মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম
একটি জাতি কতটা এগিয়ে যাবে, তা শুধু তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামো দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় সে জাতির তরুণেরা কতটা প্রশ্ন করতে শেখে, কতটা যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারে এবং কতটা সাহস নিয়ে অজানার উত্তর খুঁজতে এগিয়ে আসে। আমরা প্রায়ই তরুণদের দেশের ভবিষ্যৎ বলি। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে যদি বিজ্ঞানমনস্ক, অনুসন্ধিৎসু ও উদ্ভাবনী করে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে এই কথাটি কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞানের উপস্থিতি আছে, কিন্তু বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য সূত্র মুখস্থ করে, সংজ্ঞা শেখে, নির্দিষ্ট প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর লিখে। কিন্তু বিজ্ঞান তো নির্দিষ্ট উত্তরের বিদ্যা নয়; বিজ্ঞান হলো সঠিক প্রশ্ন করার অভ্যাস। “কেন?”, “কীভাবে?”, “এর প্রমাণ কী?”, “অন্য কোনো ব্যাখ্যা সম্ভব কি?”—এই প্রশ্নগুলো না থাকলে বিজ্ঞান শিক্ষা শেষ পর্যন্ত মুখস্থবিদ্যায় পরিণত হয়। আর মুখস্থবিদ্যা কখনো উদ্ভাবনী সমাজ তৈরি করতে পারে না।
আমাদের বড় সংকট হলো—আমরা প্রশ্নকারী তরুণ চাই, কিন্তু প্রশ্ন সহ্য করার সংস্কৃতি তৈরি করতে পারিনি। অনেক পরিবারে প্রশ্নকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়, অনেক শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের বাইরে প্রশ্নকে সময়ের অপচয় মনে করা হয়, আবার অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে চিন্তা করার প্রয়োজনই অনুভব করে না। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে। কারণ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির শুরু হয়েছিল এমন একটি প্রশ্ন দিয়ে, যা একসময় অস্বস্তিকর, অপ্রয়োজনীয় কিংবা অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল।
বিজ্ঞানচর্চার জন্য সবসময় বড় গবেষণাগার, ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কিংবা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখা। একটি স্কুলের শিক্ষার্থী স্থানীয় পুকুরের পানির মান নিয়ে কাজ করতে পারে, প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যা পর্যবেক্ষণ করতে পারে, একটি ছোট সৌরশক্তি প্রকল্প তৈরি করতে পারে কিংবা নিজের এলাকার জীববৈচিত্র্য নথিভুক্ত করতে পারে। এসব কাজ হয়তো বিশ্ববদলে দেওয়া গবেষণা নয়, কিন্তু এগুলো তরুণ মনের ভেতরে গবেষণার যে বীজ বপন করে, তার মূল্য অনেক বড়।
এই সময়ের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের বিস্ফোরণ। তরুণেরা আজ আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় বেশি তথ্যের নাগাল পাচ্ছে, কিন্তু সব তথ্য জ্ঞান নয়, আর সব জনপ্রিয় বক্তব্য বিজ্ঞান নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল চিকিৎসা, অপবিজ্ঞান, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও অর্ধসত্য প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় বিজ্ঞানচর্চা শুধু গবেষক তৈরির জন্য প্রয়োজন নয়; প্রয়োজন সচেতন নাগরিক তৈরির জন্যও। একজন বিজ্ঞানমনস্ক তরুণ কোনো দাবি শুনেই বিশ্বাস করবে না; সে প্রমাণ চাইবে, উৎস যাচাই করবে, তুলনা করবে এবং প্রয়োজন হলে নিজের আগের ধারণাও বদলে নেবে।
তাই আমাদের লক্ষ্য শুধু বেশি সংখ্যক বিজ্ঞানী তৈরি করা হওয়া উচিত নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি প্রজন্ম, যারা বিজ্ঞানকে জীবনবোধের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে। সবাই গবেষক হবে না, কিন্তু প্রত্যেকেই যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে শিখতে পারে। সবাই পরীক্ষাগারে কাজ করবে না, কিন্তু প্রত্যেকেই গুজব আর প্রমাণের পার্থক্য বুঝতে পারে। সবাই নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করবে না, কিন্তু প্রত্যেকেই প্রযুক্তির সামাজিক ও নৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
তরুণদের বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী করতে হলে পরিবার, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সব পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। বিজ্ঞান মেলাকে আনুষ্ঠানিকতা নয়, অনুসন্ধানের জায়গা করতে হবে। গবেষণাগারকে শুধু গবেষকের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার জায়গা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকে শুধু ডিগ্রি বা প্রকাশনার সংখ্যায় মাপলে চলবে না; তরুণদের বাস্তব সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। আর বিজ্ঞানী ও গবেষকদেরও গবেষণাপত্রের সীমানা পেরিয়ে সাধারণ মানুষের ভাষায় নিজেদের কাজ ব্যাখ্যা করতে হবে।
বিশেষ করে আমাদের দেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে—জলবায়ু পরিবর্তন, পানি ও পরিবেশদূষণ, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি সংকট, জনস্বাস্থ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগরায়ণ—এসবের সমাধান শুধু বিদেশ থেকে আমদানি করা প্রযুক্তিতে হবে না। আমাদের নিজেদের বাস্তবতা বোঝা, স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সেখান থেকে সমাধান তৈরি করা প্রয়োজন। আর সেই কাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে আজকের তরুণ প্রজন্ম।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার তরুণদের হাতে—এই কথা আমরা বহুবার বলেছি। এখন প্রয়োজন কথাটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। তাদের শুধু ভালো ফল করার চাপ না দিয়ে ভালো প্রশ্ন করার সাহস দিতে হবে। শুধু চাকরির জন্য প্রস্তুত না করে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। শুধু উত্তর শেখানো নয়, অজানাকে অনুসন্ধান করার আনন্দ শেখাতে হবে।
কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবী তাদেরই হবে, যারা শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না, প্রযুক্তি তৈরি করবে; যারা শুধু তথ্য গ্রহণ করবে না, তথ্য যাচাই করবে; যারা শুধু সমস্যার কথা বলবে না, তার বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজবে। আর সেই ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুরু করতে হবে এখনই—তরুণদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, পরীক্ষা করার সুযোগ এবং বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।

Leave a comment