ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত বাস্তব একটি সতর্কবার্তা। কারণ আমাদের দেশে অনেক তরুণ-তরুণী মেধাবী হলেও একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়—তারা একসঙ্গে অনেক পথ ধরতে চায়। একটু বিসিএস, একটু বিদেশে উচ্চশিক্ষা, একটু চাকরির প্রস্তুতি, একটু গবেষণা, আবার কখনো পরিবারের চাপ, কখনো বন্ধুদের দেখাদেখি—সব মিলিয়ে তাদের প্রস্তুতি ছড়িয়ে যায়। ফলে সময় যায়, পরিশ্রম হয়, কিন্তু গভীরতা তৈরি হয় না।
“দুই নৌকায় পা দেওয়া” কথাটি আমাদের পরিচিত একটি প্রবাদ। নদীতে যদি কেউ একসঙ্গে দুই নৌকায় দাঁড়াতে চায়, তাহলে তার পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিক্ষাজীবন ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই রকম। সব পথই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সব পথের প্রস্তুতি এক নয়। একজন গবেষক হওয়ার প্রস্তুতি যেমন এক ধরনের, বিসিএসের প্রস্তুতি আরেক ধরনের, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রস্তুতি আবার ভিন্ন ধরনের।
ড. রানা নিজের জীবন থেকেও এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ার সময় তাঁর মনেও দ্বিধা ছিল। কখনো মনে হয়েছে বিসিএস দেবেন, কখনো মনে হয়েছে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য চেষ্টা করবেন। কিন্তু অনার্সের তৃতীয় বর্ষে এসে তিনি নিজের লক্ষ্য স্থির করেন। তিনি বুঝতে পারেন, গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার পথে এগোতে হলে সেই অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। এরপর তিনি একাডেমিক ফলাফল, গবেষণাপত্র পড়া, গবেষণার অভিজ্ঞতা তৈরি এবং বিদেশের অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছু সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সাজাতে শুরু করেন।
এই সিদ্ধান্তই পরে তাঁকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পিএইচডির পথে নিয়ে যায়। তিনি অনেক অধ্যাপককে ইমেইল করেছেন, প্রত্যাখ্যান পেয়েছেন, আবার চেষ্টা করেছেন। শেষ পর্যন্ত কুন্সান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির সুযোগ পান এবং বর্তমানে KENTECH-এ হাইড্রোজেন এনার্জি নিয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করছেন। তাঁর পথ দেখায়—ফোকাস থাকলে প্রস্তুতি অর্থপূর্ণ হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এই বার্তাটি বিশেষভাবে জরুরি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর অনেকেই চারপাশের কথায় বিভ্রান্ত হয়। কেউ বলে বিসিএসই সবচেয়ে নিরাপদ পথ, কেউ বলে বিদেশে না গেলে ভবিষ্যৎ নেই, কেউ বলে চাকরির বাজারে দ্রুত ঢুকতে হবে, আবার কেউ বলে গবেষণা করলে সময় নষ্ট। এসব কথার ভিড়ে শিক্ষার্থী অনেক সময় নিজের আগ্রহ ও সক্ষমতা ভুলে যায়।
কিন্তু সফলতার জন্য প্রথমে দরকার নিজের পথ বোঝা। যদি কেউ বিজ্ঞানী হতে চায়, তাহলে তাকে গবেষণাপত্র পড়তে হবে, শিক্ষকদের সঙ্গে ছোট প্রজেক্টে কাজ করতে হবে, ল্যাবের অভিজ্ঞতা নিতে হবে, একাডেমিক সিভি তৈরি করতে হবে। যদি কেউ বিদেশে পিএইচডি করতে চায়, তাহলে তাকে ভাষা দক্ষতা, গবেষণা অভিজ্ঞতা, অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্কলারশিপ প্রস্তুতির দিকে মন দিতে হবে। আর যদি কেউ প্রশাসনিক চাকরিতে যেতে চায়, তাহলে তাকে সেই পরীক্ষার জন্য আলাদা পরিকল্পনা করতে হবে।
সমস্যা কোনো পথ বেছে নেওয়ায় নয়; সমস্যা হলো লক্ষ্য ছাড়াই সব পথ একসঙ্গে ধরার চেষ্টা করা। এতে সময় ও শক্তি নষ্ট হয়, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই শক্ত ভিত্তি তৈরি হয় না।
তবে ফোকাস মানে সংকীর্ণতা নয়। একজন শিক্ষার্থী চাইলে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে, নতুন অভিজ্ঞতা নিতে পারে, নিজের আগ্রহ পরীক্ষা করতে পারে। কিন্তু একটি পর্যায়ে এসে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়—কোন পথে সে গভীরভাবে এগোবে। কারণ গভীরতা ছাড়া বড় সাফল্য আসে না।
আজকের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুধু মেধা যথেষ্ট নয়; মেধাকে সঠিক দিকে ব্যবহার করতে হয়। যে শিক্ষার্থী নিজের লক্ষ্য জানে, সে জানে কোন বই পড়তে হবে, কোন দক্ষতা শিখতে হবে, কাকে ইমেইল করতে হবে, কোন সুযোগের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আর যে লক্ষ্যহীন, সে অনেক পরিশ্রম করেও বারবার দিক হারায়।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পরামর্শ তাই খুব সরল, কিন্তু গভীর—নিজের লক্ষ্য বুঝে নাও, তারপর সেই লক্ষ্য অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করো। কারণ সফলতা শুধু পরিশ্রমের ফল নয়; সঠিক দিকে ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফল।
ড. রানার গবেষণাযাত্রা, দক্ষিণ কোরিয়ায় তাঁর উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা, হাইড্রোজেন এনার্জি নিয়ে তাঁর কাজ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর আরও বাস্তব পরামর্শ জানতে পড়ুন বিজ্ঞানী অর্গে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment