গবেষণাকে অনেক সময় আমরা সৃজনশীল, মুক্ত চিন্তার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি—যেখানে বিজ্ঞানীরা নিজের কৌতূহল থেকে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেন এবং তার উত্তর খোঁজেন। এই ধারণা সঠিক হলেও, বাস্তবে বড় গবেষণা কর্মসূচি পরিচালনা করা কেবল সৃজনশীলতার বিষয় নয়; এটি একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। ড. মোহাম্মদ আতাউল করিম তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে গবেষণা ব্যবস্থাপনাকে একটি “কন্ট্রোল সিস্টেম”-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই উপমার ভেতরে রয়েছে গবেষণা পরিচালনার একটি বাস্তব ও কার্যকর দর্শন।
কন্ট্রোল সিস্টেম বলতে প্রকৌশলে এমন একটি ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে কোনো প্রক্রিয়ার আউটপুট নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইনপুট বা নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন করে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো হয়। উদাহরণ হিসেবে ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী থার্মোস্ট্যাটের কথা বলা যায়—ঘর ঠান্ডা হলে হিটার চালু হয়, বেশি গরম হলে বন্ধ হয়। গবেষণা ব্যবস্থাপনাও অনেকটা তেমনই। প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা, সমস্যার জায়গায় সমন্বয় আনা এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পরিকল্পনা সামঞ্জস্য করা—এসবই এই ‘কন্ট্রোল সিস্টেম’-এর অংশ।
ড. করিমের নেতৃত্বাধীন গবেষণা পরিবেশে এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তব রূপ পেয়েছে। বড় গবেষণা কর্মসূচিতে বহু প্রকল্প একসঙ্গে চলতে থাকে। সব প্রকল্প সমান গতিতে এগোয় না; কোনোটি দ্রুত অগ্রসর হয়, কোনোটি মাঝপথে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এই অবস্থায় নেতৃত্বের কাজ হলো নিয়মিত ফিডব্যাক সংগ্রহ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ বণ্টন বা দিকনির্দেশনা সংশোধন করা। তাঁর মতে, একবার পরিকল্পনা করে তা অপরিবর্তিত রেখে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। গবেষণা একটি গতিশীল প্রক্রিয়া; তাই ব্যবস্থাপনাও হতে হবে নমনীয়।
এই উপমা গবেষণা দলের ভেতরের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো দলের সদস্য যদি প্রয়োজনীয় সহায়তা না পান বা কাজের চাপ অসমভাবে বণ্টিত হয়, তবে সামগ্রিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়। কন্ট্রোল সিস্টেমের মতোই এখানে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। ড. করিমের অভিজ্ঞতায়, নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে দলের সমস্যা শনাক্ত করা এবং সময়মতো সমাধান করা গেলে গবেষণা পরিবেশে আস্থা ও গতিশীলতা বজায় থাকে।
বাংলাদেশের গবেষণা ও শিক্ষা ব্যবস্থায় এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। অনেক সময় একটি প্রকল্প শুরু হওয়ার পর তার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকে না। ফলে সমস্যাগুলো বড় হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত প্রকল্প ব্যর্থ হয়। ড. করিমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, গবেষণাকে কেবল শুরু করাই যথেষ্ট নয়; তাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সঠিক পথে রাখা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত “গবেষণা ব্যবস্থাপনা একটি কন্ট্রোল সিস্টেমের মতো”—এই উপমাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সৃজনশীলতা ও শৃঙ্খলা একে অপরের বিপরীত নয়। বরং পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণ ও সময়োপযোগী সমন্বয়ের মাধ্যমেই গবেষণা তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে।
ড. মোহাম্মদ আতাউল করিমের পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি পড়ুন:

Leave a comment