সম্পাদকীয়

গবেষণায় পিছিয়ে বাংলাদেশ: মেধা আছে, তবু বাধা কোথায়?

Share
Share

মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

উর্বর মাটিতে ভালো বীজ বপন করলেই যেমন ফসলের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না, তেমনি একটি দেশে মেধাবী মানুষের উপস্থিতি থাকলেই সেখানে বিশ্বমানের গবেষণা গড়ে ওঠে না। বীজের বিকাশের জন্য যেমন প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ, তেমনি গবেষণার বিকাশের জন্য প্রয়োজন অর্থায়ন, আধুনিক অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং স্বাধীন চিন্তার সুযোগ। বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থী ও গবেষকের অভাব নেই। দেশের অনেক গবেষক বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। অথচ নিজ দেশে সেই মেধাকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে। বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার (WIPO) Global Innovation Index 2026 অনুযায়ী, ১৩৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৫তম। ২০২৫ সালের সূচকে মানবসম্পদ ও গবেষণা খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল আরও উদ্বেগজনক—১৩৩তম। উদ্ভাবন সক্ষমতার এই অবস্থান আমাদের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও প্রশ্ন থেকে যায়, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বাড়লেও গবেষণায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হচ্ছে না কেন? সমস্যাটি কি শুধুই অর্থের অভাব, নাকি গবেষণাকে আমরা এখনো জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি? বাস্তবতা হলো, আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় পাঠদান, পরীক্ষা ও সনদ অর্জনের বিষয়গুলো যতটা গুরুত্ব পায়, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং স্বাধীন গবেষণার সুযোগ ততটা প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার পায় না। ফলে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় কিছু গবেষক সফল হলেও সেই সাফল্য একটি টেকসই জাতীয় গবেষণাব্যবস্থায় রূপ নিতে পারছে না।

গবেষণায় পিছিয়ে থাকার অন্যতম বড় কারণ অপর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ২.০৮ শতাংশ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২.৮৫ শতাংশ গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তবে গবেষণায় বিনিয়োগ বলতে শুধু অর্থ বরাদ্দ বোঝায় না। গবেষণার জন্য প্রয়োজন আধুনিক পরীক্ষাগার, দক্ষ কারিগরি জনবল, মানসম্মত গবেষণা উপকরণ, আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা। অনেক গবেষককে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা উপকরণের অভাবে গবেষণার পরিধি সীমিত রাখতে হয়। আবার প্রকল্প অনুমোদন, অর্থ ছাড় ও সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রশাসনিক জটিলতা গবেষণার ধারাবাহিকতা ব্যাহত করতে পারে। কিন্তু অর্থায়নের সংকটের পাশাপাশি গবেষণা পরিচালনা ও মূল্যায়নব্যবস্থার দুর্বলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণার মৌলিকত্ব, গুণগত মান এবং প্রকৃত অবদানের পরিবর্তে প্রকাশনার সংখ্যা অতিরিক্ত গুরুত্ব পেলে গবেষণার উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এতে নতুন ও জটিল বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন অনুসন্ধানের পরিবর্তে দ্রুত প্রকাশযোগ্য গবেষণার প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং গবেষণার জন্য নির্ধারিত সময়ের অভাব শিক্ষকদের গবেষণায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ সীমিত করে। তরুণ গবেষকদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। পর্যাপ্ত গবেষণা বৃত্তি, গবেষণা সহকারী পদ, পোস্টডক্টরাল সুযোগ এবং স্থিতিশীল গবেষণা পেশার অভাবে অনেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ খোঁজেন। বিদেশে গবেষণা করা নিজেই কোনো সমস্যা নয়; বরং সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন দেশে ফিরে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া যায় না।

গবেষণা ও সমাজের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যকার দূরত্বও বাংলাদেশের গবেষণাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা। কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো খাতে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত জটিল সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং নীতিনির্ধারণী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সব ক্ষেত্রে গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেক গবেষণার ফলাফল বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হলেও বাস্তব প্রয়োগের পর্যায়ে পৌঁছায় না। অন্যদিকে, দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা সীমিত থাকায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পরিবর্তে আমদানিনির্ভর সমাধানের প্রতি ঝোঁক দেখা যায়। তবে গবেষণাকে শুধু তাৎক্ষণিক প্রয়োগ কিংবা বাণিজ্যিক লাভের ভিত্তিতে বিচার করাও ভুল। মৌলিক গবেষণার অনেক ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি গবেষণা পরিবেশ, যেখানে মৌলিক ও প্রয়োগভিত্তিক গবেষণা উভয়ই যথাযথ গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে গবেষণার সততা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির যথাযথ অনুসরণ নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়ানোই যদি সাফল্যের প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে, তাহলে গবেষণার গুণগত মান উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি দেশের গবেষণা সক্ষমতা শুধু কতটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না; বরং সেই গবেষণা কতটা মৌলিক, নির্ভরযোগ্য এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে কতটা অবদান রাখছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।

বাংলাদেশের গবেষণাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। প্রথমত, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই অর্থ বণ্টনে স্বচ্ছতা, বৈজ্ঞানিক যোগ্যতা ও জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে গবেষণার গুণগত মান, মৌলিক অবদান এবং একাডেমিক সততার যথাযথ মূল্যায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি তরুণ গবেষকদের জন্য গবেষণা বৃত্তি, আধুনিক পরীক্ষাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্বাধীনভাবে গবেষণা পরিচালনার সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে জননীতি ও বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। গবেষণাকে ব্যক্তিগত পদোন্নতি, প্রকাশনার সংখ্যা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে হবে। কারণ গবেষণা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশের সমস্যা মেধার অভাব নয়, বরং সেই মেধাকে বিকশিত করার উপযুক্ত পরিবেশ ও কার্যকর গবেষণাব্যবস্থার ঘাটতি। মেধা যদি সম্ভাবনার বীজ হয়, তবে গবেষণাবান্ধব প্রতিষ্ঠান ও নীতিই সেই বীজের বিকাশের ভিত্তি। এই ভিত্তি শক্তিশালী না করে শুধু মেধাবী মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে গবেষণায় এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ