়া যায় পিএইচডি পর্যায়ে। তাই তাঁর মতে, গবেষণা-স্বপ্ন থাকলে লক্ষ্য হওয়া উচিত ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ল্যাবে পিএইচডি অ্যাডমিশন নেওয়া।
২) প্রফেসররা কী খোঁজেন—সেটা বোঝার চেষ্টা করুন।
তিনি বলেন, নিজের ফলাফল খুব উঁচু না হলেও—কোন গুণ বা স্কিল দেখে বিদেশি প্রফেসররা গবেষণা সহকারী হিসেবে শিক্ষার্থী বাছাই করেন, তা বোঝা জরুরি। তিনি নিজেও মাস্টার্সের সুযোগ পেতে প্রায় তিন বছর চেষ্টা করেছেন।
৩) “বাইপাস মেন্টালিটি” পরিহার করুন—GRE/IELTSকে এড়িয়ে যাবেন না।
অনেকে এমন বিশ্ববিদ্যালয় খোঁজেন যেখানে GRE/IELTS লাগবে না—ড. জুবায়ের শামীম এটাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলেন। এতে অপশন কমে যায়, সুযোগ সীমিত হয়। বরং পরীক্ষায় ভালো করলে কনফিডেন্স বাড়ে, প্রফেসররাও বোঝেন শিক্ষার্থী কতটা চাপ নিতে পারে।
৪) দেশে থেকেই পাবলিকেশন সম্ভব—কৌশল খুঁজুন।
বাংলাদেশে গবেষণা সুবিধা সীমিত—এটি সত্য। কিন্তু তিনি বলেন, আজকাল দেশের বাইরে থাকা বহু সিনিয়র গবেষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কাজের একটি ছোট অংশে সহযোগিতা করা যায়—যেমন সফটওয়্যার/সিমুলেশন, থিওরিটিক্যাল অংশ, নিউমেরিক্যাল অ্যানালাইসিস ইত্যাদি। এতে যৌথভাবে কো-অথর হিসেবে প্রকাশনা সম্ভব। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কনফারেন্স বা নিজস্ব জার্নালেও আন্তরিকভাবে পেপার লেখার চেষ্টা করা যায়—যা প্রোফাইল সমৃদ্ধ করে।
৫) ল্যাবের ফোকাস না বুঝে ইমেইল করলে সুযোগ নষ্ট হয়।
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন—একবার আইআইটির এক শিক্ষার্থী খুব ভালো প্রোফাইল নিয়ে তাঁদের ল্যাবে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু তিনি যে বিষয়ে কাজ করতে চান (সোলার সেল/ফটোনিক্স), তাঁদের ল্যাব সেটি নিয়ে কাজ করে না। ফলে ভালো প্রোফাইল হলেও গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তাই প্রফেসরকে ইমেইল করার আগে ল্যাবের গবেষণা-ফোকাস বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিষয় বদলানো কি নিষেধ? না—কিন্তু “একটা ভিত্তি” গড়ে তুলতে হয়
অনেক শিক্ষার্থীই দ্বিধায় থাকে—এক বিষয়ে পড়েছি, কিন্তু আগ্রহ অন্য বিষয়ে। ড. জুবায়ের শামীম বলেন, গবেষণায় “বর্ডার” কঠোর নয়। তাঁর নিজের জীবনই উদাহরণ: মাস্টার্স নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, পিএইচডি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং। কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা করেন—এখানে “কৌশল” হলো: একটি মূল দক্ষতা বা ভিত্তি তৈরি করা। যেমন হিট ট্রান্সফার, ফ্লুইড মেকানিক্স, থার্মোডাইনামিক্স—এই বেসিক দক্ষতাগুলো নিউক্লিয়ার এবং মেকানিক্যাল—দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই তিনি একই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভিন্ন ডোমেইনে প্রয়োগ করতে পেরেছেন।
তিনি জোর দেন—স্কিল সেট তৈরি হয় সময় নিয়ে। বারবার টপিক বদলালে গভীর দক্ষতা তৈরি হয় না। তাই আগে একটি বিষয়ের গভীরে যাওয়ার মতো দক্ষতা তৈরি করুন, তারপর সেই দক্ষতাকে নানা ক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ খুঁজুন—ম্যাথের উদাহরণ দিয়ে ড. মশিউর রহমান যেভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন, ড. জুবায়ের শামীম সেটিকেই সমর্থন করেন।
শেষ কথা: গবেষণার আলোয় বাংলাদেশের সম্ভাবনা
ড. জুবায়ের শামীমের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বৈশ্বিক গবেষণার মঞ্চে পৌঁছাতে শুধু “টপ রেজাল্ট” বা “সোজা পথ”ই একমাত্র রাস্তা নয়। আত্মবিশ্বাস, প্যাশন, ধৈর্য, আর লক্ষ্যভিত্তিক প্রস্তুতি—এই চারটি জিনিস মিলেই অনেক সময় সবচেয়ে বড় বাধা পেরোনোর শক্তি হয়ে ওঠে। একসময় যে তরুণ প্রকৌশলী চট্টগ্রামের চাকরিজীবনে নিজেকে “চার দেয়ালের বন্দি” মনে করেছিলেন, আজ তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে ঘরের এসি থেকে শুরু করে বৈশ্বিক শক্তি ব্যবস্থাপনায় নতুন দক্ষতার পথ খুলে দিতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এই যাত্রা এক ধরনের বার্তা: স্বপ্ন যদি বিজ্ঞান হয়, তবে পথও বিজ্ঞানীর মতোই—কৌতূহল দিয়ে শুরু, অধ্যবসায়ে এগোনো, আর সত্যকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দে পরিপূর্ণ। এমন মানুষদের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়—এটি জাতীয় গর্ব, আর আগামী প্রজন্মের জন্য একটি জীবন্ত প্রেরণা।
রেফারেন্স:
ড. জুবায়ের শামীম এর লিংকডইন https://www.linkedin.com/in/jubair-a-shamim-ph-d-0a0923136/
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ড. মশিউর রহমান
তারিখ: ২৯ নভেম্বর ২০২২
ভিডিও: https://www.youtube.com/watch?v=4FypsRiDgrI

Leave a comment