গবেষণায় হাতে খড়ি

বিজ্ঞানী’র বই: কার্ল সেগানের ‘কসমস’

Share
Share

মহাবিশ্বের বিস্তৃতি, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, গ্রহের গতিপথ কিংবা মানুষের ক্ষুদ্র অবস্থান—এই সব জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে আবেগ, কৌতূহল ও বিস্ময়ের ভাষায় তুলে ধরার যে অসাধারণ ক্ষমতা ছিল, তার অন্যতম প্রতীক কার্ল সেগান। তাঁর বিখ্যাত বই ও টেলিভিশন সিরিজ ‘কসমস’ (Cosmos) বিশ শতকের বিজ্ঞানজনপ্রিয়করণের ইতিহাসে এক মাইলফলক। ‘কসমস’ শুধু একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই নয়; এটি মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ যাত্রার এক কাব্যিক দলিল।

১৯৮০ সালে প্রকাশিত ‘কসমস’ বইটি একই নামের টেলিভিশন সিরিজের সঙ্গে সমান্তরালে জনপ্রিয়তা পায়। সেগান এখানে মহাবিশ্বের ইতিহাসকে মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দেখান। গ্রিক দার্শনিকদের প্রথম নক্ষত্রচিন্তা থেকে শুরু করে নিউটন, গ্যালিলিও, কেপলার কিংবা আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক বিপ্লব—সবকিছুই তিনি একটানা বর্ণনার ভেতর গেঁথে ফেলেন। তাঁর লেখায় জ্যোতির্বিজ্ঞানের তথ্য কেবল তথ্য হিসেবেই থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে মানুষের কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসার গল্প।

‘কসমস’-এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো বিজ্ঞান ও মানবতার সংযোগ। সেগান বারবার মনে করিয়ে দেন—আমরা সবাই “স্টারডাস্ট”-এর সন্তান; আমাদের শরীরের মৌলিক উপাদানগুলো কোনো এক প্রাচীন নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়ে আজ আমাদের ভেতরেই বাস করছে। এই উপলব্ধি মানুষকে প্রকৃতির বাইরে কোনো বিশেষ সত্তা হিসেবে না দেখে, বরং মহাবিশ্বেরই একটি অংশ হিসেবে ভাবতে শেখায়। এর ফলে বিজ্ঞান কেবল শুষ্ক তথ্যের ভাণ্ডার নয়; বরং অস্তিত্ববোধের এক গভীর দার্শনিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

এই বইয়ে সেগান কেবল মহাকাশের গল্প বলেননি; তিনি বিজ্ঞানবিরোধী কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ছদ্মবিজ্ঞানের সমালোচনাও করেছেন। তাঁর মতে, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি—পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও সমালোচনামূলক চিন্তা—মানবসভ্যতাকে অন্ধতার হাত থেকে মুক্ত রাখার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। ‘কসমস’ তাই একদিকে যেমন বিস্ময়ের বই, অন্যদিকে তেমনি যুক্তিবাদ ও মানবিক বোধের পক্ষে এক নৈতিক আহ্বান।

‘কসমস’-এর সাংস্কৃতিক প্রভাবও অসাধারণ। এই বই ও সিরিজ অসংখ্য তরুণকে বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী করেছে, জ্যোতির্বিজ্ঞানী বা পদার্থবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। অনেক বিজ্ঞানী তাঁদের পেশাগত অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কার্ল সেগানের নাম উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে, গণমাধ্যমে বিজ্ঞান কীভাবে মানবিক ও নান্দনিক ভাষায় উপস্থাপন করা যায়—তার এক আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠেছে ‘কসমস’।

আজকের দিনে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের ছবি, এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কার কিংবা মহাবিশ্বের প্রসারণ নিয়ে নতুন নতুন তথ্য আসছে। তবু ‘কসমস’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—তথ্যের চেয়েও বড় বিষয় হলো বিস্ময়ের অনুভূতি ও কৌতূহল ধরে রাখা। কার্ল সেগানের ‘কসমস’ সেই বিস্ময়কে ভাষা দিয়েছে, আর মানুষের সঙ্গে মহাবিশ্বের এক গভীর বৌদ্ধিক ও আবেগী সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফ্রি ইমেইল নিউজলেটারে সাবক্রাইব করে নিন। আমাদের নতুন লেখাগুলি পৌছে যাবে আপনার ইমেইল বক্সে।

বিভাগসমুহ