একটু কল্পনা করে দেখো, তুমি এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করলে, যা তোমাকে নিয়ে যেতে পারে অতীতে। কয়েকটি বোতাম চাপতেই চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল, আর তুমি পৌঁছে গেলে বহু বছর আগের পৃথিবীতে—যখন তোমার দাদা তখনও তরুণ। এবার কোনো কারণে তুমি এমন কিছু করলে, যার ফলে তোমার বাবা বা মায়ের জন্মের আগেই দাদা মারা গেলেন। তাহলে কী হবে? দাদা যদি মারা যান, তাহলে তোমার বাবা বা মায়ের জন্ম হবে না। তাঁদের জন্ম না হলে তোমারও জন্ম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তুমি যদি জন্মই না নাও, তাহলে অতীতে গিয়ে দাদার সঙ্গে ঘটনাটি ঘটাল কে? আবার তুমি যদি জন্ম না নেওয়ার কারণে অতীতে যেতেই না পারো, তাহলে দাদা বেঁচে থাকবেন, তোমার বাবা-মায়ের জন্ম হবে, তোমারও জন্ম হবে—আর একদিন তুমি আবার সেই টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে যেতে পারবে। যুক্তির এই অদ্ভুত গোলকধাঁধাটির নাম “Grandfather Paradox” বা গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স। বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে এমন ঘটনা খুব পরিচিত হলেও পদার্থবিজ্ঞানের জন্য প্রশ্নটি বেশ গভীর—প্রকৃতি কি সত্যিই এমন কোনো ঘটনা ঘটতে দেবে, যেখানে একটি ঘটনা শেষ পর্যন্ত নিজের ঘটার কারণকেই মুছে দেয়?
মজার ব্যাপার হলো, সময় ভ্রমণের ধারণাটি পুরোপুরি কল্পকাহিনির বিষয় নয়। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বলছে, স্থান ও সময় আলাদা দুটি বিষয় নয়; তারা একসঙ্গে মিলে তৈরি করে space-time বা স্থান-কাল। বিশাল নক্ষত্র, ব্ল্যাক হোল কিংবা অত্যন্ত শক্তিশালী মহাকর্ষের উপস্থিতিতে এই স্থান-কাল বাঁকতে পারে। একটি টানটান চাদরের ওপর ভারী বল রাখলে সেটি যেমন নিচের দিকে বেঁকে যায়, অনেকটা তেমনি ভর ও শক্তির কারণে space-time-ও বেঁকে যায়। সাধারণ আপেক্ষিকতার কিছু গাণিতিক সমাধানে এমন অবস্থার কথাও পাওয়া যায়, যেখানে সময়ের পথটি ঘুরতে ঘুরতে আবার নিজের অতীতের কোনো বিন্দুতে ফিরে আসতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানে এমন কাল্পনিক পথকে বলা হয় Closed Timelike Curve বা CTC। ভাবো, তুমি একটি রাস্তা ধরে শুধু সামনের দিকে হাঁটছ, কিন্তু রাস্তাটি এমনভাবে বাঁকানো যে সামনে যেতে যেতেই একসময় তুমি নিজের আগের অবস্থানে ফিরে এলে। CTC-এর ধারণাটি অনেকটা তেমনই—শুধু এখানে রাস্তাটি স্থান ও সময় দিয়ে তৈরি। আর এখানেই আবার গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স সামনে এসে দাঁড়ায়: যদি সত্যিই অতীতে ফেরা যায়, তাহলে তুমি কি এমন কিছু করতে পারবে, যা তোমার নিজের বর্তমানকেই অসম্ভব করে দেবে?

সময়চক্র
১৯৯১ সালে পদার্থবিজ্ঞানী David Deutsch এই সমস্যাটিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দৃষ্টিতে দেখলেন। আমাদের দৈনন্দিন জগতে কোনো দরজা হয় খোলা, নয় বন্ধ; একটি বল হয় টেবিলের ওপর, নয় মেঝেতে। কিন্তু কোয়ান্টাম জগৎ এত সরল নয়। অতিক্ষুদ্র কণার আচরণ বোঝাতে অনেক সময় একাধিক সম্ভাবনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। Deutsch প্রস্তাব করলেন, কোনো কোয়ান্টাম ব্যবস্থা যদি সময়ের একটি বন্ধ পথ ধরে নিজের অতীতের অবস্থার সঙ্গে interaction করে, তাহলে সেটিকে এমন একটি self-consistent বা স্ব-সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছাতে হবে, যেখানে কোনো যৌক্তিক বিরোধ তৈরি হবে না। সহজ ভাষায় বললে, মহাবিশ্ব যেন তোমাকে বলছে—“অতীতে যেতে পারো, কিন্তু এমন কিছু ঘটতে পারবে না, যার ফলে তোমার অতীতে যাওয়াটাই অসম্ভব হয়ে যায়।” অর্থাৎ গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্সের মতো পরিস্থিতিতে প্রকৃতি হয়তো এমন ফলই অনুমোদন করবে, যেখানে অতীত আর ভবিষ্যৎ পরস্পরকে বাতিল করে দেয় না।

David Deutsch এর কোয়ান্টাম সিমুলেশন মডেল
ধারণাটি শুনতে চমৎকার, কিন্তু বিজ্ঞানে শুধু একটি সুন্দর ধারণা থাকলেই চলে না। প্রশ্ন হলো, এটিকে পরীক্ষাগারে কোনোভাবে পরীক্ষা করা যায় কি না। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের হাতে তো কোনো টাইম মেশিন নেই, এমনকি বাস্তবে Closed Timelike Curve আছে কি না সেটিও আমরা জানি না। তাই University of Queensland-এর একদল গবেষক সত্যিকারের সময় ভ্রমণ তৈরি না করে তার কোয়ান্টাম আচরণ অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁরা ব্যবহার করলেন আলোয়ের ক্ষুদ্র কণা—photon। দুটি photon-এর polarization বা মেরুকরণকে কাজে লাগিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হলো, যেখানে একটি photon এমন ভূমিকা পালন করছিল যেন সেটি সময়ের একটি লুপ ঘুরে ফিরে আসা কণা। অন্য photon-এর সঙ্গে তার interaction এমনভাবে সাজানো হলো, যেন পুরো ব্যবস্থাটি Deutsch-এর CTC model অনুসরণ করে। এরপর বিজ্ঞানীরা দেখলেন, quantum system এমন একটি অবস্থায় পৌঁছাতে পারে কি না, যেখানে লুপের শুরু আর শেষ পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। পরীক্ষায় ঠিক এমন self-consistent আচরণই দেখা গেল।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার। গবেষকেরা কোনো photon-কে সত্যিকারের অতীতে পাঠাননি, কোনো টাইম মেশিনও তৈরি করেননি। তাঁরা তৈরি করেছিলেন একটি quantum simulation—অর্থাৎ এমন একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা, যার গাণিতিক আচরণ সম্ভাব্য time-travel system-এর মতো। বিষয়টি অনেকটা ফ্লাইট সিমুলেটরের মতো। ধরো, তুমি একটি ফ্লাইট সিমুলেটরে বসে ঝড়ের মধ্যে বিমান চালানো বা জরুরি অবতরণের অভিজ্ঞতা নিলে। কিন্তু তুমি বাস্তবে আকাশে উড়ছ না। ঠিক তেমনি এই গবেষণায়ও বাস্তব সময় ভ্রমণ ঘটেনি; বরং সময়ের একটি কাল্পনিক বন্ধ পথ থাকলে কোয়ান্টাম কণা কীভাবে আচরণ করতে পারে, সেটিই পরীক্ষাগারে অনুকরণ করা হয়েছে। তারপরও গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যে প্রশ্নটি আগে মূলত সমীকরণ ও চিন্তানিরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেটির অন্তত একটি তাত্ত্বিক মডেল পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু সময় ভ্রমণের রহস্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কোয়ান্টাম জগতে তথ্য নিয়ে কাজ করার কিছু কঠোর নিয়ম রয়েছে। যেমন, একটি সম্পূর্ণ অজানা quantum state-এর নিখুঁত কপি তৈরি করা যায় না—এটি no-cloning theorem নামে পরিচিত। আবার কিছু quantum state এতটাই কাছাকাছি হতে পারে যে সাধারণ quantum mechanics-এর নিয়মে তাদের শতভাগ নিশ্চিতভাবে আলাদা করা সম্ভব নয়। কিন্তু Deutsch-এর Closed Timelike Curve-এর মতো ব্যবস্থা সত্যিই যদি প্রকৃতিতে থাকে, তাহলে quantum information processing-এর এসব পরিচিত সীমাবদ্ধতার কিছু বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ সময় ভ্রমণ নিয়ে একটি আপাতদৃষ্টিতে কল্পবিজ্ঞানের প্রশ্ন আমাদের শেষ পর্যন্ত quantum computing, information theory এবং causality বা কার্যকারণের মতো মৌলিক বিষয়েও নিয়ে যায়।

তাহলে কি তুমি একদিন সত্যিই টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে যেতে পারবে? এখন পর্যন্ত তার কোনো প্রমাণ নেই। সাধারণ আপেক্ষিকতার কিছু সমীকরণ Closed Timelike Curve-এর সম্ভাবনা দেখালেও বাস্তব মহাবিশ্বে এমন পথ আদৌ তৈরি হতে পারে কি না আমরা জানি না। এমনও হতে পারে, প্রকৃতির আরও কোনো মৌলিক নিয়ম সময়ের এই ধরনের লুপকে তৈরি হতেই দেয় না। স্টিফেন হকিং এ প্রসঙ্গে “chronology protection” ধারণা দিয়েছিলেন—প্রকৃতি হয়তো এমনভাবেই কাজ করে যে অতীতে ফিরে গিয়ে কারণ ও ফলের স্বাভাবিক সম্পর্ককে এলোমেলো করে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না। তাই “হয়তো বন্দুক কাজ করবে না” বা “হয়তো তুমি শেষ মুহূর্তে মত বদলে ফেলবে”—এ ধরনের উদাহরণকে বাস্তব ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নেওয়া ঠিক নয়; এগুলো শুধু self-consistency ধারণাটি সহজে বোঝানোর উপায়।
তবু গল্পটির সবচেয়ে মজার দিক সম্ভবত এখানেই। একটি প্রায় হাস্যকর শোনানো প্রশ্ন—“আমি যদি অতীতে গিয়ে নিজের দাদাকে মেরে ফেলি, তাহলে কী হবে?”—তোমাকে নিয়ে যেতে পারে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর কিছু প্রশ্নের কাছে। সময় কি সত্যিই শুধু সামনের দিকে চলে? অতীত কি একেবারেই অপরিবর্তনীয়? কারণ কি সবসময় ফলের আগে আসতেই হবে? Space-time কি এতটাই বাঁকতে পারে যে ভবিষ্যৎ গিয়ে অতীতকে স্পর্শ করবে? আর যদি তা পারে, quantum mechanics কি এমন কোনো উপায়ে ঘটনাগুলোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখবে, যাতে বাস্তবতা নিজের সঙ্গেই বিরোধে না জড়ায়? এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই। তবে এ ধরনের গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর আবিষ্কারের শুরু কখনো কখনো এমন একটি প্রশ্ন থেকেই হয়, যেটিকে প্রথম শুনলে নিছক কল্পকাহিনি বলে মনে হয়।
তথ্যসূত্রঃ https://www.scientificamerican.com/article/time-travel-simulation-resolves-grandfather-paradox

Leave a comment