পানি থেকে বিদ্যুৎ: হাইড্রোজেন প্রযুক্তির সহজ গল্প
“পানি ভেঙে আমরা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করি, আবার সেই হাইড্রোজেন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও পানি ফিরে পাই—এটাই এক ধরনের ক্লিন এনার্জি সাইকেল।”
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার এই কথাটি শুনলে প্রথমে মনে হতে পারে—পানি থেকে আবার বিদ্যুৎ কীভাবে তৈরি হয়? পানি তো আমরা পান করি, রান্না করি, কৃষিকাজে ব্যবহার করি। কিন্তু বিজ্ঞান যখন পানির অণুর ভেতরে তাকায়, তখন দেখা যায়, এই সাধারণ পানির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সম্ভাবনা।
পানির রাসায়নিক সংকেত H₂O। অর্থাৎ একটি পানির অণুতে থাকে দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণু। বিজ্ঞানীরা বিদ্যুতের সাহায্যে এই পানির অণুকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আলাদা করতে পারেন। এই প্রক্রিয়ার নাম ইলেকট্রোলাইসিস। সহজভাবে বললে, বিদ্যুতের সাহায্যে পানির ভেতরের দুই উপাদানকে আলাদা করে ফেলা।
এখানেই আসে ওয়াটার ইলেকট্রোলাইজার। এটি এমন একটি যন্ত্র, যার কাজ পানি ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করা। এই যন্ত্রে সাধারণত দুটি ইলেকট্রোড থাকে—অ্যানোড ও ক্যাথোড। মাঝখানে থাকে একটি বিশেষ মেমব্রেন, যা কিছু নির্দিষ্ট আয়নকে যেতে দেয়, কিন্তু ইলেকট্রনকে সরাসরি যেতে দেয় না। শুনতে জটিল মনে হলেও বিষয়টি এমন—একটি নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক পথ তৈরি করা হয়, যাতে পানি ভেঙে নিরাপদভাবে হাইড্রোজেন সংগ্রহ করা যায়।
এরপর সেই হাইড্রোজেন সংরক্ষণ করা যায়। যেমন আমরা গ্যাস সিলিন্ডারে এলপিজি রাখি, তেমনি বিশেষ ব্যবস্থায় হাইড্রোজেনও সংরক্ষণ করা যায়। পরে এই হাইড্রোজেন ব্যবহার করা যায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। তখন প্রয়োজন হয় ফুয়েল সেল নামের আরেকটি যন্ত্র।
ফুয়েল সেলকে খুব সহজভাবে এক ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী রাসায়নিক যন্ত্র বলা যায়। সাধারণ ব্যাটারির সঙ্গে এর কিছুটা মিল আছে, তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে। ব্যাটারি একসময় চার্জ শেষ করে ফেলে; কিন্তু ফুয়েল সেলে যতক্ষণ জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেন দেওয়া হবে, ততক্ষণ এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।
ফুয়েল সেলে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন প্রবেশ করানো হয়। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন ইলেকট্রন ছাড়ে। সেই ইলেকট্রন বাইরে একটি সার্কিট দিয়ে প্রবাহিত হয়, আর এই প্রবাহ থেকেই তৈরি হয় বিদ্যুৎ। শেষে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আবার মিলিত হয়ে পানি তৈরি করে। অর্থাৎ শুরুতে আমরা পানি ভেঙে হাইড্রোজেন পেয়েছিলাম, আবার শেষে সেই হাইড্রোজেন থেকে বিদ্যুৎ ও পানি ফিরে পেলাম।
এই কারণেই ড. রানা একে “ক্লিন এনার্জি সাইকেল” হিসেবে দেখেন। এখানে কয়লা পোড়ানো হচ্ছে না, তেল পোড়ানো হচ্ছে না, ধোঁয়া তৈরি হচ্ছে না। যদি পানি ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সৌরশক্তি বা বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও বেশি পরিবেশবান্ধব হয়ে ওঠে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো শক্তি সংরক্ষণ। ধরুন, দিনের বেলায় প্রচুর সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হলো, কিন্তু রাতের বেলায় সূর্য নেই। সেই অতিরিক্ত দিনের বিদ্যুৎ দিয়ে পানি ভেঙে হাইড্রোজেন তৈরি করে রাখা যায়। পরে রাতে সেই হাইড্রোজেন দিয়ে ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। অর্থাৎ হাইড্রোজেন এখানে শুধু জ্বালানি নয়; এটি শক্তি সংরক্ষণের একটি মাধ্যমও।
বাংলাদেশের মতো দেশে এই ধারণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আমাদের দেশে সূর্যালোক আছে, পানি আছে, আবার জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতাও আছে। ভবিষ্যতে যদি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি থেকে হাইড্রোজেন তৈরি করা যায়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্রামীণ শক্তি ব্যবস্থা, এমনকি শিল্পক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে বিষয়টি রাতারাতি বাস্তবে রূপ নেবে না। হাইড্রোজেন সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, উৎপাদন খরচ, যন্ত্রের দক্ষতা—সবকিছু নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার গবেষণা সেই পথেরই একটি অংশ। তিনি কাজ করছেন কীভাবে এই প্রযুক্তিকে আরও কার্যকর ও কম খরচের করা যায়, বিশেষ করে ব্যয়বহুল ধাতুর বদলে সাশ্রয়ী ক্যাটালিস্ট ব্যবহার করে।
পানি থেকে হাইড্রোজেন, হাইড্রোজেন থেকে বিদ্যুৎ, আবার শেষে পানি—এই চক্রটি শুধু একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার একটি স্বপ্ন।
ড. মোহাম্মদ মাসুদ রানার পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment