গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: রিচার্ড ডকিন্সের ‘দ্য সেলফিশ জিন’ ও জীবনের জিন-কেন্দ্রিক ব্যাখ্যা

Share
Share

জীববিজ্ঞানে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব বহু আগেই প্রতিষ্ঠিত হলেও, বিবর্তন কীভাবে কাজ করে—তার ব্যাখ্যা নিয়ে বিশ শতকে নতুন করে গভীর চিন্তা শুরু হয়। এই আলোচনায় এক যুগান্তকারী বই হলো ব্রিটিশ বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স-এর ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘দ্য সেলফিশ জিন’ (The Selfish Gene)। বইটির শিরোনামই যেমন উসকানিমূলক, তেমনি এর মূল ধারণাও প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে—বিবর্তনের কেন্দ্রে ব্যক্তি বা প্রজাতি নয়, বরং জিন

ডকিন্সের মূল যুক্তি হলো—প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় প্রকৃতপক্ষে যে সত্তাটি টিকে থাকার “কৌশল” গ্রহণ করে, তা হলো জিন। জীব বা ব্যক্তি মূলত জিনের “বাহন” বা বাহক (vehicle)। কোনো জিন যদি এমন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করে, যা তার নিজের প্রতিলিপি পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়তে সাহায্য করে, তবে সেই জিনের বিস্তার ঘটে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিবর্তনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নৈতিকতার বাইরে এনে একধরনের তথ্যগত প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এখানে “সেলফিশ” শব্দটি নৈতিক অর্থে স্বার্থপরতা বোঝাতে নয়; বরং প্রতিলিপি বিস্তারের জৈবিক কৌশল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই বইয়ের সবচেয়ে আলোচিত অবদানগুলোর একটি হলো আত্মীয়-নির্বাচন (kin selection) ও পরার্থপর আচরণের ব্যাখ্যা। আমরা অনেক সময় দেখি—প্রাণীরা নিজের ক্ষতি করেও আত্মীয়দের রক্ষা করে। ডকিন্স দেখান, জিনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আসলে “স্বার্থপরতার”ই এক রূপ, কারণ আত্মীয়দের মধ্যে একই জিনের অনুলিপি থাকার সম্ভাবনা বেশি। ফলে আত্মীয়ের বেঁচে থাকা মানে সেই জিনের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাওয়া। এই বিশ্লেষণ সামাজিক আচরণ, দলগত সহযোগিতা ও এমনকি মানুষের নৈতিকতার বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো দেয়।

‘দ্য সেলফিশ জিন’-এ ডকিন্স “মিম” (meme) ধারণাও প্রস্তাব করেন—যাকে তিনি সাংস্কৃতিক তথ্যের একক হিসেবে দেখেন। যেমন কোনো সুর, ধারণা, বিশ্বাস বা আচরণ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক জিনের মতোই প্রতিলিপির মাধ্যমে। এই ধারণা পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক বিবর্তন, ইন্টারনেট সংস্কৃতি ও সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষণে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। যদিও “মিম” ধারণাটি বৈজ্ঞানিকভাবে জিনের মতো কঠোর কাঠামো পায়নি, তবু সংস্কৃতির বিস্তার বোঝার ক্ষেত্রে এটি একটি শক্তিশালী রূপক হয়ে উঠেছে।

বইটি প্রকাশের পর থেকেই বিতর্কের জন্ম দেয়। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, “সেলফিশ জিন” ধারণা মানুষের নৈতিকতা বা সমাজে স্বার্থপরতাকে বৈধতা দেয়। ডকিন্স নিজেই স্পষ্ট করেছেন—জিনের স্বার্থপরতা থেকে মানুষের নৈতিক আচরণের সরাসরি অনুমোদন আসে না। বরং মানুষ তার জৈবিক প্রবণতাকে অতিক্রম করে সচেতনভাবে সহযোগিতা ও নৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই ব্যাখ্যা বইটিকে কেবল জীববিজ্ঞানের গ্রন্থ নয়, বরং মানব আচরণ ও নৈতিকতার দর্শন নিয়েও চিন্তার খোরাক দেয়।

আজকের দিনে জেনেটিক্স, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান ও আচরণগত জীববিজ্ঞানে ‘দ্য সেলফিশ জিন’-এর প্রভাব গভীরভাবে অনুভূত হয়। এই বই আমাদের শেখায়—বিবর্তনকে বোঝার একাধিক স্তর থাকতে পারে, আর জিন-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সেই বোঝাপড়ায় এক শক্তিশালী বিশ্লেষণী হাতিয়ার। ডকিন্সের ভাষায় বলা যায়, আমরা কেবল জীব নয়; আমরা এমন এক দীর্ঘ বিবর্তনীয় ইতিহাসের বাহক, যেখানে প্রতিটি জিন তার নিজের টিকে থাকার গল্প বলে চলেছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ