শিক্ষাজীবনে আমরা অনেকেই কোনো না কোনো বিষয়ে ভয় পাই। কেউ গণিতকে ভয় পায়, কেউ পদার্থবিজ্ঞানকে, কেউ আবার রসায়ন বা জীববিজ্ঞানকে। অনেক শিক্ষার্থী খুব সহজেই ধরে নেয়—“এই বিষয়টা আমার জন্য নয়।” পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়া, কোনো অধ্যায় বুঝতে না পারা, শিক্ষক বা সহপাঠীদের কাছে বিষয়টিকে কঠিন বলে শুনে ফেলা—এসব কারণে অনেক সময় একটি বিষয়ের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়।
কিন্তু অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবনগল্প আমাদের এক ভিন্ন শিক্ষা দেয়। আজ তিনি পলিমার রসায়ন, পরিবেশবান্ধব উপকরণ, বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার এবং পানি থেকে বিষাক্ত ভারী ধাতু অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা করছেন। অথচ তাঁর নিজের শিক্ষাজীবনের শুরুতে রসায়ন ছিল তাঁর সবচেয়ে সহজ বা প্রিয় বিষয় নয়। বরং ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ে রসায়ন, বিশেষ করে অর্গানিক কেমিস্ট্রির বিক্রিয়া ও বিক্রিয়া-কৌশল তাঁর কাছে কঠিন মনে হতো। তিনি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে ভালো নম্বর পেলেও রসায়নে তুলনামূলকভাবে কম নম্বর পেয়েছিলেন।
এখানেই তাঁর গল্পটি শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারণ তিনি রসায়ন থেকে পালিয়ে যাননি। বরং একজন বড় ভাইয়ের দিকনির্দেশনা, সঠিকভাবে ভিত্তি শেখা এবং ধীরে ধীরে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা তাঁর জীবনের পথ বদলে দেয়। চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বর্তমান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়তেন। তাঁর কাছ থেকেই ড. হাফিজুর রহমান রসায়নের হাতেখড়ি পান নতুনভাবে। যে বিষয়টি আগে কঠিন মনে হতো, সেটিই ধীরে ধীরে তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে।
এই অভিজ্ঞতা আমাদের একটি বড় সত্য মনে করিয়ে দেয়—কোনো বিষয় কঠিন মনে হওয়া মানেই আমাদের অক্ষমতা নয়। অনেক সময় আমরা বিষয়টি ঠিকভাবে শেখার সুযোগ পাই না। অনেক সময় আমাদের ভিত্তি দুর্বল থাকে। আবার কখনো একজন ভালো শিক্ষক, একজন সহায়ক সিনিয়র, একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মেন্টর বা সঠিক পড়ার পদ্ধতি না থাকায় বিষয়টি আমাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়।
ড. হাফিজুর রহমানের জীবন তাই শুধু একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক বাধা ভাঙার গল্পও।
তিনি প্রথমে জিডি পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর টান ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের দিকে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রসায়নের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিক্যাল টেকনোলজি বিভাগে পড়ার সময় তিনি গবেষণার জগৎকে নতুনভাবে চিনতে শেখেন। বিভাগের শিক্ষকদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন গবেষণাপত্র কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে গবেষণা-পদ্ধতি বোঝা যায়, কীভাবে একটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন তৈরি হয়।
এরপর পলিমার রসায়নের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। পলিমার বলতে আমরা সহজভাবে বুঝতে পারি—অনেক ছোট অণু একটির পর একটি যুক্ত হয়ে যে বড় অণু বা উপাদান তৈরি করে। প্লাস্টিক, রাবার, সেলুলোজ—এসবই পলিমারের উদাহরণ। কিন্তু ড. হাফিজুর রহমানের আগ্রহ ছিল এমন পলিমার নিয়ে, যা পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর, সহজে ভেঙে যেতে পারে এবং মানুষের কাজে লাগতে পারে।
পরবর্তীতে তিনি জাপানের তোয়োহাশি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে পলিমার রসায়নে উচ্চতর গবেষণা করেন। সেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, গবেষণার কঠোরতা—সবকিছুই ছিল নতুন। শুরুতে তিনি ভালো ফলও পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তিনি লেগে ছিলেন। তিনি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও ল্যাবের কাজ শিখেছেন। কারণ তাঁর কাছে শেখাটাই ছিল বড় বিষয়; পদমর্যাদা নয়।
এই মনোভাবই একজন শিক্ষার্থীকে গবেষক বানায়।
আজকের শিক্ষার্থীদের জন্য এই গল্পে কয়েকটি বড় শিক্ষা আছে।
প্রথমত, কোনো বিষয় কঠিন লাগলে সেটি ছেড়ে দেওয়ার আগে নিজের ভিত্তি যাচাই করা দরকার। আমরা কি সত্যিই বিষয়টি বুঝে পড়ছি, নাকি শুধু মুখস্থ করছি? আমরা কি প্রশ্ন করছি? আমরা কি সাহায্য চাইছি?
দ্বিতীয়ত, ভালো দিকনির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক, বড় ভাই, সিনিয়র বা গবেষক শিক্ষার্থীর চিন্তার দরজা খুলে দিতে পারেন। ড. হাফিজুর রহমানের ক্ষেত্রে একজন সিনিয়রের সহায়তা রসায়নের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছিল।
তৃতীয়ত, আগ্রহ সব সময় জন্মগত নয়; অনেক সময় আগ্রহ তৈরি হয় বোঝার মধ্য দিয়ে। কোনো বিষয় যখন বোঝা শুরু হয়, তখন সেটি আর ভয়ঙ্কর থাকে না। বরং সেটিই আনন্দের বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
চতুর্থত, ক্যারিয়ারের পথ সব সময় সরলরেখায় চলে না। ছোটবেলার স্বপ্ন বদলাতে পারে, পছন্দের বিষয় বদলাতে পারে, গবেষণার ক্ষেত্র বদলাতে পারে। কিন্তু শেখার আগ্রহ, পরিশ্রম এবং ভালো মেন্টরের পরামর্শ থাকলে সেই পরিবর্তন ব্যর্থতা নয়; বরং নতুন সম্ভাবনার দরজা।
ড. হাফিজুর রহমানের গবেষণার ক্ষেত্র আজ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শিল্পকারখানার বর্জ্য, পানিতে ভারী ধাতু, প্লাস্টিক দূষণ, পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপাদান—এসব সমস্যা আমাদের চারপাশেই আছে। তিনি যে বায়োডিগ্রেডেবল পলিমার ও কম্পোজিট অ্যাডজরবেন্ট নিয়ে কাজ করছেন, তা ভবিষ্যতে পানি শোধন, পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই শিল্পব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অথচ এই পথের শুরু ছিল এক সময়ের “কঠিন” রসায়ন দিয়ে।
তাই শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর জীবন থেকে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—কোনো বিষয়ে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভয়কে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আজ যে বিষয়টি কঠিন লাগছে, কাল সেটিই হয়তো আপনার গবেষণার ক্ষেত্র, পেশাগত পরিচয় কিংবা জীবনের সবচেয়ে বড় অবদান হয়ে উঠতে পারে।
শুধু দরকার সঠিক দিকনির্দেশনা, ধৈর্য, শেখার আগ্রহ এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার সাহস।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের জীবন ও গবেষণা নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন মূল সাক্ষাৎকারভিত্তিক ফিচার—
“পরিবেশবান্ধব উপকরণ গবেষণায় বাংলাদেশের বিজ্ঞানীর পথচলা”

Leave a comment