উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগগবেষণার প্রথম পদক্ষেপ

প্রকাশনার সংখ্যা নয়, গবেষণার সততাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি

Share
Share

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মর্যাদা শুধু তার ভবন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বা প্রকাশিত গবেষণাপত্রের পরিমাণে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় তার জ্ঞানচর্চার মান, গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকারে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য শুধু নতুন তথ্য প্রকাশ নয়, বরং এমন নির্ভরযোগ্য জ্ঞান সৃষ্টি করা, যা সমাজ, বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখে। ঠিক এই মর্যাদার প্রশ্ন থেকেই একটি জরুরি প্রশ্ন সামনে আসে। যেভাবে সংখ্যাভিত্তিক গবেষণা প্রকাশ হয় সেই হারে কি এর সততা ও নৈতিক মান নিশ্চিত করা হয়?

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার আগ্রহ, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা গত কয়েক বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জড়িয়ে আছে—গবেষণার পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণার সততা ও নৈতিক মান বজায় থাকছে? গবেষণার সততা (Research Integrity) হলো গবেষণার প্রতিটি পর্যায়ে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি। গবেষণা পরিকল্পনা, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, ফলাফল প্রকাশ, লেখকত্ব নির্ধারণ এবং তথ্য সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই এই নৈতিক ভিত্তি অপরিহার্য।

চৌর্যবৃত্তি: শুধু কপি-পেস্ট নয়

চৌর্যবৃত্তি (Plagiarism) গবেষণার একটি গুরুতর নৈতিক সমস্যা। এটি শুধু অন্যের লেখা সরাসরি নকল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎস উল্লেখ না করে অন্যের ধারণা ব্যবহার, সামান্য পরিবর্তন করে মূল বক্তব্য নিজের নামে প্রকাশ, কিংবা নিজের পূর্বপ্রকাশিত কাজ যথাযথভাবে উল্লেখ না করে পুনর্ব্যবহার করাও গবেষণা নৈতিকতার লঙ্ঘন। তবে গবেষণা অসততার পরিধি আরও বিস্তৃত। তথ্য তৈরি করা (Fabrication), তথ্য বিকৃত করা (Falsification), কিংবা প্রকৃত অবদান ছাড়াই লেখক হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করাও গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অর্থাৎ Plagiarism হলো গবেষণা অসততার একটি সুপরিচিত রূপ মাত্র—পুরো চিত্র নয়।

প্রকাশনার সংখ্যা নয়, গবেষণার মান

চৌর্যবৃত্তি ও তথ্য বিকৃতির মতো অসদাচরণের পেছনে প্রায়ই একটি কাঠামোগত চাপ কাজ করে—প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। বর্তমান একাডেমিক পরিবেশে প্রকাশনার সংখ্যা অনেক ক্ষেত্রে সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান এবং প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নে প্রকাশনার ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যখন সংখ্যার প্রতিযোগিতা গবেষণার গুণগত মানকে ছাপিয়ে যায়, তখন একটি ঝুঁকিপূর্ণ সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে—যেখানে দ্রুত প্রকাশের চাপ গবেষককে শর্টকাট নিতে প্ররোচিত করে।

গবেষণার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত এর মৌলিকত্ব, বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব, পুনরুৎপাদনযোগ্যতা (Reproducibility) এবং সমাজে এর প্রভাবের মাধ্যমে। বেশি প্রকাশনার চেয়ে ভালো ও বিশ্বাসযোগ্য গবেষণাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। এই চাপ যে বাস্তব, তার প্রমাণ মেলে সংখ্যাতেই। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কোপাস-ইনডেক্সড প্রকাশনার সংখ্যা গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে—কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক প্রকাশনা ২০২০ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় তিনগুণ হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি নিজে থেকে দোষের কিছু নয়, বরং ইতিবাচক। কিন্তু সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে যদি একই হারে গুণগত যাচাই, পিয়ার রিভিউয়ের কড়াকড়ি এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি না বাড়ে, তাহলে এই প্রবৃদ্ধিই একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

গবেষণায় অবদান ও স্বীকৃতির নৈতিকতা

গবেষণা সততার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রকৃত অবদানকারীদের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান। গবেষণার ধারণা, তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষামূলক কাজ, বিশ্লেষণ বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় যাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তাঁদের অবদান সঠিকভাবে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় গবেষণা নৈতিকতার আলোচনায় Plagiarism-এর বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়, কিন্তু Authorship-এর স্বচ্ছতা এবং অবদানের ন্যায্য স্বীকৃতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার শুরুতেই প্রত্যেক সদস্যের ভূমিকা ও লেখকত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করা, গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণ করা এবং গবেষণার ধারাবাহিক রেকর্ড রাখা একটি সুস্থ গবেষণা সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ।

দীর্ঘদিন গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক গবেষণা-সংক্রান্ত বিরোধের সূত্রপাত হয় প্রকল্পের শুরুতেই ভূমিকা ও লেখকত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করার কারণে। গবেষণা শুরুর সময় প্রত্যেক সদস্যের অবদান, লেখকত্বের মানদণ্ড এবং সম্ভাব্য নামের ক্রম লিখিতভাবে নির্ধারণ করা ভবিষ্যতের ভুল বোঝাবুঝি ও বিরোধ অনেকাংশে প্রতিরোধ করতে পারে।

কারণ গবেষণায় স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য ন্যায়, আস্থা এবং পেশাগত সততার ভিত্তি তৈরি করে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা

আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিবেশে গবেষণা সততাকে শুধু নিয়ম বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয় না; এটি বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষের অপরিহার্য অংশ। যেমন, কানাডায় গবেষণা সততার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় কাঠামো রয়েছে, যা গবেষণা তহবিল প্রদানকারী প্রধান সংস্থাগুলোর যৌথ নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—যেখানে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া, স্পষ্ট রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষণ কাঠামো বজায় রাখতে হয়। এ ধরনের কাঠামোগত ব্যবস্থা গবেষণা অসদাচরণকে শুধু ব্যক্তিগত দোষ হিসেবে না দেখে একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি করে।

বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা নৈতিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, তথ্য ব্যবস্থাপনার নীতি এবং গবেষণা অসদাচরণ তদন্তের জন্য স্বাধীন ব্যবস্থা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (Retraction), তথ্যের অসঙ্গতি এবং অনৈতিক গবেষণা অনুশীলন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা একটি প্রবাহমান প্রক্রিয়া। এসব প্রক্রিয়া গবেষকদের দেখায় গবেষণায় আস্থা অর্জন করতে কত দীর্ঘ সময় লাগে, কিন্তু একটি অনৈতিক কর্মকাণ্ড সেই আস্থাকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

 উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডার গবেষণা প্রক্রিয়া,  প্রশিক্ষণ বা নীতিমালার অন্যতম, পিয়ার রিভিউ (Peer Review) পদধতি জা তাদের একাডেমিক জার্নালগুলোর অন্যতম মৌলিক মানদণ্ড—কোনো গবেষণা প্রকাশের আগে স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের যাচাই ছাড়া তা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এর পাশাপাশি হেলথ কানাডার (Health Canada) মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ওষুধ বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত গবেষণার ক্ষেত্রে জমা দেওয়া তথ্য-উপাত্তের কঠোর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন করে থাকে, তবেই সেই তথ্য গবেষণা বা প্রয়োগের জন্য গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ শুধু জার্নালে প্রকাশ হওয়াই যথেষ্ট নয়—তথ্যের যাচাইযোগ্যতা, স্বাধীন পর্যালোচনা এবং নিয়ন্ত্রক মূল্যায়নই একটি গবেষণার প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে।

এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের একটি সাম্প্রতিক অনুসন্ধান আমাদের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে আসতে পারে। এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের গবেষকদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটাই চূড়ান্ত সংখ্যা নয়—আরও গবেষণা প্রত্যাহার হয়ে থাকতে পারে। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (পিয়ার রিভিউ জালিয়াতি), তথ্য ও ফলাফলের অসংগতি, চৌর্যবৃত্তি, একই তথ্যের পুনর্ব্যবহার এবং কিছু ক্ষেত্রে  লেখকত্ব বেচাকেনার (পেপার মিল) সংশ্লিষ্টতাও। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক হিসাবে এই ৩২৫টি গবেষণার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জড়িত রয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (৪৪টি), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (৪২টি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (৩২টি), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (২১টি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০টি)-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষকেরা—অর্থাৎ সমস্যাটি কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা বিভাগের নয়, বরং ছড়িয়ে আছে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো জবাবদিহির অভাব: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো গবেষকের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ উঠলে তদন্তের দায়িত্ব প্রথমত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের—ইউজিসি তখনই হস্তক্ষেপ করে, যখন বিশ্ববিদ্যালয় নিজে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। বাস্তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালাই এখনো নেই। ফলে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শাস্তি বড়জোর মৌখিক সতর্কতায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এই প্রবণতা একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত—গবেষণার সংখ্যা বাড়লেও, তার সততা, স্বাধীন পর্যালোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে সেই অগ্রগতি টেকসই হয় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের গবেষকদের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

নতুন চ্যালেঞ্জ: Questionable Research Practices

গবেষণা সততার ক্ষেত্রে এখন শুধু প্রকাশ্য চৌর্যবৃত্তি নয়, বরং Questionable Research Practices (QRP) বা সন্দেহজনক গবেষণা অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। এর মধ্যে রয়েছে সুবিধাজনক ফলাফল বেছে প্রকাশ করা, নেতিবাচক ফলাফল উপেক্ষা করা, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে ফলাফল অতিরঞ্জিত মনে হয়, কিংবা প্রকৃত অবদান ছাড়াই কাউকে লেখক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। এই অনুশীলনগুলো প্রকাশ্য অসততার মতো স্পষ্ট নয় বলেই এগুলো শনাক্ত করা ও প্রতিরোধ করা অনেক সময় বেশি কঠিন।

নতুন চ্যালেঞ্জ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গবেষকের দায়িত্ব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য বিশ্লেষণ বা ভাষাগত সহায়তায় AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে AI কখনো গবেষকের নৈতিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। তথ্যের সত্যতা যাচাই, উৎসের যথার্থতা নিশ্চিত করা এবং ব্যবহারে স্বচ্ছ থাকা গবেষকের দায়িত্ব। AI-উৎপাদিত তথ্য, বিশ্লেষণ বা রেফারেন্স যাচাই করার দায়িত্ব সবসময় গবেষকেরই থেকে যায়—প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক না কেন, দায়বদ্ধতা হস্তান্তরযোগ্য নয়।

Open Science: স্বচ্ছ গবেষণার ভবিষ্যৎ

গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে উন্মুক্ত বিজ্ঞান (Open Science) একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। গবেষণার পদ্ধতি, তথ্য এবং বিশ্লেষণ যথাসম্ভব স্বচ্ছ রাখলে অন্য গবেষকেরা ফলাফল যাচাই ও পুনরুৎপাদন করতে পারেন। এতে গবেষণার মান উন্নত হয় এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আরও শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল, গবেষণা-তথ্য (Data), বিশ্লেষণ, ডকুমেন্ট এবং অন্যান্য গবেষণা-নথি তারিখসহ সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। প্রয়োজন হলে Preprint বা Institutional Repository-তে কাজের একটি time-stamped রেকর্ড সংরক্ষণ গবেষণার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে এবং গবেষকের অবদানের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর করণীয়

গবেষণা সততার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:

1. প্রশিক্ষণ চালু করা -স্নাতকোত্তর পর্যায় থেকেই গবেষণা নৈতিকতা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রকাশনা নীতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।

2. নীতিমালা ও তদন্ত ব্যবস্থা – বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর গবেষণা সততা নীতিমালা এবং স্বচ্ছ তদন্ত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা প্রত্যাহার (Retraction) হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালাই নেই-এই শূন্যতা অবিলম্বে পূরণ করা প্রয়োজন।  

3. মূল্যায়নের মানদণ্ড পুনর্বিবেচনা -গবেষকদের মূল্যায়নে শুধু প্রকাশনার সংখ্যা নয়; গবেষণার মান, মৌলিকত্ব এবং সামাজিক প্রভাবকে গুরুত্ব দিতে হবে।

4. নৈতিক নেতৃত্ব – গবেষণা-পরামর্শদাতা ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের নৈতিক নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন গবেষকেরা শুধু বই থেকে নয়, গবেষণা সংস্কৃতি থেকেও শেখেন।

5. নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা – গবেষণা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গবেষকেরা প্রয়োজনে নির্ভয়ে বিষয়গুলো উত্থাপন করতে পারেন।

গবেষণার সংস্কৃতি পরিবর্তনের আহ্বান

গবেষণার সততা প্রতিষ্ঠা কোনো একক নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে সততা, স্বচ্ছতা এবং বৈজ্ঞানিক কৌতূহল হবে গবেষণার মূল চালিকাশক্তি। একটি সুস্থ গবেষণা সংস্কৃতিতে ভুলকে লুকিয়ে রাখা নয়, বরং স্বীকার করে শেখার সুযোগ তৈরি করা হয়—কারণ বিজ্ঞান এগিয়ে যায় প্রশ্ন, যাচাই এবং সংশোধনের মাধ্যমে। 

সব শেষে 

বাংলাদেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় এগিয়ে যেতে চায়। এই যাত্রায় গবেষণা অবকাঠামোর পাশাপাশি গবেষণার সততাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সাফল্য শুধু কতগুলো গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না—প্রশ্ন হওয়া উচিত, এই গবেষণা কতটা বিশ্বাসযোগ্য, কতটা নৈতিক এবং কতটা মানবকল্যাণে অবদান রাখছে। ভবিষ্যতের জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে শুধু বেশি গবেষণায় নয়, বরং সত্যনিষ্ঠ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য গবেষণার ওপর।

লেখক: সরকার এম শাহীন,
গবেষক, নিউরোজেনেটিকস অ্যান্ড প্রিসিশন মেডিসিন, ডিপার্টমেন্ট অব সাইকাইয়াট্রি,   ফার্মাকোলজি অ্যান্ড মেডিকেল জেনেটিকস, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি, কানাডা।  

সদস্য, বাংলাদেশ ডায়াসপোরা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ফোরাম

গুগল স্কলার: https://scholar.google.com/citations?user=lRaMZlsAAAAJ&hl=en
লিংকডইন: 
https://www.linkedin.com/in/sarker-m-shaheen-a656b56

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles