আজ আমরা যখন আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীদের মাসের পর মাস থাকার খবর শুনি, তখন সেটি স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছে বহু বছর আগের কিছু কঠিন ও সাহসী পরীক্ষা। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো নাসার জেমিনি–৭ (Gemini VII) মিশন। ১৯৬৫ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই মিশনটি উৎক্ষেপণ করে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল—মানুষ কি টানা দীর্ঘ সময় মহাকাশে, ওজনহীন পরিবেশে, সুস্থভাবে টিকে থাকতে পারে কি না, তা জানা।
জেমিনি–৭ মিশনে অংশ নেন দুইজন নভোচারী—ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান এবং জেমস এ. লাভেল জুনিয়র। তাঁরা প্রায় ১৪ দিনের কাছাকাছি সময়, নির্দিষ্টভাবে বললে ১৩ দিন ২২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট, মহাকাশে অবস্থান করেন। সে সময় পর্যন্ত কোনো মানুষ এত দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকেনি। এই কারণে জেমিনি–৭ ছিল মানব মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড।
এই মিশনের একটি বিশেষ দিক ছিল মহাকাশযানের আকার। জেমিনি মহাকাশযানের ভেতরের জায়গা ছিল মাত্র প্রায় ৫৫ ঘনফুট। সহজ করে বোঝালে, এটি একটি ছোট গাড়ির সামনের দুইটি আসনের সমান জায়গা। এই অল্প জায়গার ভেতরেই দুইজন মানুষকে প্রায় দুই সপ্তাহ বসবাস করতে হয়েছে। সেখানে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ ছিল না, শরীর পুরোপুরি সোজা করে পা মেলে দেওয়ার মতো জায়গাও ছিল না। অধিকাংশ সময় তাঁরা আধাশোয়া অবস্থায় বসে কাজ করতেন।

এই সীমিত জায়গার মধ্যে দৈনন্দিন জীবন ছিল বেশ কঠিন। খাওয়া, কাজ করা, বিশ্রাম নেওয়া—সবকিছুই করতে হতো একই জায়গায় বসে। মহাকাশযানের স্যানিটেশন বা বর্জ্য ব্যবস্থাও ছিল খুবই প্রাথমিক। মানবদেহ থেকে নির্গত বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হতো মহাকাশযানের ভেতরেই। বাতাস পরিশোধনের ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘ সময়ের কারণে ভেতরের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। এসব বিষয় শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ধারণা বোঝা দরকার। পৃথিবীতে আমরা মাধ্যাকর্ষণের কারণে সব সময় ওজন অনুভব করি। কিন্তু মহাকাশে সেই মাধ্যাকর্ষণ প্রায় না থাকায় শরীর ওজনহীন অবস্থায় থাকে। এই অবস্থায় মানুষের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা, পেশি এবং হাড় ভিন্নভাবে কাজ করতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছিলেন, এই পরিবর্তনগুলো কি মানুষের জন্য বিপজ্জনক কি না। জেমিনি–৭ মিশনের মাধ্যমে দেখা যায়, কিছু অস্বস্তি ও শারীরিক সমস্যা থাকলেও মানবদেহ দীর্ঘ সময় ওজনহীন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে।
এই মিশনের সময় কমান্ডার ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান একপর্যায়ে অসুস্থ বোধ করেছিলেন, যা নাসার নথিতে উল্লেখ আছে। তবুও তাঁরা মিশনটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। এটি নাসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। কারণ এরপরই নাসা চাঁদে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা আরও জোরালোভাবে এগিয়ে নিতে পারে।
জেমিনি–৭ মিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানসিক সহনশীলতা। দুইজন মানুষকে টানা প্রায় দুই সপ্তাহ খুব অল্প জায়গার মধ্যে থাকতে হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুযোগ ছিল প্রায় নেই বললেই চলে। এই অভিজ্ঞতা নাসাকে শেখায়, ভবিষ্যৎ মহাকাশ অভিযানে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের মানসিক প্রস্তুতিও কতটা জরুরি।
জেমিনি–৭ কোনো চাঁদে অবতরণের মিশন ছিল না, কোনো গ্রহে পতাকা গাড়ার ঘটনাও ঘটেনি। তবুও এই মিশন মানব মহাকাশ অভিযানের ভিত্তি তৈরি করেছে। এই অভিযানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে মানুষ দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকতে পারে এবং পৃথিবীতে নিরাপদে ফিরে আসতে পারে। পরবর্তীতে অ্যাপোলো মিশন এবং আরও দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ গবেষণার পথ তৈরি হয় এই জেমিনি–৭-এর মতো নীরব কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের মাধ্যমে।
মানব ইতিহাসে মহাকাশ জয়ের গল্প শুধু রকেট আর প্রযুক্তির গল্প নয়; এটি মানুষের শরীর, মন এবং সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াইয়ের গল্পও। জেমিনি–৭ সেই লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তথ্যসূত্র:
National Aeronautics and Space Administration (NASA), Gemini VII Mission Report, 1966

Leave a comment