পরিবেশ ও পৃথিবীবিজ্ঞানীদের জীবনী

“বিশ্বকে জানো, দেশের সমস্যাকেও বুঝো” – ড. মো. হাফিজুর রহমান

Share
Share

“বিশ্ব কী করছে তা জানতে হবে, কিন্তু নিজের দেশের সমস্যাও বুঝতে হবে; সত্যিকারের বিজ্ঞানী সেই, যে জ্ঞানকে মানুষের কাজে লাগাতে চায়।”

বিজ্ঞান কখনো শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না। আবার বিজ্ঞান শুধু বড় বড় গবেষণাগার, দামি যন্ত্রপাতি বা আন্তর্জাতিক জার্নালের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞানের আসল শক্তি তখনই বোঝা যায়, যখন তা মানুষের জীবন, সমাজের সমস্যা, দেশের প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকারে এই ভাবনাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি জাপানে পলিমার রসায়ন নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করেছেন। সেখানে তিনি আধুনিক ল্যাব, উন্নত গবেষণা-সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের পদ্ধতি এবং বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক পরিবেশ দেখেছেন। কিন্তু দেশে ফিরে তিনি শুধু জাপানের গবেষণার অনুকরণ করেননি। বরং তিনি ভাবতে শুরু করেন—বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যা কী? এই দেশের মানুষের জন্য, পরিবেশের জন্য, পানি ও মাটির নিরাপত্তার জন্য কোন গবেষণা সবচেয়ে বেশি জরুরি?

এই প্রশ্ন থেকেই তাঁর গবেষণার দিক আরও বাস্তবভিত্তিক হয়ে ওঠে।

জাপানে তিনি বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার, বিশেষ করে পলি-ল্যাকটিক অ্যাসিড নিয়ে কাজ করেছেন। পলি-ল্যাকটিক অ্যাসিড এক ধরনের পরিবেশবান্ধব পলিমার, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রাখে। উন্নত দেশগুলোতে এটি প্যাকেজিং, ওষুধশিল্প, এমনকি বায়োমেডিকেল কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে ফিরে তিনি দেখলেন, এই উপাদান সরাসরি ব্যবহার করা ব্যয়বহুল; পলিথিনের তুলনায় এর খরচ অনেক বেশি। তাই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি এখনো সহজে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য নয়।

এখানেই একজন গবেষকের আসল দৃষ্টি প্রয়োজন।

তিনি বুঝলেন, শুধু উন্নত দেশের গবেষণা জানা যথেষ্ট নয়; নিজের দেশের প্রয়োগযোগ্যতা বুঝতে হবে। যে প্রযুক্তি জাপানে কাজ করছে, সেটি একইভাবে বাংলাদেশে কাজ নাও করতে পারে। কারণ অর্থনীতি আলাদা, শিল্পব্যবস্থা আলাদা, পরিবেশগত সমস্যা আলাদা, অবকাঠামো আলাদা।

বাংলাদেশে শিল্পায়ন বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে ট্যানারি, ব্যাটারি, টেক্সটাইল, ডাইং ও অন্যান্য শিল্পকারখানার বর্জ্য। ট্যানারির আশপাশে ক্রোমিয়াম, ব্যাটারি শিল্পের আশপাশে সীসা, শিল্পাঞ্চলের পানিতে ভারী ধাতু—এসব শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ও। দূষিত পানি নদী, মাটি, খাদ্যশৃঙ্খল ও মানুষের শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে।

এই বাস্তবতা বিবেচনা করে ড. হাফিজুর রহমান বায়োডিগ্রেডেবল পলিমারকে পানি শোধনের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি বায়োডিগ্রেডেবল কম্পোজিট অ্যাডজরবেন্ট নিয়ে কাজ শুরু করেন—যে উপাদান পানি থেকে সীসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত ধাতু ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

অ্যাডজরবেন্ট শব্দটি কঠিন মনে হলেও ধারণাটি সহজ। যেমন একটি স্পঞ্জ পানি ধরে রাখতে পারে, তেমনি অ্যাডজরবেন্ট পানির ভেতর থাকা ক্ষতিকর পদার্থকে নিজের পৃষ্ঠে ধরে রাখতে পারে। পরে সেই উপাদান আলাদা করলে পানি তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব হয়। যদি এই ধরনের উপাদান প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি হয়, কম খরচে ব্যবহার করা যায় এবং পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ না ফেলে—তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই গবেষণার মধ্যেই আমরা বিজ্ঞানীর সামাজিক দায়বদ্ধতা দেখি।

একজন বিজ্ঞানী যদি শুধু আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য গবেষণা করেন, তাতে জ্ঞান বাড়ে। কিন্তু যদি তিনি সেই জ্ঞানকে মানুষের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করেন, তখন গবেষণা সমাজের সম্পদ হয়ে ওঠে। ড. হাফিজুর রহমানের কাজ এই দ্বিতীয় পথের উদাহরণ। তিনি বিশ্বমানের বিজ্ঞানকে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন।

তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য এখানেই বড় শিক্ষা আছে।

আজকের দিনে ইন্টারনেটের কারণে পৃথিবীর যেকোনো দেশের গবেষণা সম্পর্কে জানা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, চীন—সব জায়গার গবেষণাপত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, ল্যাব, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের খবর আমরা জানতে পারি। এটি অবশ্যই দরকার। একজন শিক্ষার্থীকে জানতে হবে বিশ্ব কোথায় যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, নতুন উপকরণ, বায়োটেকনোলজি, মেডিকেল টেকনোলজি, নবায়নযোগ্য শক্তি—এসব ক্ষেত্রে বিশ্বে কী হচ্ছে তা বোঝা জরুরি।

কিন্তু শুধু বিশ্বকে জানলেই হবে না।

একজন বাংলাদেশি তরুণ গবেষকের প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই জ্ঞান দিয়ে আমার দেশের কোন সমস্যা সমাধান করা যায়?

আমাদের নদী দূষণ কীভাবে কমানো যায়?

পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি কীভাবে শনাক্ত ও অপসারণ করা যায়?

কম খরচে পরিবেশবান্ধব উপাদান তৈরি করা যায় কি?

কৃষিতে, স্বাস্থ্যখাতে, শিল্পে, শিক্ষায় বিজ্ঞান কীভাবে কাজে লাগানো যায়?

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কোন প্রযুক্তি বাস্তবসম্মত?

এই প্রশ্নগুলো না করলে গবেষণা অনেক সময় দেশের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ড. হাফিজুর রহমানের সাক্ষাৎকারে শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতার ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিল্পকারখানার মধ্যে শক্তিশালী সম্পর্ক এখনো গড়ে ওঠেনি। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গবেষণাকে বিনিয়োগ হিসেবে না দেখে খরচ হিসেবে দেখে। ফলে ল্যাবের গবেষণা বাস্তব কারখানায় প্রয়োগের পথে বাধা তৈরি হয়। অথচ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, বর্জ্য শোধন, নতুন উপাদান, পানির নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের একসঙ্গে কাজ করা অত্যন্ত জরুরি।

এখানেও তরুণদের জন্য শিক্ষা আছে। ভবিষ্যতের গবেষককে শুধু ল্যাবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাকে শিল্প, সমাজ, নীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের প্রয়োজন বুঝতে হবে। বিজ্ঞানকে বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হলে যোগাযোগ, সহযোগিতা ও প্রয়োগক্ষমতা দরকার।

একজন সত্যিকারের বিজ্ঞানী তাই শুধু জানেন না; তিনি বোঝেন।

তিনি শুধু আবিষ্কার করেন না; তিনি ভাবেন, এই আবিষ্কার মানুষের কাজে লাগবে কীভাবে।

তিনি শুধু বিশ্বমানের গবেষণাপত্র পড়েন না; তিনি নিজের দেশের মাটি, পানি, বাতাস ও মানুষের জীবনও পড়েন।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এই বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে পড়ার স্বপ্ন দেখো, বিশ্বমানের গবেষণা করো, ভালো জার্নালে প্রকাশ করো—এসব অবশ্যই দরকার। কিন্তু নিজের দেশের সমস্যাকে ভুলে যেও না। কারণ বিজ্ঞানীর সবচেয়ে বড় সম্মান হলো মানুষের কাজে লাগা।

ড. হাফিজুর রহমানের পথচলা আমাদের দেখায়, আন্তর্জাতিক জ্ঞান ও দেশীয় প্রয়োজনের মিলনেই তৈরি হয় অর্থবহ গবেষণা। জাপানের গবেষণাগারের অভিজ্ঞতা তাঁকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের পানি, শিল্পবর্জ্য ও পরিবেশ দূষণের বাস্তবতা তাঁর গবেষণাকে দিয়েছে সামাজিক উদ্দেশ্য।

তাই তরুণদের জন্য তাঁর জীবন থেকে বার্তাটি স্পষ্ট—

বিশ্বকে জানো।

নিজের দেশকে বোঝো।

বিজ্ঞানের ভাষা শিখো।

মানুষের প্রয়োজনের ভাষাও শিখো।

কারণ সত্যিকারের গবেষণা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের জীবনকে নিরাপদ, সুন্দর ও টেকসই করতে সাহায্য করে।

তাঁর জীবন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকার :

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ

Related Articles

বিজ্ঞানী অর্গ দেশ বিদেশের বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের জীবন ও গবেষণার গল্পগুলি নবীন প্রজন্মের কাছে পৌছে দিচ্ছে।

Contact:

biggani.org@জিমেইল.com

সম্পাদক: মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম

Biggani.org connects young audiences with researchers' stories and insights, cultivating a deep interest in scientific exploration.

নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের ইমেইল নিউজলেটার, টেলিগ্রাম, টুইটার X, WhatsApp এবং ফেসবুক -এ সাবস্ক্রাইব করে নিন।

Copyright 2024 biggani.org