অন্যান্য

তথ্যহীনতার অন্ধকারে পরিবেশনীতি: জাতীয় ডাটাবেস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্দেশিকার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের আসন্ন মহাবিপর্যয়

Share
Share

পরিবেশ সুরক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের শক্তি এবং পদ্ধতিগত নজরদারির গুরুত্ব বিশ্বজুড়ে আজ সর্বজনস্বীকৃত। উন্নত দেশগুলোতে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো যে নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে কাজ করে, তার মূল ভিত্তি হলো নিয়মিত সংগ্রহ করা নিখুঁত বৈজ্ঞানিক তথ্য। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশগত দূষণ নিয়ন্ত্রণের চিত্রটি এক গভীর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সারা দেশে দূষণের প্রকৃত চিত্র কেমন, মাটিতে বা খাদ্য শৃঙ্খলে কোন বিষাক্ত উপাদান কী পরিমাণে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তা মানবদেহের জন্য কতটা ক্ষতিকর—এ সংক্রান্ত কোনো সমন্বিত জাতীয় ডাটাবেস বা স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন নির্দেশিকা সরকারি পর্যায়ে নেই। এই পদ্ধতিগত তথ্যশূন্যতার কারণে রাষ্ট্র দূষণের সুনির্দিষ্ট উৎস ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে পারছে না, যা পরিবেশ নীতি প্রণয়ন এবং তা প্রয়োগের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অচল করে দিয়েছে। এই শাসনতান্ত্রিক ও তথ্যগত পঙ্গুত্ব যদি অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।

উন্নত বিশ্বের পরিবেশ সুরক্ষায় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক কাঠামো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (US EPA) ১৯৮৩ সালে ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিল (NRC) কর্তৃক প্রস্তাবিত একটি ঐতিহাসিক ঝুঁকি মূল্যায়ন নির্দেশিকা অনুসরণ করে দূষক নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই প্রক্রিয়ার চারটি সুনির্দিষ্ট পর্যায় রয়েছে: ক্ষতিকারক উপাদান চিহ্নিতকরণ, মাত্রা-প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন, এক্সপোজার বা সংস্পর্শ মূল্যায়ন, এবং ঝুঁকির বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ।

ইপিএ-এর ‘ইন্টিগ্রেটেড রিস্ক ইনফরমেশন সিস্টেম’ (IRIS) হলো বিভিন্ন রাসায়নিকের বিষাক্ততার বৈজ্ঞানিক তথ্যের প্রধান জাতীয় ভাণ্ডার। যদিও এটি নিজেই কোনো সরাসরি আইন প্রণয়ন করে না, তবে এর দ্বারা নির্ধারিত বিষাক্ততার মানদণ্ড বা রেফারেন্স ডোজ (RfD) এবং ক্যানসার স্লোপ ফ্যাক্টর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ও স্টেট পর্যায়ের নীতিনির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যেমন—সুপারফান্ড সাইটের মাটি ও পানি পরিষ্কারের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ বা ‘সেফ ড্রিংকিং ওয়াটার অ্যাক্ট’-এর আওতায় জনস্বাস্থ্যের মানদণ্ড নির্ধারণে আইআরআইএস-এর তথ্য ব্যবহৃত হয়।

একইভাবে, পরিবেশগত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে ‘টক্সিকস রিলিজ ইনভেন্টরি’ (TRI) এবং ‘পলিউট্যান্ট রিলিজ অ্যান্ড ট্রান্সফার রেজিস্টার’ (PRTR) অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এই ব্যবস্থার অধীনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর কী পরিমাণ বিষাক্ত রাসায়নিক বায়ু, পানি ও মাটিতে নির্গত করছে এবং বর্জ্য হিসেবে অন্যত্র স্থানান্তর করছে, তার বিশদ বিবরণ সরকারকে জানাতে বাধ্য থাকে এবং এই তথ্য সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। “তথ্যের উন্মোচনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ” নীতিটি বিশ্বজুড়ে দূষণ প্রতিরোধে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এটি একদিকে যেমন বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষকে কোম্পানির পরিবেশগত মানদণ্ড মূল্যায়নের সুযোগ দেয়, অন্যদিকে কোম্পানিগুলোকে স্বপ্রণোদিত হয়ে দূষণ কমাতে বাধ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রিনহাউস গ্যাস রিপোর্টিং প্রোগ্রামের আওতায় ডেটা প্রকাশের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নির্গমন প্রায় ৭.৯% হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সরকার ১৯৯৭ সালের পুরোনো বিধিমালা বাতিল করে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ চালু করেছে। এই নতুন বিধিমালায় শিল্পকারখানাগুলোকে তাদের পরিবেশগত প্রভাবের ভিত্তিতে সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল—এই চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে লাল এবং কিছু কমলা শ্রেণির শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নতুন বিধিমালায় টেক্সটাইল ও রং করার (ডাইং) কারখানার তরল বর্জ্যের জন্যও কিছু নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, বর্জ্য পানিতে COD-এর সর্বোচ্চ সীমা ২০০ মিগ্রা/লিটার এবং BOD₅-এর সীমা ১০০ মিগ্রা/লিটার থেকে কমিয়ে ৩০ মিগ্রা/লিটার করা হয়েছে। এছাড়া বর্জ্য পানির pH ৬ থেকে ৯-এর মধ্যে থাকতে হবে এবং এর তাপমাত্রা যে জলাশয়ে ফেলা হবে তার তাপমাত্রার চেয়ে সর্বোচ্চ ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারবে। ভারী ধাতুর ক্ষেত্রেও সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যেমন সীসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট ও নিকেলের সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

তবে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এসব নিয়ম মূলত কারখানার বর্জ্য নির্গমনস্থলের পানির মান নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মাটিতে বর্জ্য জমা হওয়ার ফলে যে দূষণ ভূগর্ভস্থ পানিতে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে, তা মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশে এখনো কোনো জাতীয় মাটির গুণগত মান নির্দেশিকা নেই। তেমনি মাটি, ফসল বা খাদ্যে থাকা ভারী ধাতু ও অন্যান্য দূষকের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা হতে পারে, তা নির্ধারণের জন্যও কোনো সমন্বিত মানবস্বাস্থ্য ঝুঁকি মূল্যায়ন কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

ফলে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক তথ্য ও নির্দেশিকার অভাবে একটি বড় শূন্যতার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এই শূন্যতা পূরণ না হলে পরিবেশ দূষণের প্রকৃত মাত্রা ও এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হবে।

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে পরিবেশ দূষণের কোনো সমন্বিত বা হালনাগাদ সরকারি ডাটাবেস নেই। এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরের রাষ্ট্রীয় পরিবেশ প্রতিবেদনগুলোও প্রায়শই কয়েক দশক পূর্বের পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলোর কোনো নিয়মতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত উপাত্তের অস্তিত্ব নেই। এই তথ্যশূন্যতার ফলে সৃষ্ট সংকটগুলো শাসনব্যবস্থাকে পঙ্গু করে তুলছে:

  • দূষণের মূল উৎস চিহ্নিতকরণে ব্যর্থতা: মাটিতে বা পানিতে বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়লেও, কোনো ডাটাবেস না থাকায় সরকার নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না দূষণটি কোন শিল্প বা উৎস থেকে আসছে। ফলে জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় অত্যন্ত অনিয়মিত এবং খেয়ালখুশিমতো, যা পরিবেশ আইন প্রয়োগের বিশ্বাসযোগ্যতাকে নষ্ট করে।
  • পলিসি মেকিংয়ে কার্যকর ভূমিকার অভাব: বৈজ্ঞানিক তথ্য ছাড়া নীতি নির্ধারণ করা অন্ধের হাতি দর্শনের শামিল। বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ বা শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতিগুলো কেবল কিছু কাগজের দলিলে পরিণত হয়েছে, কারণ দূষণের পরিমাণ, গতিপথ এবং স্বাস্থ্যগত প্রভাবের সুনির্দিষ্ট ডাটা ছাড়াই এগুলো তৈরি করা হয়েছে।
  • সম্পদের অপচয় সমন্বয়হীনতা: বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে পরিবেশগত তথ্য আদান-প্রদানের কোনো সমন্বিত ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম নেই। ফলে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (WARPO), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজগুলোর মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় ঘটে না।
  • আন্তর্জাতিক সাহায্য পরিবেশগত অর্থায়নে অনগ্রসরতা: বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জলবায়ু ও পরিবেশগত অর্থায়ন অর্জনের জন্য প্রকল্পগুলোর প্রভাব নিরূপণে নির্ভরযোগ্য তথ্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে বাংলাদেশ গ্রিন ফাইন্যান্স এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না।

আর্সেনিক দূষণের মতো একটি জাতীয় সংকট দেখিয়েছে যে দীর্ঘদিন তথ্যের ঘাটতি থাকলে সমস্যার প্রকৃত ভয়াবহতা বোঝা যায় না। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন নদীতে ভারী ধাতু, কীটনাশক, ওষুধের অবশিষ্টাংশ, অ্যান্টিবায়োটিক, মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং PFAS-এর মতো “চিরস্থায়ী রাসায়নিক” (Forever Chemicals) শনাক্ত হওয়ার তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এসব গবেষণা বিচ্ছিন্ন এবং অঞ্চলভিত্তিক। জাতীয় পর্যায়ে কোনো সমন্বিত পরিবেশ দূষণ ডাটাবেস নেই, যেখানে দেশের পানি, মাটি ও বায়ুর দূষণ পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যাবে।

সীতাকুণ্ডের জাহাজ ভাঙা অঞ্চলে মাটির অত্যন্ত অম্লীয় পরিবেশের কারণে সীসা, ক্যাডমিয়াম এবং ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুগুলো মাটির অণুজীব ও এনজাইমের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে, যা মাটির উর্বরতাকে স্থায়ীভাবে নষ্ট করছে। কৃষিজমিতে শিল্পবর্জ্য মিশ্রিত পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার কারণে এই ধাতুগুলো ধান ও শাকসবজিতে প্রবেশ করছে, যা মানুষ ও পশুর যকৃৎ ও ফুসফুসে জমা হচ্ছে। টাঙ্গাইল জেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিত্যক্ত সীসা-এসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানার চারপাশের মাটিতে সীসার মাত্রা ছিল অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তবে আশার কথা হলো, সেখানে পদ্ধতিগত মাটি অপসারণ ও সয়েল ক্যাপিং করার পর মাটির সীসার মাত্রা ৯৬% হ্রাস পায় এবং স্থানীয় শিশুদের রক্তে সীসার গড় মাত্রা ২২.৬ µg/dL থেকে কমে ১৪.৮ µg/dL-এ নেমে আসে। এটি প্রমাণ করে যে, যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং বৈজ্ঞানিক হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করা যায়, তবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দেশজুড়ে এমন হাজার হাজার অনিয়ন্ত্রিত পরিত্যক্ত সাইট রয়েছে, যার কোনো তালিকা বা ডাটাবেস সরকারের কাছে নেই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশের জন্য অনেক দূষকের কোনো স্বাস্থ্যভিত্তিক নির্দেশিকা নেই। অর্থাৎ কোনো নদী বা পানিতে কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিক কত মাত্রা পর্যন্ত নিরাপদ আর কত মাত্রায় তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ—সেই তথ্যের অভাব রয়েছে। ফলে যখন কোনো গবেষণায় দূষক শনাক্ত হয়, তখন সেটি কতটা উদ্বেগের বিষয়, তা জাতীয় মানদণ্ডের আলোকে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তথ্য না থাকলে নীতিও কার্যকর হয় না। যদি সরকার না জানে কোন অঞ্চলে কী ধরনের দূষণ হচ্ছে, দূষণের উৎস কী, এবং কী হারে তা বাড়ছে, তাহলে দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়াও সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, কৃষিজমি অথবা নগর বর্জ্যকে দূষণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা গেলেও জাতীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে উৎস নির্ধারণ, দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যায়।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো একটি বিষয় অনেক আগেই বুঝেছে—”যা মাপা যায় না, তা নিয়ন্ত্রণও করা যায় না।” তাই তারা পরিবেশ পর্যবেক্ষণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। নদী, হ্রদ, ভূগর্ভস্থ পানি এবং বাতাসে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ, আধুনিক পরীক্ষাগার, উন্মুক্ত ডেটা প্ল্যাটফর্ম এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন তাদের নীতিনির্ধারণের মূল ভিত্তি। ফলে দূষণ সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই তারা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য অবিলম্বে নীতিগত পর্যায়ে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। গবেষক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি:

  • একটি জাতীয় পিআরটিআর (PRTR) ডাটাবেস প্রতিষ্ঠা: বাংলাদেশকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি জাতীয় পলিউট্যান্ট রিলিজ অ্যান্ড ট্রান্সফার রেজিস্টার (PRTR) গড়ে তুলতে হবে। বহুজাতিক পোশাক প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো যেমন এইচঅ্যান্ডএম (H&M) তাদের সরবরাহকারী কারখানায় রাসায়নিক নির্গমন ট্র্যাক করতে ব্যুরো ভেরিতাসের সহায়তায় “Ecube” (Environmental Emission Evaluator) নামক নিজস্ব পিআরটিআর মডেল ব্যবহার করছে। এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের শিল্প খাত প্রযুক্তিগতভাবে রিপোর্টিংয়ের জন্য প্রস্তুত। সরকার আইনগতভাবে সব কারখানার জন্য এই বার্ষিক নির্গমন রিপোর্ট প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে পারে।
  • সমন্বিত দূষণ মানচিত্র জিআইএস (GIS) বিশ্লেষণ: দেশের ভূগর্ভস্থ পানি, মাটি এবং বায়ুর মানের জন্য ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (GIS) ভিত্তিক ডিজিটাল দূষণ মানচিত্র প্রস্তুত করতে হবে। এটি পলিসি মেকারদের দূষণের হটস্পট বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো সনাক্ত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
  • মাটি খাদ্য শৃঙ্খলের জন্য জাতীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন: শুধু পানির জন্য নয়, কৃষিজমির মাটি এবং সাধারণ খাদ্যে ভারী ধাতুর গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে সুনির্দিষ্ট ‘ন্যাশনাল সয়েল কোয়ালিটি অ্যান্ড ফুড সেফটি গাইডলাইন’ তৈরি করতে হবে। এই কাজে পিওর আর্থ এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
  • পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়: পরিবেশ অধিদপ্তরের (DoE) জনবল ও বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরির আধুনিকায়ন করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন’ (BEST) প্রকল্প এবং এডিবির জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা সম্ভব।
  • কমিউনিটিভিত্তিক পর্যবেক্ষণ (CBM) জোরদারকরণ: শিল্পাঞ্চলগুলোর স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে রিয়েল-টাইম দূষণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই কমিউনিটি ডেটা বা স্থানীয় পর্যবেক্ষণ তথ্যকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মূল ডেটাবেসের সাথে যুক্ত করে পরিবেশগত অপরাধীদের তাৎক্ষণিক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার নাগরিকেরা সুস্থ বাতাস, নিরাপদ পানি এবং বিষমুক্ত মাটির নিশ্চয়তা পায়। বাংলাদেশ যদি তথ্যের এই ভয়াবহ ঘাটতি দূর করতে না পারে, তবে আমাদের নীতিনির্ধারণী অন্ধত্ব কখনো কাটবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং বৈজ্ঞানিক নির্দেশিকার অনুপস্থিতিতে দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যাবে এবং আমাদের কৃষিজমি, নদী ও জলাশয়গুলো চিরতরে মৃত হয়ে পড়বে। সময় এসেছে পরিবেশ সুরক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার সমতুল্য অগ্রাধিকার দেওয়ার। বৈজ্ঞানিক ডাটাবেস তৈরি, কঠোর পরিবেশ নীতি বাস্তবায়ন এবং দূষণকারীদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহিতার আওতায় আনার মাধ্যমেই কেবল এই আসন্ন মহাবিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব।

লেখক: ড. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ (Research Engineer, University of Alabama, USA)

ড. আবদুল্লাহ আল মাসুদ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ অ্যালাবামাতে ‘রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র হলো উদীয়মান দূষক (Emerging Contaminants) শনাক্তকরণ এবং মাটি ও পানি শোধনে আধুনিক প্রযুক্তির উদ্ভাবন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক (বিএসসি) ও স্নাতকোত্তর (এমএসসি) ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। তাঁর এ পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

Email: [email protected]; [email protected]
https://scholar.google.com/citations?hl=en&user=5PkBmLEAAAAJ&view_op=list_works

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ