উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগগবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

“ব্যর্থতা আসতে পারে, একাধিকবার মেইল করে যেতে হবে; প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ধৈর্যশীল হওয়া” – ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানা

Share
Share

ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর জন্য বাস্তব ও জরুরি পরামর্শ। অনেকেই মনে করে বিদেশে পিএইচডি বা গবেষণার সুযোগ পাওয়া হয়তো শুধু ভালো রেজাল্টের বিষয়। বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। এখানে দরকার লক্ষ্য, প্রস্তুতি, গবেষণার আগ্রহ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সবচেয়ে বড় কথা—ধৈর্য।

ড. রানার নিজের পথও সহজ ছিল না। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পর তিনি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। অনেক অধ্যাপককে ইমেইল করেছিলেন। কেউ উত্তর দেননি, কেউ নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন, আবার কেউ আগ্রহ দেখালেও পিএইচডির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দিতে পারেননি। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। ধারাবাহিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার কুন্সান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডির সুযোগ পান, যেখানে তাঁর সুপারভাইজার গবেষণা ও আর্থিক সহায়তা দিতে রাজি হন।

এই অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়—বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ একদিনে তৈরি হয় না। শুধু “আমি বিদেশে পড়তে চাই” বললেই হয় না; কেন পড়তে চাই, কোন বিষয়ে পড়তে চাই, কোন গবেষণা ক্ষেত্র আমাকে আকর্ষণ করে—এসব স্পষ্টভাবে জানা দরকার।

ড. রানার মতে, প্রথম কাজ হলো লক্ষ্য স্থির করা। একজন শিক্ষার্থীকে আগে বুঝতে হবে সে কোন বিষয়ে গবেষণা করতে চায়। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, এনার্জি রিসার্চ, ফুয়েল সেল, ইলেকট্রোকেমিস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি, এআই—যে ক্ষেত্রই হোক, সেটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করতে হবে। শুধু নাম শুনে কোনো বিষয় বেছে নিলে হবে না; সেই বিষয়ে কী ধরনের গবেষণা হচ্ছে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কী, নিজের আগ্রহ কোথায়—এসব বুঝতে হবে।

এরপর দরকার একাডেমিক প্রস্তুতি। ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঙ্গে গবেষণাপত্র পড়ার অভ্যাসও দরকার। গুগল স্কলার, ওয়েব অব সায়েন্স বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা দেখতে পারে কোন অধ্যাপক কোন বিষয়ে কাজ করছেন। যে অধ্যাপকের গবেষণা নিজের আগ্রহের সঙ্গে মিলে যায়, তাঁর সাম্প্রতিক কিছু গবেষণাপত্র পড়ে বুঝতে হবে—তাঁর ল্যাবে কী ধরনের কাজ হয়।

শুধু ইমেইল পাঠালেই হবে না; ইমেইলটি হতে হবে চিন্তাশীল। সেখানে নিজের পরিচয়, একাডেমিক পটভূমি, গবেষণার আগ্রহ, পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং কেন নির্দিষ্ট অধ্যাপকের ল্যাবে কাজ করতে চান—এসব সংক্ষেপে ও পরিষ্কারভাবে লিখতে হবে। এর সঙ্গে দরকার একটি ভালো একাডেমিক সিভি এবং কভার লেটার। অনেক শিক্ষার্থী একই ইমেইল শতাধিক অধ্যাপককে পাঠায়। এতে ব্যক্তিগত আগ্রহ বা প্রস্তুতির ছাপ থাকে না। বরং প্রতিটি ইমেইলে নির্দিষ্ট গবেষণাগারের সঙ্গে নিজের আগ্রহের সংযোগ দেখানো উচিত।

ভাষা দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ। আইইএলটিএস বা টোফেলের মতো পরীক্ষার প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া দরকার। বিদেশে গবেষণার পরিবেশে শুধু পড়াশোনা নয়, প্রেজেন্টেশন, রিপোর্ট লেখা, গবেষণাপত্র পড়া এবং সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা—সবকিছুতেই ভাষা দক্ষতা দরকার হয়।

তবে এই সব প্রস্তুতির পরও প্রত্যাখ্যান আসতে পারে। অনেক সময় অধ্যাপকের ফান্ড থাকে না, ল্যাবে নতুন শিক্ষার্থী নেওয়ার সুযোগ থাকে না, অথবা আপনার প্রোফাইল সেই মুহূর্তে তাঁদের প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। তাই একটি নেতিবাচক উত্তর মানেই পথ শেষ নয়। বরং সেটি প্রস্তুতি আরও উন্নত করার সুযোগ।

ড. রানার জীবন দেখায়, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা গবেষণার পথের অপরিহার্য গুণ। প্রত্যাখ্যানকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা না ভেবে শেখার অংশ হিসেবে নিতে হবে। প্রতিটি ইমেইল, প্রতিটি উত্তর, প্রতিটি অপেক্ষা—সবই শিক্ষার্থীর প্রস্তুতিকে পরিণত করে।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তাঁর বার্তা তাই অত্যন্ত স্পষ্ট: লক্ষ্য ঠিক করো, নিজের বিষয় ভালোভাবে জানো, গবেষণাপত্র পড়ো, শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করো, ভাষা দক্ষতা বাড়াও, ভালো সিভি তৈরি করো এবং ধৈর্য ধরে অধ্যাপকদের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাও।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন শুধু সৌভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না; এটি প্রস্তুতি, পরিশ্রম ও ধৈর্যের ফল। ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার গবেষণাযাত্রা, দক্ষিণ কোরিয়ায় তাঁর পিএইচডি অভিজ্ঞতা, হাইড্রোজেন এনার্জি নিয়ে তাঁর কাজ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর বিস্তারিত পরামর্শ জানতে পড়ুন বিজ্ঞানী অর্গে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles